জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি শংকরপুরের বাবলু!
যশোর-২ আসনের ‘মীরজাফর’ বাবলু: চাঁদাবাজি ও নির্যাতনের আড়ালে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার এজেন্ডা বাস্তবায়নের অভিযোগ
অপরাধ ডেস্ক রিপোর্ট : দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ
৫ আগস্টের পর যেন এক দানবীয় উত্থান: ৫০ লাখ টাকা লুট, ‘বিচারাচার’ বাণিজ্য এবং বিএনপির ভেতরের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত—তৃণমূলের দাবি ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’ স্টাইলে চূড়ান্ত নির্মূল।
যশোর-২ আসনে বিএনপির বিপর্যয়ের ‘খলনায়ক’ বাবলু: ৫০ লাখ টাকা চাঁদাবাজি ও সালিশি বাণিজ্যের মধ্যযুগীয় শাসন
৫ আগস্টের পর শংকরপুর যেন মগের মুল্লুক: ‘ক্যাঙ্গারু কোর্ট’ ও অত্যাচারে অতিষ্ঠ এলাকাবাসী—‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’ স্টাইলে যৌথ বাহিনীর অভিযানের তীব্র দাবি।
ঝিকরগাছা উপজেলার শংকরপুর ইউনিয়নে এখন এক আতঙ্কের নাম নিছার উদ্দিন বাবলু। শংকরপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ও সাবেক এই চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে অভিযোগের যে পাহাড় জমেছে, তা কোনো অন্ধকার যুগের বর্বরতাকেও হার মানায়। গত ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের পর স্বৈরাচারমুক্ত বাংলাদেশে যখন সাধারণ মানুষ শান্তির নিঃশ্বাস ফেলছে, বাবলু তখন ইউনিয়নকে রূপান্তর করেছেন তার ব্যক্তিগত ‘টর্চার সেলে’। তার বেপরোয়া চাঁদাবাজি, সালিশি বাণিজ্য এবং সাধারণ মানুষের ওপর পাশবিক জুলুমের কারণে যশোর-২ (ঝিকরগাছা-চৌগাছা) আসনে ধানের শীষের প্রার্থী সাবিরা নাজমুল মুন্নির শোচনীয় ভরাডুবি হয়েছে—এমনটাই এখন এলাকার সাধারণ ভোটার থেকে শুরু করে খোদ বিএনপির ত্যাগী নেতা-কর্মীদের মুখে মুখে।
এক রাতে ৫০ লাখ টাকা চাঁদাবাজি: গোবিন্দ চেয়ারম্যানের আর্তনাদ
অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এক রোমহর্ষক তথ্য। ৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে শংকরপুর ইউনিয়নের সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক চেয়ারম্যান গোবিন্দ চ্যাটার্জিকে টার্গেট করেন বাবলু ও তার পেটোয়া বাহিনী। প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে এবং এলাকাছাড়া করার ভয় দেখিয়ে গোবিন্দের কাছ থেকে এককালীন ৫০ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বাবলু। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ কোনো দলীয় তহবিলে নয়, বরং সরাসরি বাবলুর ব্যক্তিগত তিজোরিতে জমা হয়েছে। এলাকার মানুষ একে ‘সুরক্ষা ট্যাক্স’ বা ‘শংকরপুরের জিজিয়া কর’ হিসেবে অভিহিত করছেন। শুধু গোবিন্দ নন, স্থানীয় ইটভাটা মালিক, ব্যবসায়ী ও প্রবাসীদের পরিবারকেও বাবলুর বাহিনীকে মোটা অংকের মাসোহারা দিতে হচ্ছে।
সালিশের নামে ‘ক্যাঙ্গারু কোর্ট’: আইনের শাসনের কফিনে শেষ পেরেক
শংকরপুর ইউনিয়নে বর্তমানে কোনো আইনি কাঠামোর তোয়াক্কা করেন না বাবলু। তার নিজের বাসভবন এখন একটি স্বঘোষিত ‘বিচারালয়’। তুচ্ছ পারিবারিক বিবাদ কিংবা জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ—সবই নিষ্পত্তি হয় বাবলুর ইশারায়। সেখানে বিবাদী ও প্রতিবাদকারী উভয় পক্ষকেই দিতে হয় বিশাল অংকের ‘ফি’। বিচারে বাবলু যাকে দোষী সাব্যস্ত করেন, তাকে লক্ষ লক্ষ টাকা জরিমানা করা হয়। এই জরিমানার অর্ধেক টাকা বাবলু সরাসরি নিজের পকেটে ভরেন। যারা এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করে, তাদের ওপর নেমে আসে বাবলুর ক্যাডারদের পাশবিক নির্যাতন। অনেকটা অন্ধকার যুগের কায়দায় চলে এই ‘বিচারাচার’, যেখানে আইন নয়, বাবলুর ইচ্ছাই শেষ কথা।
