প্রতিবেদন:
মোঃ শাহজাহান বাশার, স্টাফ রিপোর্টার
ঢাকা, ১৮ জুন ২০২৫
রাজপথে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নামের ব্যানার ব্যবহার করলেও বাস্তবে একটি ভয়ংকর চক্রের কার্যক্রমের অভিযোগ উঠেছে ঢাকার মিরপুরে। রাজধানীর এই অঞ্চলে সংগঠনটির মহানগর অফিসকে ব্যবহার করা হচ্ছে টর্চার সেল হিসেবে। সরাসরি অভিযোগ, সেখানে ধরে নিয়ে গিয়ে নির্যাতন চালিয়ে ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে ব্ল্যাঙ্ক চেক, স্ট্যাম্প ও স্বাক্ষর আদায় করা হচ্ছে ভয়ভীতি ও বলপ্রয়োগের মাধ্যমে।
অভিযোগ উঠেছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ঢাকা মহানগর শাখার যুগ্ম আহবায়ক সাদমান সানজিদ ও রিফাতুল হক শাওনের বিরুদ্ধে। তাদের সহযোগী হিসেবে আছেন শাহ আলী থানার সদস্যসচিব পারভেজ এবং আরও ৮ থেকে ১০ জন সন্ত্রাসী সদস্য। এই চক্রটি সংগঠনের নাম ব্যবহার করে মিরপুর ও আশপাশের এলাকায় দাপটের সঙ্গে অপরাধ করে চলেছে বলে অভিযোগ করেছেন একাধিক ভুক্তভোগী।
দেশ টিভির একটি অনুসন্ধানী ভিডিও প্রতিবেদনে প্রকাশ, মিরপুরের ওই অফিসে মানুষকে ডেকে বা জোর করে ধরে এনে মারধর করে তাদের কাছ থেকে ব্ল্যাঙ্ক চেক, স্ট্যাম্প ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাগজে স্বাক্ষর নেওয়া হয়। এরপর সেসব কাগজ ব্যবহার করে চাঁদাবাজি, ভয়ভীতি দেখিয়ে অর্থ আদায় এবং প্রতারণা চালানো হয়।
ভিডিও ফুটেজ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে জানা যায়, এই গ্রুপের অধিকাংশ সদস্যই নিজেদের “এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের ছোট ভাই” পরিচয়ে পরিচিত করান। তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নাহিদের সঙ্গে তোলা ছবি প্রচার করে প্রভাব বিস্তার করেন এবং সরকারি-বেসরকারি দপ্তরের কর্মকর্তাদের কাছেও তদবির করেন বিভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে।
এই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে, সাংবাদিকরা মিরপুরে অবস্থিত প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের দপ্তরে যান। তিনি সরাসরি ক্যামেরার সামনে কথা বলতে রাজি না হলেও অনানুষ্ঠানিকভাবে জানান—এই চক্রটি নাহিদ ইসলামের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ছবি দেখিয়ে এবং আত্মীয় পরিচয় দিয়ে বদলি, নিয়োগ, বরাদ্দসহ বিভিন্ন বিষয়ে চাপ সৃষ্টি করে থাকেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এই চক্রটি রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরবতার সুযোগে বছরের পর বছর ধরে অনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। কোনো সংগঠনের নাম ব্যবহার করে এমন জঘন্য অপরাধ শুধু আইনের অপব্যবহারই নয়, গণতন্ত্র ও নাগরিক স্বাধীনতার ওপরও সরাসরি আঘাত।
ভুক্তভোগীরা বলছেন, তারা জীবনের নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। এমনকি অনেকে মামলা দায়েরের পরও হুমকি পাচ্ছেন। এই চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গেলে উপর মহলে প্রভাব খাটিয়ে মামলাগুলো আটকে রাখা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সাংবাদিক সমাজ, সুশীল নাগরিকরা ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছে:
“একটি ছাত্র সংগঠনের নাম ব্যবহার করে যদি কেউ অপহরণ, নির্যাতন ও চাঁদাবাজি চালায়, তা হলে তা শুধু অপরাধ নয়—রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড। দ্রুত তদন্ত করে সকল অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনতে হবে।”
এই ঘটনায় দেশের সব রাজনৈতিক দল, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার প্রতি আহ্বান জানানো হচ্ছে,
অবিলম্বে মিরপুরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অফিস বন্ধ করে সেখানে তদন্ত পরিচালনা করুন।
অভিযুক্তদের সম্পূর্ণ তালিকা তৈরি করে আইনের আওতায় আনুন।
নাহিদ ইসলামের নাম ও পরিচয় ব্যবহার করে কারা অপকর্ম করছে—তা খতিয়ে দেখুন।
সকল নির্যাতিত ও চাঁদাবাজির শিকার ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে বিচারিক সহায়তা দিন।
ছাত্র আন্দোলন মানেই ন্যায্য অধিকার, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, শোষিতের পক্ষে অবস্থান। কিন্তু আজ সেই ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’-এর মিরপুর অফিসে সাধারণ মানুষ টর্চার সেলের অভিজ্ঞতা নিচ্ছেন! এ যেন সংগঠনের আদর্শের সঙ্গে এক নির্মম ব্যঙ্গ।
এই অপকর্মের সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে কঠোর আইনি ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে আরও ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির জন্ম নিতে পারে। এখনই সময়, প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সমাজের বিবেকবান মানুষদের এগিয়ে আসার।