বিশেষ অনুসন্ধান প্রতিবেদন
বিমানবাহিনীর কোটি কোটি টাকার দুর্নীতির পেছনের মাস্টারমাইন্ড—সাবেক বিমানপ্রধান আব্দুল হান্নান
অনলাইন ডেস্ক :ঢাকা, জুলাই ২০২৫:
বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সাম্প্রতিক ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত ও বিতর্কিত নাম—সাবেক বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল (অব.) আব্দুল হান্নান। দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্ত ও বিভিন্ন অপ্রকাশিত সামরিক সূত্রের বরাতে জানা যাচ্ছে, ২০২১ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিমানবাহিনীর বাজেট বরাদ্দের একটি বিশাল অংশ আত্মসাৎ করেছেন তিনি এবং তার ঘনিষ্ঠ একটি সিন্ডিকেট।
১২ই জুন ২০২১, হান্নান দায়িত্ব গ্রহণ করেন এয়ার চিফ মার্শাল মাসিহুজ্জামান সেরনিয়াবাতের কাছ থেকে। এরপর ২০২৪ সালের ১১ই জুন অবসরে যান। এই সময়ের মধ্যে বিমানবাহিনীর বাজেট ছিল প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার মতো। অভিযোগ, শুধুমাত্র তিনটি বাজেট চক্র থেকে হান্নান ও তার সিন্ডিকেট প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতিতে জড়িত।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিমাণ অর্থ দিয়ে অন্তত চারটি জে-১০সি যুদ্ধবিমান (পূর্ণ প্যাকেজ সহ) সংগ্রহ সম্ভব হতো। কিন্তু সেই অর্থের একটি বড় অংশ গায়েব হয়ে যায় ভুয়া চুক্তি, অতিমূল্যায়নকৃত সরঞ্জাম কেনাকাটা এবং ভুয়া ট্রেনিং প্রোগ্রামের নামে।
দুর্নীতির ধরন ও পদ্ধতি
তদন্তে উঠে এসেছে হান্নান সিন্ডিকেট কিছু নির্দিষ্ট ঠিকাদার এবং মধ্যস্বত্বভোগী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে:
বিমান চালানোর জন্য ব্যবহৃত ট্রেইনার ও কমব্যাট জেটের কাল্পনিক মেরামত খরচ দেখায়
যন্ত্রাংশ ও রক্ষণাবেক্ষণে অতিমূল্যায়ন করে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করে
বিদেশি প্রশিক্ষণ ও গবেষণায় মনগড়া ব্যয় দেখায়
অনিয়মিত নিয়োগ ও পদোন্নতিতে অবৈধ লেনদেন করে অর্থ উপার্জন করে
দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা ও তদন্ত অগ্রগতি
২০২৫ সালের মে মাসে দুর্নীতির প্রমাণ সামনে আসার পর হান্নান, তার স্ত্রী এবং সন্তানদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করে বাংলাদেশ সরকার। এরপর দুর্নীতি দমন কমিশন তার বিরুদ্ধে প্রাথমিক তদন্ত শুরু করে। কিন্তু এখন পর্যন্ত তার অবস্থান শনাক্ত করা যায়নি—তিনি পলাতক।
বিশ্বস্ত সূত্র জানায়, তার বিরুদ্ধে একটি পরিপূর্ণ চার্জশিট তৈরি করার মতো তথ্যপত্র সংগ্রহে কাজ করছে কয়েকটি গোয়েন্দা সংস্থা।
⚖️ রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও জনজীবনে প্রভাব
এই দুর্নীতির ফলে শুধু রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়নি, দেশের মেধাবী পাইলটদের জীবন বিপন্ন হয়েছে। মানসম্পন্ন প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তি না থাকার কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়েছে। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া উত্তরার মাইলস্টোন কলেজ দুর্ঘটনা, যেখানে একটি প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হয়, তা এই দুর্বল ও দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থার প্রতিচ্ছবি বলেই মনে করছেন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা।
বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা বাহিনী বরাবরই গর্বের প্রতীক। কিন্তু এই ধরনের কিছু দুর্নীতিগ্রস্ত ও আত্মকেন্দ্রিক ব্যক্তির কারণে গোটা বাহিনী প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। সাবেক বিমানপ্রধান হান্নান এবং তার সহযোগীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও বিচারের আওতায় আনাই এখন সময়ের দাবি।
তারিখ: ২১ জুলাই ২০২৫
ক্যাটাগরি: দুর্নীতি, প্রতিরক্ষা, অনুসন্ধান রিপোর্ট