ভোটের আগে নয়ন আতঙ্ক: বিএনপির তরুণ নেতৃত্বে সরকারের অস্থিরতা, ২৪-এর নির্বাচনের আগেই অভিযান
রাজনৈতিক ডেস্ক রিপোর্ট :
২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগ মুহূর্তে বিএনপির তরুণ নেতা রবিউল ইসলাম নয়নকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম নেয়। বিএনপি নেতাকর্মীদের ভাষায়, “ভোটের আগে নয়ন আতঙ্ক” ছিল সরকারের জন্য এক বাস্তবতা — মাঠে কর্মীদের উচ্ছ্বাস, আন্দোলনের বিস্তার এবং সংগঠনের প্রাণশক্তি হিসেবে নয়নের অবস্থানই ছিল আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের মূল উদ্বেগের কারণ।
বিএনপি সূত্রের দাবি, নয়নের নেতৃত্বে তৃণমূল পর্যায়ের আন্দোলন এতটাই সক্রিয় হয়ে ওঠে যে, শেখ হাসিনা স্বয়ং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সঙ্গে বৈঠকে তার নাম উল্লেখ করে কঠোর নির্দেশ দেন — “নয়নকে আটক করো, না হয় সরিয়ে দাও।”
এরপরই শুরু হয় সারাদেশব্যাপী গোপন অভিযান ও তল্লাশি। বিএনপির একাধিক সূত্র জানায়, নয়নকে হত্যার জন্য অন্তত দুইবার গুলি করা হয়। একবার তাকে মৃত ভেবে হাসপাতালে মর্গে পাঠানো হয়েছিল, পরে চিকিৎসক ও সহকর্মীদের তৎপরতায় তিনি বেঁচে ফেরেন।
—
২৮ অক্টোবরের দুঃসাহসিক পিকেটিং ও নয়নের ভূমিকা
২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবর বিএনপি ঘোষিত কর্মসূচি ছিল আন্দোলনের ইতিহাসে একটি টার্নিং পয়েন্ট। নয়ন তখন মাঠের অন্যতম কমান্ডার হিসেবে কেন্দ্রীয় নির্দেশনায় নেতৃত্ব দেন। রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্টে সংঘর্ষ, পিকেটিং ও প্রতিরোধে নয়ন ও তার সহযোদ্ধাদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।
এর পর থেকেই নয়ন সরকারের “ক্রস লিস্টে” অন্তর্ভুক্ত হন বলে বিএনপি সূত্র জানায়।
তবে নয়নকে গ্রেফতার বা গুমের সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। তাকে পরে রাজধানীর খিলগাঁও তালতলা, মোহাম্মদপুর, সায়েন্সল্যাব, ও যাত্রাবাড়ীর বিভিন্ন স্থানে দেখা যায় — সাধারণ পোশাকে, কখনো সিএনজিতে, কখনো উবারের গাড়িতে বসে দলের পরবর্তী কর্মসূচির পরিকল্পনা সাজাতে।
—
“ডামি নির্বাচন” ও নয়নের লড়াই
বিএনপি নেতৃত্ব ২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনকে “ডামি নির্বাচন” হিসেবে আখ্যা দেয়। নয়ন ও তার সহযোগীরা এ নির্বাচনের সময় মাঠে প্রচার চালান, সরকারের বিরুদ্ধে “গণরোষ” সংগঠিত করতে সচেষ্ট ছিলেন। নির্বাচন শেষে শেখ হাসিনার দল পুনরায় ক্ষমতায় এলেও নয়নদের আন্দোলন থেমে যায়নি।
নির্বাচনের পর সাত মাসের মাথায় শুরু হয় কোটা সংস্কার আন্দোলন। সাধারণ ছাত্রদের ওপর হামলার ঘটনায় সারাদেশে প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়ে। বিএনপি ও ছাত্রদল এতে একাত্মতা ঘোষণা করে। ১৪ জুলাই প্রেসক্লাবের সামনে আন্দোলন সহিংস রূপ নেয়, আর ১৯ জুলাই শুক্রবার বিজয়নগর কালভার্ট ব্রিজ এলাকায় নয়ন ও নাছিরের নেতৃত্বে সংঘর্ষে দুইজন নিহত ও চারজন গুলিবিদ্ধ হয়।
বিএনপির মতে, এটি ছিল সরকারের দমননীতির প্রতিক্রিয়ায় এক “স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিরোধ”।
—
রাজপথে নয়নের অবিচল উপস্থিতি
রাজনৈতিক প্রতিকূলতা, মামলা, হামলা, গ্রেফতারের ভয় — কিছুই নয়নকে থামাতে পারেনি। তার সহযোদ্ধারা বলেন, “রাজপথ কখনো নয়নের সঙ্গে বেইমানি করেনি।”
৩ ও ৪ আগস্ট নয়নের নেতৃত্বে শাহবাগে অবস্থান কর্মসূচি পালিত হয়, যেখানে হাজারো নেতাকর্মী উপস্থিত থেকে “গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার” দাবি তোলেন।
দলীয় সূত্র জানায়, নয়নের রাজনীতিতে প্রবেশ ছিল সম্পূর্ণ আদর্শিক — কোনো লোভ, ব্যক্তিস্বার্থ বা পদমর্যাদার জন্য নয়, বরং গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকারের পক্ষে দৃঢ় অবস্থানের কারণে তিনি তরুণ প্রজন্মের কাছে প্রতীকে পরিণত হয়েছেন।
—
ইশরাক ইস্যু ও নয়নের সিদ্ধান্ত
ইশরাক হোসেন ইস্যুতে নয়ন যখন রাজপথে অবস্থান নেন, তখন দেশজুড়ে আন্দোলনের আগুন ছড়িয়ে পড়ে। মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যেই সরকারবিরোধী আন্দোলন নতুন গতি পায়। আন্তর্জাতিক মহলেও পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।
পরে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশে আন্দোলন সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়। নয়ন ও তার সহযোদ্ধারা সেই সিদ্ধান্ত মেনে ঘরে ফিরে সংগঠন পুনর্গঠনের কাজে মনোনিবেশ করেন।
—
১৭ বছরের সংগ্রাম ও বিশ্বাসের প্রতীক
রবিউল ইসলাম নয়ন দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে রাজপথে আছেন। বারবার গ্রেফতার, হামলা, গুলি, মিথ্যা মামলা — তবুও তিনি দলের সঙ্গে থেকে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন।
বিএনপির তৃণমূল নেতাদের মতে, নয়ন এখন “আন্দোলনের প্রতীক” — এমন এক নেতা যিনি দলের জন্য নিজের জীবন বাজি রেখেছেন।
নয়ন নিজেও একাধিকবার বলেছেন —
> “দলের সিদ্ধান্তই আমার সিদ্ধান্ত। আমরা আমাদের অভিভাবক ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জনাব তারেক রহমানের নির্দেশকেই শ্রদ্ধার সঙ্গে গ্রহণ করি।”
বিএনপির বক্তব্য
বিএনপি নেতারা বলেন, নয়নসহ অসংখ্য তরুণ নেতাই আজ গণতন্ত্রের জন্য লড়ছে। তারা কোনো ব্যক্তির শত্রু নয়, বরং অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পক্ষে দাঁড়িয়েছে।
দলটির মতে, নয়নের মতো নেতারা প্রমাণ করেছেন — গণতন্ত্রের মশাল রাজপথেই জ্বলবে, অফিসকক্ষে নয়।