সাবিরা নাজমুল মুন্নির পরাজয়ের ‘মাস্টারমাইন্ড’
যশোর-২ আসনের ভরাডুবির নেপথ্যে যে বাবলুর কর্মকাণ্ড দায়ী, তার প্রমাণ মেলে নির্বাচনী ফলাফলে। সাবিরা নাজমুল মুন্নির প্রচারণার সময় বাবলু সাধারণ মানুষের কাছে ভোট চাওয়ার বদলে ব্যস্ত ছিলেন নিজের আধিপত্য বিস্তারে ও অর্থ আদায়ের হিসাব মেলাতে। সাধারণ ভোটাররা আক্ষেপ করে বলেন,
“আমরা বিএনপিকে ভোট দিতে চেয়েছিলাম, কিন্তু বাবলুর অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে আমরা ব্যালটে নীরব প্রতিবাদ জানিয়েছি।” ত্যাগী কর্মীদের রক্ত আর ত্যাগের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা বিএনপিকে বাবলু তার লুটপাটের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন, যা দলের অপূরণীয় ইমেজ সংকট তৈরি করেছে।
অপারেশন ক্লিন হার্ট স্টাইলে দমনের দাবি
এলাকাবাসীর একটাই দাবি—এভাবে একটি ইউনিয়ন চলতে পারে না। তারা ২০০৩ সালের ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’-এর মতো একটি কঠোর সামরিক বা যৌথ বাহিনীর অভিযানের দাবি তুলেছেন। সাধারণ মানুষের মতে, বাবলু ও তার সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনীকে দ্রুত গুঁড়িয়ে দিতে না পারলে শংকরপুরে কখনো শান্তি ফিরবে না। তারা চান:
অবিলম্বে গ্রেপ্তার: চাঁদাবাজি ও নির্যাতনের প্রতিটি ঘটনায় বাবলুর সরাসরি যোগসাজশ খতিয়ে দেখে তাকে দ্রুত গ্রেপ্তার করা।
দল থেকে আজীবন বহিষ্কার: বিএনপির ভাবমূর্তি রক্ষায় কেন্দ্রীয় হাই কমান্ডকে এই ‘চাঁদাবাজ’ ও ‘জুলুমবাজ’ নেতাকে দল থেকে চিরতরে ছুঁড়ে ফেলতে হবে।
সম্পদ বাজেয়াপ্ত: গত কয়েক মাসে চাঁদাবাজি ও অর্থ আত্মসাতের মাধ্যমে বাবলু যে বিশাল অবৈধ সম্পদ গড়েছেন, তা উদ্ধার করে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া।
প্রত্যাশিত কঠোর শাস্তি ও আইনি ধারা
বাবলুর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলো প্রমাণিত হলে বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী তার সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়া প্রয়োজন:
১. চাঁদাবাজির জন্য (দণ্ডবিধি ৩৮৫/৩৮৬ ধারা): ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়ের দায়ে ১০ বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড।
২. বেআইনি সমাবেশ ও দাঙ্গা (১৪৩/১৪৭ ধারা): সশস্ত্র দাঙ্গা বা ত্রাস সৃষ্টির জন্য দীর্ঘমেয়াদী জেল ও জরিমানা।
৩. প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাৎ (৪২০/৪০৬ ধারা): বিশ্বাসভঙ্গ ও সাধারণ মানুষের অর্থ লুটের দায়ে কঠোর কারাদণ্ড।
নিছার উদ্দিন বাবলু এখন শুধু বিএনপির শত্রু নয়, তিনি শংকরপুরের গণশত্রু। তার ব্যক্তিগত লালসা ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডে ধুলোয় মিশেছে দলের দীর্ঘদিনের ত্যাগ ও অর্জন। এখন প্রশ্ন একটাই—দলের কেন্দ্রীয় হাইকমান্ড কি এই ‘ভণ্ড’ ও ‘বিষফেঁড়া’ নেতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে, নাকি শংকরপুরবাসীর আর্তনাদ আরও দীর্ঘ হবে? এলাকাবাসী এখন চাতক পাখির মতো তাকিয়ে আছে প্রশাসনের ‘ক্লিন হার্ট’ অ্যাকশনের দিকে।
যশোর-২ আসনের রাজনীতিতে মরহুম বিএনপি নেতা জনাব নাজমুল হাসান ছিলেন এক অনন্য ও অবিস্মরণীয় নাম। তিনি কেবল একটি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি ছিলেন না; তিনি ছিলেন তৃণমূলের আস্থা, সাধারণ মানুষের আশ্রয়স্থল এবং আদর্শিক রাজনীতির এক দৃঢ় প্রতীক। তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে সততা, সাংগঠনিক দক্ষতা ও কর্মনিষ্ঠা তাঁকে মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে দিয়েছিল। পদ-পদবি নয়, মানুষের পাশে থাকা—এই ছিল তাঁর শক্তি। আর সেই কারণেই তিনি ব্যক্তি নন, একটি প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠেছিলেন যশোর-২ এর রাজনীতিতে।
