ডেস্ক রিপোর্ট | ১৮ জুলাই ২০২৫
রাজপথে উত্তাল আন্দোলনের ভিতর দিয়ে যারা বেঁচে ফিরে আসে, তারা কেবল খবরের কাগজে ছাপা নাম নয়—তারা ইতিহাসের জীবন্ত চিহ্ন। ১৭ জুলাই ছিল এমন এক দিন, যা হয়তো জাতীয় ইতিহাসে বিশেষভাবে লেখা থাকবে না, কিন্তু যারা সেই দিন রাজপথে ছিলেন, তাদের দৃষ্টিতে এটি একটি রক্তাক্ত টার্নিং পয়েন্ট।
এই প্রতিবেদক যিনি ১৫ জুলাই ছাত্রদের ওপর চালানো বর্বর হামলার পর আরও দৃঢ় হয়ে উঠেছিলেন, তিনিই ১৬ তারিখের পর মৃত্যুভয়কে পেছনে ফেলে নেমে যান মাঠে। সাংবাদিক পরিচয়ে হলেও, যুদ্ধক্ষেত্র ছিল এতটাই ভয়াবহ, তিনি নিজেই নিজেকে প্রস্তুত করেন—পলওয়েল মার্কেট থেকে সংগ্রহ করেন একটি বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট ও হেলমেট। আজকের দিনে ফিরে তাকালে বুঝি, সেই জ্যাকেট হয়তো সত্যিকারের গুলি ঠেকাতে পারত না, কিন্তু সাহস ছিল সেদিনকার একমাত্র বর্ম।
১৭ জুলাই সকালটা শুরু হয়েছিল হালকা বৃষ্টির সঙ্গে। ক্যাম্পাস তখন ছাত্রশূন্য হয়ে পড়ছিল, হল ছাড়ছিল শিক্ষার্থীরা। সকালবেলার গায়েবী জানাজা কাভার করার পর ক্যাম্পাসে নেমে আসে নিস্তব্ধ এক আতঙ্ক। পুলিশ, র্যাব, বিজিবি—সবাই ব্যাটল গিয়ারে সজ্জিত। টুজি নেটওয়ার্কে খবর পাঠানোও কঠিন।
এরপরই শুরু হয় পুলিশি অভিযান। প্রথমবারের মতো সাউন্ড গ্রেনেডের শব্দে কেঁপে ওঠে প্রাঙ্গণ। সাংবাদিকদের মাঝখান থেকে প্রতিবাদ করার সাহস দেখালে, এক তথাকথিত সাংবাদিক প্রশ্ন তোলে—”আপনি সাংবাদিক, না শিবির?” এমন প্রশ্ন কেবল দৃষ্টিভঙ্গির দৈন্য নয়, এটি গণতন্ত্রহীনতা কতটা গভীরে গেছে তার নিদর্শন।
রাজু ভাস্কর্য ও ভিসি চত্বরে দুই দিক থেকে চড়াও হয় পুলিশ বাহিনী। শুরু হয় টিয়ার গ্যাসের তাণ্ডব। চোখ জ্বালা করে, গলা শুকিয়ে আসে, মনে হয় ফুসফুস ভেতর থেকে পুড়ে যাচ্ছে। পাশে থাকা একজন সহকর্মীর সঙ্গে আশ্রয় নেন বিজিবির গাড়ির পেছনে, যেখানে বিজিবির সদস্যরাও চোখ মুছছেন ক্রমাগত। ভেতরে গজিয়ে ওঠে এক আত্মবিশ্বাস—রাষ্ট্রীয় বাহিনীও জানে, এই রাসায়নিক গ্যাস কতটা নির্মম।
এরপর আন্দোলনকারীরা পুনরায় সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করে। পুলিশ এবার প্রস্তুত। ঢাল পেটানোর আওয়াজে রাজপথ যেন রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। একের পর এক সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ার গ্যাস, আর ধাওয়া—সবকিছুর মধ্যেও এই প্রতিবেদক তথ্য পাঠানোর চেষ্টা করেন, পড়েও যান সরাসরি আক্রমণের সামনে। সামনের বেঞ্চে বসে থাকা অবস্থায় দুটো সাউন্ড গ্রেনেড পড়ে ঠিক চোখের সামনে। মুহূর্তেই অন্ধকার।
মাল্টিমিডিয়া টিমের সহকর্মীরা তখন চিৎকার করছেন—”ভাই, আপনি মরবেন!” কোনো রকমে শরীর সামলে উঠে এসে সহকর্মীদের সাথে মিলিত হন তিনি। বিকেলের দিকে অফিসের গাড়িতে ফিরে আসেন, কিন্তু ভেতরে এক রক্তাক্ত প্রশ্ন: “এইবারও কি আমরা হেরে যাব?”
বাসায় ফিরে অনুভব করেন, এটা যেন এক কারবালার পুনরাবৃত্তি। শাহবাগে ছাত্রলীগ-যুবলীগ সদস্যরা ফোন চেক করছে, রাস্তায় ভয় আর আতঙ্কের বাতাস।
১৭ জুলাই ছিল কেবল আন্দোলনের নয়, সাংবাদিকতার সাহসিকতা, গণতন্ত্রের অবমাননা আর রাষ্ট্রীয় সহিংসতার এক নিখুঁত প্রতিচ্ছবি। সেদিনকার আঘাত শুধু শারীরিক নয়—এটি চেতনার, সাহসের, ও মুক্তচিন্তার ওপর চালানো এক পরিকল্পিত আঘাত।
এই দিন, এই স্মৃতি, ভুলে যাওয়ার না।