বিশেষ প্রতিনিধি :
প্রভাবশালী যুবদল নেতাদের ছত্রচ্ছায়ায় নোয়াখালীর সুবর্ণচরে ‘মেম্বার পার্টি’র ভয়াবহ ভূমি দখল: টিপসই দলিলের অজুহাতে ১৮ হিন্দু পরিবার ও মন্দির উচ্ছেদের ষড়যন্ত্র, নিশ্চুপ প্রশাসন!
সুবর্ণচরে স্বঘোষিত ‘মেম্বার’ পদবীধারী একটি সংঘবদ্ধ অপরাধী ও দখলদার চক্রের পরিকল্পিত তাণ্ডবে চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়। স্থানীয়ভাবে ‘মেম্বার পার্টি’ নামে পরিচিত এই চক্রটি ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলের অস্পষ্ট ও ভুয়া টিপসই দলিলকে পুঁজি করে বাংলাদেশ সরকার স্বীকৃত আধুনিক নামজারী, রেজিস্ট্রি করা খতিয়ান ও বৈধ দলিল থাকা সত্ত্বেও সাধারণ নিরীহ মানুষকে ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করার পায়তারা চালাচ্ছে। উপজেলার ৬নং চর আমানউল্লাহ ইউনিয়নের ৫ নং ওয়ার্ডে বসবাসরত ১৮টি সংখ্যালঘু হিন্দু পরিবার ও একটি ঐতিহাসিক রাধামাধব মন্দিরের জমি দখলের চক্রান্তে মেতে উঠেছে এই সিন্ডিকেট। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে এদের অত্যাচার, নিয়মিত প্রাণনাশের হুমকি ও চাঁদাবাজির মুখে ভূক্তভোগীরা জমিতে চাষাবাদ বা বাড়িঘর নির্মাণ তো দূরে থাক, প্রাণভয়ে দিন কাটাচ্ছেন। আইন-আদালত ও থানা-পুলিশ করেও মিলছে না কোনো প্রতিকার; বরং প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নীরব ভূমিকা এই ভুমিখেকো সন্ত্রাসীদের আরও বেপরোয়া করে তুলেছে।
রাজনৈতিক চতচ্ছায়ায় ভয়ংকর ভুমিখেকো সিন্ডিকেট
প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, চরম বিতর্কিত ও সন্ত্রাসী এই ‘মেম্বার পার্টি’র মূল নেতৃত্বে রয়েছে চরবাটা ইউনিয়ন যুবদলের সাধারণ সম্পাদক নুর মোহাম্মদ ভুট্টু ওরফে ভুট্টু মেম্বার। তার মূল সহযোগী হিসেবে এলাকায় অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে চর আমানউল্যা ইউনিয়ন যুবদলের সাধারণ সম্পাদক জুম্মন মেম্বার, সুবর্ণচর উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক বেলাল হোসেন সুমন ওরফে সুমন মেম্বার এবং অনোয়ার মেম্বার ও মনির মেম্বার সহ একদল সংঘবদ্ধ ক্যাডার বাহিনী। রাজনৈতিক পদ-পদবী ও স্থানীয় ক্ষমতার প্রভাব খাঁটিয়ে তারা দীর্ঘদিনের বসবাসকারীদের জমিকে নিজেদের দাবি করে লাখ লাখ টাকা চাঁদা হাঁকাচ্ছে। চাঁদা না দিলে হামলা, ভাঙচুর ও সপরিবারে হত্যার হুমকি দেওয়া নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
ষাটোর্ধ্ব জ্যোতিবালা বৈষ্ণবী নিরুদ্দেশ: ভিটেমাটি দখল করে অন্য পরিবারকে বসালো মেম্বার পার্টি
৬০ বছরের সংসারত্যাগী, নিঃস্ব নারী জ্যোতিবালা বৈষ্ণবীর জীবনকাহিনী এই চক্রের নিষ্ঠুরতার এক জলন্ত দলিল। ১৯৯০-এর দশক থেকে নিজস্ব জমি ও বৈধ দলিল নিয়ে বসবাস করে আসা এই বৃদ্ধা নিজের ভাঙাচোরা ঘর মেরামতের জন্য বাড়ির কয়েকটি গাছ বিক্রি করেছিলেন। কিন্তু গাছ বিক্রির টাকা হাতে পাওয়ার আগেই সুবর্ণচর উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক বেলাল হোসেন সুমন ওরফে সুমন মেম্বার জোরপূর্বক সেই টাকা ছিনিয়ে নিয়ে যায়। এরপর ঘর মেরামতের জন্য মিস্ত্রি আনলে ক্যাডাররা তাদের তাড়িয়ে দেয় এবং জ্যোতিবালার কাছে ৭ লক্ষ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে স্থানীয় প্রতিনিধিরা তার মানবেতর জীবনযাপন প্রত্যক্ষ করে এলেও, ২০২৫ সালের শেষে পুনরায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ভয়ভীতি ও অত্যাচারে জ্যোতিবালা বৈষ্ণবী বাধ্য হয়ে নিরুদ্দেশ হয়ে গেছেন। আর তার সেই ভিটেবাড়িতে মেম্বার পার্টি এক উদ্বাস্তু পরিবারকে বসিয়ে সম্পূর্ণ জমিটি অবৈধভাবে দখল করে নিয়েছে।
