ভাস্কর হামিদুজ্জামান খানের মহাপ্রস্থান: এক সৃজনশীল যুগের অবসান
ঢাকা | ২০ জুলাই ২০২৫, রবিবার
মোঃ শাহজাহান বাশার, স্টাফ রিপোর্টার
বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতির আকাশ থেকে আরও একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র ঝরে পড়ল। বরেণ্য ভাস্কর ও গুণী চিত্রশিল্পী হামিদুজ্জামান খান আজ সকাল ১০টায় রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৯ বছর।
বেশ কিছুদিন ধরে নিউমোনিয়া ও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে তাঁকে আইসিইউতে, পরে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। আজ সকালে চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। তাঁর স্ত্রী, বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী আইভি জামান এই সংবাদটি নিশ্চিত করেন।
১৯৪৬ সালের ১৬ মার্চ কিশোরগঞ্জের সহশ্রাম গ্রামে জন্মগ্রহণকারী হামিদুজ্জামান খানের শিল্পচর্চা শুরু হয় ষাটের দশকে। মুক্তিযুদ্ধ, প্রকৃতি ও বিমূর্ত চিন্তার সংমিশ্রণে গড়ে ওঠা তাঁর শিল্পকর্ম হয়ে ওঠে বাংলাদেশের ভাস্কর্য শিল্পের এক উজ্জ্বল ব্যাখ্যা।
১৯৭০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ভাস্কর্য বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন তিনি এবং ২০১২ সাল পর্যন্ত শিক্ষকতা করেন। একজন প্রজ্ঞাবান শিল্পগুরু হিসেবে তিনি অসংখ্য শিল্পীর অনুপ্রেরণা হয়ে ছিলেন।
তাঁর নির্মিত বহু স্মরণীয় ভাস্কর্যের মধ্যে ‘একাত্তর স্মরণে’ (১৯৭৬), ‘সংশপ্তক’ (জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়), ‘হামলা’ (সিলেট ক্যান্টনমেন্ট), ‘শান্তির পায়রা’ (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) ও ‘পাখি পরিবার’ (বঙ্গভবন) উল্লেখযোগ্য। এসব কাজ শুধু নান্দনিকতা নয়, বরং দেশের রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক ইতিহাসের চিরন্তন দলিল।
আন্তর্জাতিক পরিসরে তাঁর ‘স্টেপস’ (Steps) ভাস্কর্যটি ১৯৮৮ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার সিউলে অলিম্পিক স্কাল্পচার পার্কে স্থান পায়—যা তাঁকে বিশ্বভূবনে পরিচিত করে তোলে।
হামিদুজ্জামান খানের চিত্রকলাতেও ছিল অভিনবত্ব ও গভীরতা। বিশেষ করে জলরঙ ও অ্যাক্রেলিক মাধ্যমে নিসর্গ ও মানবদেহের বিমূর্ত চিত্রায়নে তাঁর পারদর্শিতা তাঁকে একটি স্বতন্ত্র মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করে।
২০০৬ সালে তিনি একুশে পদক লাভ করেন। বাংলা একাডেমির ফেলো নির্বাচিত হন ২০২২ সালে। জাতীয় জাদুঘরের উদ্যোগে ২০১৭ সালে অনুষ্ঠিত হয় তাঁর কর্মজীবনের বিশাল রেট্রোস্পেকটিভ প্রদর্শনী ‘হামিদুজ্জামান খান ১৯৬৪–২০১৭’। দেশের বৃহত্তম শিল্প সংগঠনগুলোর অন্যতম সামিট গ্রুপ গাজীপুরে তাঁর ভাস্কর্য সংরক্ষণ করে গড়ে তুলেছে ‘ভাস্কর্য বাগান’—একটি জীবন্ত স্মারক।
১৯৭৬ সালে চিত্রশিল্পী আইভি জামানকে বিয়ে করেন হামিদুজ্জামান খান। তাঁদের দুই পুত্র—জুবায়ের জামান খান (আলোকচিত্রী) ও জারিফ হামিদুজ্জামান। এই শিল্পী পরিবার আজ কেবল একজন প্রিয়জন নয়, বরং বাংলাদেশের একটি সাংস্কৃতিক ইতিহাস হারাল।
শিল্পকলা একাডেমি ও চারুকলা অনুষদ তাঁর স্মরণে বিশেষ প্রদর্শনী ও শ্রদ্ধানুষ্ঠানের প্রস্তুতি নিচ্ছে। শিল্প-সংস্কৃতির জগত এই মহীরুহ শিল্পীর শূন্যতা দীর্ঘকাল অনুভব করবে। তাঁর মৃত্যু শুধু একজন শিল্পীর প্রস্থান নয়, বরং একটি ধারাবাহিক সৃজনশীল আন্দোলনের পরিণতি।
তার চিরবিদায় যেন আমাদের আরও গভীরভাবে শিল্পের শক্তিকে উপলব্ধি করায়—যে শক্তি জাতির আত্মা নির্মাণ করে।