তাঁর ইন্তেকালের পর অনেকেই আশঙ্কা করেছিলেন—এই শূন্যতা হয়তো পূরণ করা কঠিন হবে। কিন্তু সেই কঠিন সময়েই সাবিরা নাজমুল মুন্নি সাহসিকতার সঙ্গে সামনে এসে স্বামীর রাজনৈতিক আদর্শ ও জনগণের আস্থা ধরে রাখার চেষ্টা করেন। তিনি তৃণমূলের মানুষের কাছে পৌঁছেছেন, কর্মীদের সংগঠিত করেছেন, মানুষের সুখ-দুঃখে পাশে দাঁড়িয়েছেন। অল্প সময়েই তিনি সাধারণ ভোটারদের হৃদয়ে জায়গা করে নেন। অনেকে বিশ্বাস করেছিলেন—মরহুম নাজমুল হাসানের উত্তরাধিকারী হিসেবে তিনি আবারও ধানের শীষের বিজয় নিশ্চিত করবেন।
কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতা সবসময় আবেগের অনুগত থাকে না। নির্বাচনী মাঠে ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তা থাকা সত্ত্বেও সংগঠনের ভেতরে কিছু অসৎ, সুবিধাবাদী ও বিতর্কিত আচরণে জড়িত একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর কারণে পুরো প্রচেষ্টাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে—এমন অভিযোগ উঠেছে তৃণমূলের বহু নেতাকর্মীর কাছ থেকে। তাদের মতে, কিছু স্বার্থান্বেষী দালাল চক্র ও কথিত চাঁদাবাজদের কর্মকাণ্ড সাধারণ মানুষের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।
যখন একটি রাজনৈতিক দল জনগণের কাছে ন্যায়, শৃঙ্খলা ও সুশাসনের প্রতিশ্রুতি দেয়, তখন দলের ভেতরে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ সেই প্রতিশ্রুতিকে দুর্বল করে দেয়। ভোটাররা শুধু প্রার্থীকে দেখেন না; তারা সংগঠনের সামগ্রিক চিত্রও বিবেচনা করেন। ফলে ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা থাকা সত্ত্বেও সংগঠনের ভেতরের নেতিবাচক চর্চা নির্বাচনী ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে বলে অনেকের ধারণা।
এখন সময় এসেছে কঠোর আত্মসমালোচনার। একটি আদর্শিক রাজনৈতিক দল কখনোই কিছু সুবিধাবাদী বা অনৈতিক আচরণে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের কারণে তার দীর্ঘদিনের সংগ্রাম ও ত্যাগকে নষ্ট হতে দিতে পারে না। যারা দলীয় ব্যানার ব্যবহার করে ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করে, যারা নিজেদের প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে ক্ষুব্ধ করে তোলে—তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা প্রয়োগ করাই হবে দলের প্রতি প্রকৃত দায়িত্বশীলতা।
দলকে শক্তিশালী করতে হলে শুদ্ধি অভিযান প্রয়োজন—কিন্তু তা হতে হবে সাংগঠনিক নিয়ম, প্রমাণ ও ন্যায়ের ভিত্তিতে। অভিযোগ থাকলে তা তদন্তের আওতায় আনতে হবে, প্রয়োজন হলে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। কারণ রাজনীতি কোনো ব্যক্তির আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জায়গা নয়; এটি জনগণের আস্থা ও ত্যাগের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা একটি নৈতিক সংগ্রাম।
যশোর-২ আসনের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে সঠিক সিদ্ধান্তের ওপর। আজ যদি দল সাহসী পদক্ষেপ নিয়ে বিতর্কিত চর্চা থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারে, তবে আগামী দিনে জনগণের আস্থা আরও সুদৃঢ় হবে। কিন্তু যদি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর দৌরাত্ম্য অব্যাহত থাকে, তবে তার দায় পুরো সংগঠনকেই বহন করতে হবে।
অতএব সময়ের দাবি—দলীয় শৃঙ্খলা জোরদার করা, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা এবং স্বচ্ছ ও জনবান্ধব নেতৃত্বকে সামনে আনা। তবেই মরহুম নাজমুল হাসানের আদর্শিক উত্তরাধিকার এবং সাবিরা নাজমুল মুন্নির রাজনৈতিক প্রচেষ্টা যথার্থ মর্যাদা পাবে।