ফেসবুকে ‘হ্যাঁ–না’ ঝড়: গণভোট ইস্যুতে জনমতের ভার্চুয়াল লড়াই
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ডেস্ক
সময় অনুসন্ধান টিম | ২৮–৩০ অক্টোবর ২০২৫
বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ততই বাড়ছে তোলপাড়। সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে ‘হ্যাঁ’ ও ‘না’ লেখা সংক্ষিপ্ত পোস্ট। প্রথমে এটি সাধারণ অনলাইন ট্রেন্ড মনে হলেও তদন্তে দেখা গেছে, এই পোস্টগুলো আসলে আসন্ন গণভোট প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা নতুন রাজনৈতিক প্রচারণার অংশ।
২০২৫ সালের ২৮ অক্টোবর বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নির্বাচন কমিশনের কাছে ১৮ দফা প্রস্তাব জমা দেয়। এর অন্যতম প্রস্তাব ছিল নভেম্বর মাসে জাতীয় নির্বাচনের আগে একটি গণভোট আয়োজনের আহ্বান। এই ঘোষণার পর থেকেই রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন এক উত্তাপ তৈরি হয়।
বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলসহ দলের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের নেতারা সরাসরি গণভোট প্রস্তাবের বিরোধিতা করে ফেসবুকে ‘না’ প্রচারণা শুরু করেন। নেতৃবৃন্দের অনেকেই নিজেদের টাইমলাইনে কেবল একটি শব্দ — “না” — লিখে রাজনৈতিক অবস্থান জানান দিচ্ছেন। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোর নিচু পর্যায়ের স্থানীয় ও আঞ্চলিক নেতারা ‘হ্যাঁ’ পোস্ট দিয়ে গণভোটের পক্ষে মত জানাচ্ছেন। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একধরনের ভার্চুয়াল বিভাজন তৈরি হয়েছে।
একই সময়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনও ‘হ্যাঁ’ প্রচারণায় অংশ নেয়। তাদের ভেরিফায়েড পেজে দেওয়া একটি ‘হ্যাঁ’ পোস্ট অল্প সময়েই ভাইরাল হয়ে পড়ে। অন্যদিকে ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছিরের ‘না’ পোস্টটিও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে যায়। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই উভয় পক্ষের পোস্টে হাজার হাজার প্রতিক্রিয়া, মন্তব্য ও শেয়ার জমা পড়ে।
সময় অনুসন্ধান টিমের তথ্য অনুযায়ী, গত ৪৮ ঘণ্টায় দেশে প্রায় ২৭ লাখ ফেসবুক ব্যবহারকারী এই ইস্যুতে সরাসরি অংশ নিয়েছেন। এর মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশ পোস্ট ছিল ‘না’ অবস্থানের পক্ষে, ৩০ শতাংশ ‘হ্যাঁ’ পক্ষে এবং বাকি অংশ নিরপেক্ষ বা পর্যবেক্ষণমূলক।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনও একই সময়ে নির্বাচনের আগে গণভোট আয়োজনের পক্ষে মত দেয়। কমিশনের সহসভাপতি ড. আলী রীয়াজ জানিয়েছেন, সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়—এমন ৪৮টি বিষয়ে জনগণের মতামত জানতেই গণভোটের প্রস্তাব করা হয়েছে। এই সুপারিশ ইতিমধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। কমিশনের পক্ষ থেকে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের তাগিদও দেওয়া হয়েছে।
তদন্তে আরও জানা গেছে, ফেসবুকে ‘না’ প্রচারণায় সক্রিয় রয়েছে প্রায় ১,২০০ রাজনৈতিক পেজ ও গ্রুপ, যার বড় অংশ বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। অন্যদিকে ‘হ্যাঁ’ প্রচারণায় অংশ নিচ্ছে প্রায় ৭০০ গ্রুপ ও পেজ, যেগুলোর অধিকাংশই জামায়াতপন্থী তরুণ ও জুলাই আন্দোলনের ছাত্রনেতাদের দ্বারা পরিচালিত। প্রায় ৩৮ শতাংশ ব্যবহারকারী সরাসরি কোনো দলের সঙ্গে যুক্ত নন, বরং কৌতূহলবশত আলোচনায় অংশ নিচ্ছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. মোহিত রহমান মনে করেন, এই ‘হ্যাঁ–না’ প্রচারণা কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রবণতা নয়, এটি জনমত নির্ধারণের এক নতুন মাত্রা। তার ভাষায়, “তরুণ প্রজন্ম এখন রাজনীতিতে অংশ নিচ্ছে কিবোর্ডের মাধ্যমে। তাদের মতামত ভবিষ্যৎ ভোটের আচরণেও প্রতিফলিত হবে।”
অন্যদিকে সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, কিছু ভুয়া পেজ থেকে বিভ্রান্তিকর গণভোট সম্পর্কিত তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। কর্তৃপক্ষ এ ধরনের প্রচেষ্টা পর্যবেক্ষণ করছে এবং তদন্তও চলছে।
রাজনৈতিক মহলে ধারণা তৈরি হয়েছে, ফেসবুকে এই ‘হ্যাঁ–না’ প্রতিযোগিতা আসন্ন নির্বাচনের জনমতকে প্রভাবিত করতে পারে। বিশেষত তরুণ ভোটারদের মধ্যে অনলাইন প্রচারণার প্রভাব দিন দিন বাড়ছে।
এই ভার্চুয়াল আন্দোলন শুধু রাজনৈতিক অবস্থান প্রকাশ নয়; এটি বাংলাদেশের গণতন্ত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্রমবর্ধমান প্রভাবেরও প্রতিফলন। জনমত এখন কেবল মাঠে নয়, স্ক্রিনেও তৈরি হচ্ছে — এবং সেই স্ক্রিনের প্রতিফলনই হয়তো ভবিষ্যতের রাজনীতির দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করবে।
রিপোর্ট প্রস্তুত: সময় অনুসন্ধান টিম
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ডেস্ক
তথ্যসংগ্রহকাল: ২৮–৩০ অক্টোবর ২০২৫
—