তারিখ: ৭ অক্টোবর ২০২৫, সোমবার
প্রতিবেদন: জনতার কণ্ঠস্বর ডেস্ক
প্রকাশক: দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ
স্লোগান: জনতার কণ্ঠস্বর
ওয়েবসাইট: www.bangladeshprothomsangbad.com
যুব উন্নয়নে ২৯৭ কোটি টাকার হরিলুট: আওয়ামীপন্থী পরিচালক মোঃ আঃ হামিদ খানের নেতৃত্বে দুর্নীতির মহোৎসব, তদন্তে রাষ্ট্রীয় দায়ের প্রশ্ন
বাংলাদেশের তরুণ সমাজকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরের প্রতিশ্রুতি নিয়ে বাস্তবায়িত “ফ্রিল্যান্সার প্রশিক্ষণ প্রকল্প” এখন পরিণত হয়েছে এক ভয়াবহ দুর্নীতির কেলেঙ্কারিতে। সরকারি অর্থ আত্মসাতের এ প্রকল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের পরিচালক (বাস্তবায়ন, পর্যবেক্ষণ ও যুব সংগঠন) মোঃ আঃ হামিদ খান, যিনি দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী গোষ্ঠীর ঘনিষ্ঠ অনুসারী হিসেবে পরিচিত।
প্রকল্পটির বাজেট প্রথমে ছিল ১২৭ কোটি টাকা, যা প্রশাসনিক কৌশলে বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ২৯৭ কোটিতে। এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ও ব্যয়ের যুক্তিহীন খাতবিন্যাস এখন সরকারি দুর্নীতির নতুন মানদণ্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে।
—
ক্ষমতার অপব্যবহার ও লুটপাটের কৌশল
দলিল ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মোঃ আঃ হামিদ খান তার প্রভাব খাটিয়ে প্রকল্পের টেন্ডার, নিয়োগ এবং অর্থ বণ্টনে ইচ্ছামতো সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
অধিদপ্তরের ভেতর একটি গোপন সিন্ডিকেট গড়ে তুলে তিনি ঘনিষ্ঠ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে বেনিফিট দেন।
প্রকল্পের “সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট” ও “প্রশিক্ষণ সরঞ্জাম সরবরাহ”-এর নামে ব্যয় দেখানো হয়েছে ৫৮ কোটি টাকা, কিন্তু বাস্তবে সফটওয়্যারটি কোথাও চালু নেই, কোনো রেজিস্টার বা ট্রেনিং ডেটাবেজও পাওয়া যায়নি।
একইভাবে, প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলো অধিকাংশই “কাগজে-কলমে উপস্থিত” ছিল।
মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রশিক্ষণার্থীদের উপস্থিতি রেজিস্টার জাল করা হয়েছে, একই ব্যাচের তথ্য একাধিক জেলায় ব্যবহার করা হয়েছে, এমনকি অনেক প্রশিক্ষণ কখনও অনুষ্ঠিতই হয়নি।
বিদেশে অর্থ পাচার ও রাজনৈতিক সুরক্ষা
দুদক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (BFIU) ইতোমধ্যেই সন্দেহজনক লেনদেন চিহ্নিত করেছে। তদন্তে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, প্রকল্পের কিছু অর্থ দুবাই ও সিঙ্গাপুরে পাচার করা হয়েছে, যেখানে মোঃ আঃ হামিদ খান বা তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের নামে একাধিক লেনদেন ধরা পড়েছে।
অর্থ পাচারের এই প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক আশ্রয় ছিল স্পষ্ট। তিনি আওয়ামী লীগের যুব সংগঠনের কয়েকজন সাবেক নেতার মাধ্যমে উচ্চ পর্যায়ের সুরক্ষা পান, ফলে অধিদপ্তরের কর্মকর্তারাও চুপ থাকতে বাধ্য হন।
সূত্র বলছে, পূর্ববর্তী একাধিক প্রকল্পেও হামিদ খান একই ধাঁচে সরকারি অর্থ লোপাট করেছেন, কিন্তু রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে শাস্তি এড়াতে সক্ষম হন।
—
জাতীয় ক্ষতি ও তরুণদের প্রতি বিশ্বাসহানির দৃষ্টান্ত
এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ছিল তরুণদের ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আত্মকর্মসংস্থান নিশ্চিত করা, যা বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের একটি নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারত। কিন্তু বাস্তবে, প্রকল্পটি পরিণত হয়েছে রাজনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রিত অর্থলুটের মঞ্চে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের দুর্নীতি শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, বরং তরুণ প্রজন্মের সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতি বিশ্বাস ধ্বংস করছে।
“যুব উন্নয়নের নামে এমন হরিলুট রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তিকেও দুর্বল করে দিচ্ছে,”—বলেছেন এক অবসরপ্রাপ্ত অর্থ সচিব।
—
রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপের দাবি ও সম্ভাব্য আইনি পরিণতি
দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ-এর অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই প্রকল্পে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে একাধিক দলিল, ব্যাংক ট্রানজ্যাকশন ও সাক্ষ্য পাওয়া গেছে, যা আদালতে উপস্থাপনযোগ্য এবং দুদক, বাংলাদেশ ব্যাংক ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যৌথ তদন্তে সহজেই প্রমাণিত হতে পারে।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন,
> “যদি সরকারের সদিচ্ছা থাকে, মোঃ আঃ হামিদ খানের মতো উচ্চপদস্থ দুর্নীতিবাজদের এখনই অভিযুক্ত করা সম্ভব। এই মামলা ফৌজদারি আইনে সরাসরি ‘দুর্নীতি দমন আইন ১৯৪৭’-এর আওতায় বিচারযোগ্য।”
তারা আরও বলেন, এই তদন্ত যদি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তভাবে পরিচালিত হয়, তাহলে রাষ্ট্রীয় অর্থ পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি প্রশাসনে জবাবদিহিতার এক নতুন যুগ শুরু হতে পারে।
—
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যেখানে তরুণদের জন্য কর্মসংস্থানের সংকট ক্রমবর্ধমান, সেখানে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের এই প্রকল্পের দুর্নীতি কেবল অর্থনৈতিক অপরাধ নয়—এটি জাতির ভবিষ্যতের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা।