নিজস্ব প্রতিবেদক | দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ
পাটবাড়ী, কাগজপুকুর, ছোট আঁচড়া ও পেচড় বাওড় শ্মশানঘাটের পূজামণ্ডপ পরিদর্শন; হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের প্রতি অপার প্রেম ও গভীর শ্রদ্ধাবোধ প্রকাশ, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার সমান অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিতের আহ্বান
বেনাপোল, যশোর: ১৯ অক্টোবর সন্ধ্যার পর শারদীয় দুর্গা পূজার আনন্দ ভাগাভাগি করতে এবং অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে যশোরের বেনাপোল পৌরসভার বিভিন্ন দুর্গাপূজামণ্ডপ পরিদর্শনে বের হন বেনাপোল পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবু তাহের ভারত। পূজা পরিদর্শনের এ কর্মসূচিতে তিনি কেবল রাজনৈতিক দায়িত্ব পালন করেননি; বরং নিজের মননে ধারণ করা হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের প্রতি গভীর ভালোবাসা, জ্ঞান, আস্থার জায়গা এবং অপার শ্রদ্ধাবোধ প্রকাশ করেছেন। একজন মুসলিম হয়েও সনাতন ধর্মের পূজাপদ্ধতি, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রতি তাঁর যে গভীর উপলব্ধি ও জ্ঞান রয়েছে, তা স্থানীয় হিন্দু ও মুসলিম—উভয় সম্প্রদায়কে গভীরভাবে মুগ্ধ ও আপ্লুত করেছে।
পরিদর্শনকালে পাটবাড়ীর ঐতিহ্যবাহী পূজামণ্ডপ, কাগজপুকুর সার্বজনীন পূজামণ্ডপ, ছোট আঁচড়ার মন্দির এবং পেচড় বাওড় শ্মশানঘাটের পূজামণ্ডপে সনাতন ধর্মের ভাইবোনদের সঙ্গে তিনি শারদীয় দুর্গোৎসবের শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। এ সময় প্রতিটি পূজামণ্ডপে এক অপূর্ব সম্প্রীতি ও আবেগময় পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
পূজা ও সনাতন ঐতিহ্যের গভীর জ্ঞান এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতি হৃদয়ের অফুরন্ত ভালোবাসা
পরিদর্শনকালে আবু তাহের ভারত সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সাথে অত্যন্ত সুহৃদয় পরিবেশে কথা বলেন। তিনি একজন মুসলিম হওয়া সত্ত্বেও হিন্দু ধর্মের ইতিহাস, দুর্গাপূজার তাৎপর্য এবং দেবী দুর্গার আগমনের মূল দর্শন নিয়ে তাঁর বিস্তৃত জ্ঞান ফুটিয়ে তোলেন। তিনি তুলে ধরেন যে, দুর্গাপূজা শুধু একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় আচার নয়, এটি অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভ শক্তির জয়ের প্রতীক।
হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতি ভালোবাসার গভীরতা প্রকাশ করে তিনি বলেন, “আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা আপনাদের এই মাটিতে। সনাতন ধর্মাবলম্বী প্রতিবেশীদের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা দিয়েই আমি আজকের আবু তাহের ভারত হয়েছি। আপনারা আমার পরিবারের অংশ। আপনাদের পূজার ঘণ্টা, ধূপের সুবাস, আর মণ্ডপের এই পবিত্রতা আমাকে সবসময় আলোড়িত করে। সনাতন ধর্ম আমাদের শেখায় ত্যাগের কথা, ধৈর্যের কথা এবং মানবতার কথা।

তাঁর বক্তব্যে প্রতিফলিত হয় যে, ব্যক্তিগতভাবে ইসলাম ধর্মের অনুসারী হয়েও তিনি অন্য ধর্মের মূল্যবোধ ও বিশ্বাসকে কতটা অন্তর থেকে সম্মান করেন। এই প্রগাঢ় জ্ঞান ও ভালোবাসা প্রকাশের মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেছেন যে, ধর্মের বিভেদ মানুষের মানবিক সম্পর্ক ও ভালোবাসার ঊর্ধ্বে যেতে পারে না।
‘সংখ্যালঘু বলাটাই আমার কাছে অপরাধ মনে হয়’
শারদীয় দুর্গাপূজার শুভেচ্ছা বিনিময়কালে ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নাগরিকদের বিভক্ত করার প্রবণতার তীব্র প্রতিবাদ জানান আবু তাহের ভারত। তিনি বলেন, “আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশে আমরা সবাই সমান মর্যাদার নাগরিক। এখানে কে সংখ্যাগরিষ্ঠ আর কে সংখ্যালঘু—সেই বিচার দিয়ে মানুষকে মাপা বন্ধ করতে হবে। আমার কাছে কাউকে ‘সংখ্যালঘু’ বলাটাই অপরাধ বলে মনে হয়।”
