সুনামগঞ্জ সরকারি হাসপাতালে ‘কমিশন বাণিজ্য’: রিপোর্ট না দেখেই ওষুধ দিচ্ছেন ডা. লিপিকা দাস, চরম ঝুঁকিতে জনস্বাস্থ্য
শোল্ডার: সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার নামে অবহেলা ও অনিয়মের অভিযোগ
বাইলাইন: মোঃ রেজাউল করিম, স্টাফ রিপোর্টার | সুনামগঞ্জ
দক্ষ ও মানবিক চিকিৎসাসেবা পাওয়া যেখানে দেশের প্রতিটি নাগরিকের সাংবিধানিক ও মৌলিক অধিকার, সেখানে সুনামগঞ্জ সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার নামে চলছে চরম অবহেলা, স্বজনপ্রীতি ও অসাধু বাণিজ্য। হাসপাতালের জরুরি ও বহির্বিভাগে কর্মরত চিকিৎসক ডা. লিপিকা দাসের বিরুদ্ধে কমিশন বা পার্সেন্টেজের উদ্দেশ্যে রোগীদের অহেতুক ও অপ্রয়োজনীয় ডায়াগনস্টিক টেস্টে পাঠানোর গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। তবে সবচেয়ে উদ্বেগজনক ও আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, দরিদ্র রোগীরা সর্বস্বান্ত হয়ে বা কষ্টার্জিত টাকায় প্যাথলজিক্যাল টেস্ট করানোর পর সেই রিপোর্ট দেখতেই চান না এই চিকিৎসক। রিপোর্ট না দেখেই তিনি গণহারে প্রেসক্রিপশনে ওষুধ লিখে দিচ্ছেন, যা চিকিৎসা বিজ্ঞানের চরম লঙ্ঘন।
দালাল ও কমিশন সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য
স্থানীয় ভুক্তভোগী ও রোগীদের সূত্রে জানা গেছে, সরকারি হাসপাতালে সেবা নিতে আসা দরিদ্র, প্রান্তিক ও নিম্নবিত্ত রোগীদের লক্ষ্য করে একটি শক্তিশালী দালাল চক্র সক্রিয় রয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, সুনামগঞ্জ শহরের নির্দিষ্ট কিছু বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও প্যাথলজি ল্যাবের সাথে ডা. লিপিকা দাসের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ আর্থিক চুক্তি রয়েছে। সাধারণ শারীরিক সমস্যা বা সামান্য উপসর্গ নিয়ে আসা রোগীদেরও ৩ থেকে ৪টি ভারী ও ব্যয়বহুল প্যাথলজিক্যাল টেস্ট দেওয়া হচ্ছে। যার মূল উদ্দেশ্য—কমিশন বা নির্দিষ্ট পার্সেন্টেজ পকেটে ভরা।
রিপোর্ট না দেখে ওষুধ: চরম স্বাস্থ্যঝুঁকি
রোগ সঠিক উপায়ে নির্ণয়ের মূল ভিত্তিই হলো প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফলাফল। অথচ ডা. লিপিকা দাস রোগীদের টেস্ট করানোর নির্দেশ দেওয়ার পর রোগীরা যখন কষ্ট করে রিপোর্ট নিয়ে তাঁর কক্ষে যান, তখন তিনি সেই রিপোর্ট না দেখেই আগে থেকে তৈরি মনগড়া বা অনুমাননির্ভর প্রেসক্রিপশন ধরিয়ে দেন।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, পরীক্ষা করানোর পর রিপোর্ট পর্যালোচনা না করে ওষুধ প্রয়োগ করলে রোগীর শরীরে মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া (Side effects) দেখা দিতে পারে। ভুল অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার কিংবা অনির্দিষ্ট চিকিৎসার কারণে রোগীর গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গহানি এমনকি প্রাণহানির মতো ভয়াবহ পরিণতি ঘটতে পারে। চিকিৎসার ন্যূনতম পেশাগত নৈতিকতা লঙ্ঘন করে রোগীদের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার এমন দৃষ্টান্তে স্তম্ভিত সাধারণ মানুষ।
ভুক্তভোগীর আকুতি
“অনেক কষ্ট করে সুদের ওপর টাকা এনে কিংবা সম্বল বিক্রি করে ডাক্তার সাহেবের কথামতো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাই। কিন্তু রিপোর্ট নিয়ে গেলে উনি তা খুলে দেখার প্রয়োজনও মনে করেন না। টেস্ট করার আগে যে ওষুধ লিখেছিলেন, সেটাই বহাল রাখেন। তাহলে আমাদের এই হাজার হাজার টাকার টেস্ট করিয়ে লাভ কী হলো?”
— নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ভুক্তভোগী রোগী
ভুক্তভোগীদের ক্ষোভ ও জনমনে অসন্তোষ
সরকারি হাসপাতালে এমন নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি দেখে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন চিকিৎসা নিতে আসা সাধারণ মানুষ। টেস্টের ফর্দ হাতে নিয়ে হাসপাতাল চত্বরে ঘুরতে থাকা দরিদ্র পরিবারগুলোর হাহাকার এখন নিত্যদিনের চিত্রে পরিণত হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ভুক্তভোগী অভিযোগ করে জানান, চিকিৎসকের লিখে দেওয়া ল্যাব ছাড়া অন্য কোথাও পরীক্ষা করালেও খাম খুলে দেখা হয় না।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি
সরকারি হাসপাতালের এমন অব্যবস্থাপনা এবং একজন দায়িত্বশীল চিকিৎসকের অনৈতিক কর্মকাণ্ডে সুনামগঞ্জের সচেতন সমাজ ও সাধারণ রোগীরা অত্যন্ত ক্ষুব্ধ। মানবিকতার স্বার্থে ও সুনামগঞ্জের সর্বস্তরের মানুষের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সচেতন মহল অবিলম্বে তিনটি দাবি জানিয়েছেন—
১. হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দৈনিক তদারকি ও নজরদারি জোরদার করা।
২. ডা. লিপিকা দাসের অনিয়মের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করা।
৩. তদন্ত সাপেক্ষে আইনানুগ ও দৃষ্টান্তমূলক প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
সাধারণ জনগণের জোর দাবি, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং সুনামগঞ্জের সিভিল সার্জন দপ্তর দ্রুত এই অরাজকতা বন্ধে কড়া পদক্ষেপ নেবে।