তিনি আরও যোগ করেন, “আমার কাছে মনে হয়, এই স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষ আমার ভাই, আমার বোন, আমার রক্ত ও আত্মার আত্মীয়। আমরা একই নদীর জল খাই, একই বাতাসে শ্বাস নিই। তাহলে ধর্মাচরণের পার্থক্যের কারণে কেন কাউকে আলাদা করে দেখা হবে? প্রতিটি সনাতন ধর্মাবলম্বী নাগরিকের সমান অধিকার, মর্যাদা ও নিরাপত্তার সাথে বেঁচে থাকার পূর্ণ অধিকার রয়েছে।”
সামাজিক সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ববোধের স্পষ্ট বার্তা
বেনাপোলের মতো গুরুত্বপূর্ণ এক সীমান্তবর্তী জনপদে দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যময় সামাজিক সম্প্রীতি টিকিয়ে রাখতে আবু তাহের ভারত একটি সামাজিক সম্প্রীতির বার্তা তুলে ধরেন। তিনি স্থানীয় মুসলিম সমাজকেও সনাতন ধর্মাবলম্বী প্রতিবেশীদের পাশে দাঁড়ানোর ও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, “সামাজিক শান্তি ও সহাবস্থান ধরে রাখা আমাদের সকলের নৈতিক দায়িত্ব। ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে অন্য ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে এবং প্রতিবেশীর অধিকার রক্ষা করতে। আমাদের হিন্দু ভাইবোনেরা যাতে পূর্ণ আস্থা, উল্লাস ও নিরাপদে তাঁদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব উদ্যাপন করতে পারেন, তা নিশ্চিত করা আমাদের সার্বজনীন সামাজিক দায়িত্ব।”
পূজামণ্ডপের নিরাপত্তায় কঠোর নজরদারি ও চাঁদাবাজি-সন্ত্রাস প্রতিরোধের আহ্বান
পূজা উপলক্ষে মণ্ডপগুলোর সার্বিক পরিবেশ, যানবাহন ব্যবস্থাপনা ও দর্শনার্থীদের যাতায়াতের সার্বিক বিষয়ে খোঁজখবর নেন তিনি। বিশেষ করে নারী, শিশু ও বৃদ্ধ দর্শনার্থীরা যেন কোনো ধরনের বিঘ্ন ছাড়া পূজামণ্ডপে ঘুরে পূজা উপভোগ করতে পারেন, সে ব্যাপারে আয়োজকদের সাথে আলোচনা করেন।
একই সাথে তিনি পূজামণ্ডপের নিরাপত্তায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনকে সর্বাত্মক নজরদারি জোরদার করার আহ্বান জানান। তিনি কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন:
১. চাঁদাবাজদের স্থান নেই: পূজামণ্ডপকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের চাঁদা দাবি বা চাঁদা আদায়ের চেষ্টা সহ্য করা হবে না। কাউকে কোনো চাঁদা দেওয়া যাবে না এবং কেউ চাঁদা চাইতে এলে তাঁকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে তুলে দিতে হবে।
২. সন্ত্রাস ও বিশৃঙ্খলা প্রতিরোধ: উৎসবের শান্ত পরিবেশ বিঘ্নিত করতে পারে এমন যেকোনো সন্ত্রাস, অপপ্রচার বা উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে।
৩. সমন্বিত নজরদারি: প্রশাসন, পুলিশ, স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক এবং বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের সমন্বয়ে মাঠপর্যায়ে সতর্ক পাহারা রাখতে হবে।
অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ ও মাদকমুক্ত সমাজ গঠনের প্রতিশ্রুতি
বক্তব্যের শেষভাগে তিনি সামাজিক অপরাধের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান ঘোষণা করেন। তিনি উল্লেখ করেন, সামাজিক সম্প্রীতির মূল শত্রু হলো মাদক, সন্ত্রাস ও দুর্নীতি। দুর্গাপূজার যে মূল বার্তা—শুভ শক্তির মাধ্যমে অশুভের বিনাশ—সেই শিক্ষাকে বাস্তব জীবনে ধারণ করে একটি মাদকমুক্ত, ভয়হীন এবং ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান তিনি।
সর্বস্তরের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি ও উচ্ছ্বাস
১৯ অক্টোবর সন্ধ্যার এই পরিদর্শনের সময় আবু তাহের ভারতের সঙ্গে স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মী, সামাজিক ব্যক্তিত্ব, পূজা উদ্যাপন কমিটির সদস্য, হিন্দু সম্প্রদায়ের সম্মানিত প্রতিনিধি এবং সাধারণ মুসলিম-হিন্দু জনতা বিপুল সংখ্যায় উপস্থিত ছিলেন। আবু তাহের ভারতের এই অকৃত্রিম ভালোবাসা, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রতি সম্মান এবং স্পষ্ট সম্প্রীতির বার্তা সমগ্র বেনাপোল পৌরসভায় প্রশংসিত হয়েছে এবং হিন্দু-মুসলিম সুদৃঢ় ঐক্যের এক নবদিগন্তের সূচনা করেছে।