ছাদ ঢালাইয়ের পর নিপু রানীর বাড়ি দখল ও দফায় দফায় সশস্ত্র হামলা
মেঘনার ভাঙনে চারবার নিঃস্ব হওয়া নিপু রানী সাহা জীবনসংগ্রামের তাগিদে একটি এনজিওতে চাকরি শুরু করেন। দীর্ঘ ৩০ বছর ভাড়া বাসায় কষ্টার্জিত অর্থ জমিয়ে ২০০৮ সালে স্বামী স্বপন চন্দ্র সাহার নামে সুবর্ণচর উপজেলার চর বজলুল করিম মৌজায় ৩৭ ৩৫ নং দলিল মূলে ১০ শতাংশ জমি ক্রয় করেন (যার বি.এস. খতিয়ান নং ১৬৮০ ও দাগ নং ২২৯)। ২০২৩ সাল থেকে নির্মাণকাজ শুরু করে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের আগে কঠোর পরিশ্রমে ছাদ ঢালাই পর্যন্ত সম্পন্ন করেন।
কিন্তু রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরপরই মোজাম্মেল নামের এক স্থানীয় ব্যক্তির মাধ্যমে ভুট্টু মেম্বার নিপু রানীকে জানান, ওই জমির মালিক ভুট্টু নিজেই! হয় তাদের কাছ থেকে পুনরায় জমি কিনতে হবে, নয়তো বিক্রি করে এলাকা ছেড়ে চলে যেতে হবে। নিপু রানী যুবদল নেতা সুমন মেম্বারের কাছে বিচার চাইলে তিনি উল্টো ভুট্টুর সাথে বায়না চুক্তি করার পরামর্শ দেন। নিপু রানী এতে অসম্মতি জানালে তার রাজমিস্ত্রি শাহাদাত ভয়ে কাজ বন্ধ করে দেন। পরবর্তীতে অন্য মিস্ত্রি আনলে ভুট্টু মেম্বারের ভাই মনির মেম্বার ও যুবদল নেতা জুম্মন মেম্বারের নেতৃত্বে অতর্কিত সশস্ত্র হামলা চালানো হয়।
৩০ জুন সকালে প্রথম হামলার সময় জুম্মন মেম্বার নিপু রানী ও তার ছেলে রুদ্র সাহাকে প্রকাশ্যে গুলি করে ও কুপিয়ে হত্যার হুমকি দেয়। নিপু রানী চর জব্বর থানায় লিখিত অভিযোগ দিলে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল হাসান অভিযুক্ত ভুট্টু মেম্বারকে থানায় হাজির করেন। পরবর্তীতে সুবর্ণচর উপজেলা প্রেসক্লাবের সমন্বয়ে একাধিক সালিশি বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও ভুট্টু মেম্বার একটি মনগড়া মামলার কপি ছাড়া মালিকানার স্বপক্ষে কোনো বৈধ কাগজপত্র উপস্থাপন করতে পারেনি। সর্বসম্মতিক্রমে ওসির উপস্থিতিতে লিখিত অঙ্গীকারনামা দিয়ে নিপু রানীকে নির্মাণকাজ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
তবে সেই অঙ্গীকারনামাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ২২ আগস্ট শনিবার সকালে পুনরায় কাজ শুরু করলে ভুট্টু মেম্বারের নেতৃত্বে যুবদল কর্মী মনির, জুম্মন, সুমন, কামাল ও নূর মাওলাসহ ১৫-২০ জনের একদল ক্যাডার দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে হামলা চালায়। নিপু রানীকে হত্যার চেষ্টা করা হয়, মিস্ত্রিদের নির্মমভাবে মারধর করে নির্মাণ সামগ্রী ও সিমেন্টের বস্তা পানিতে ফেলে দেওয়া হয়। ঘটনা চলাকালীন জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ বারবার কল করা হলেও পুলিশ কোনো সহায়তা প্রদান করেনি বলে নিপু রানী চরম ক্ষোভের সাথে জানান।
জীবনঝুঁকিতে পলি রানী ও রাধামাধব মন্দির কমিটি
একই দাগে সবচেয়ে বেশি জমির মালিক পলি রানী সাহা। সম্প্রতি সরকারি তহসিল অফিসের কর্মকর্তারা যখন তদন্তে আসেন, তখন সরকারি কর্মকর্তাদের সামনেই বিদেশফেরত স্বামীসহ পলি রানীকে প্রাণনাশের হুমকি দেয় সন্ত্রাসীরা। থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করলেও নিরাপত্তার কোনো ব্যবস্থা করা হয়নি। বর্তমানে উল্টো পলি রানীর বিরুদ্ধে মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা ঠুকে দেওয়া হয়েছে। আদালতের বারান্দায় ঘুরতে থাকা পলি রানী দৃপ্ত কণ্ঠে বলেন, প্রয়োজনে গহনা বিক্রি করে আইনি লড়াই চালাবো, তবুও এই সন্ত্রাসী ও ভুমিখেকোদের কাছে মাথা নত করবো না।”*
এদিকে স্থানীয় রাধামাধব মন্দির কমিটির সভাপতি অনিমেষ দাস জানান, যে জমিতে বহুবছর ধরে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা নিয়মিত পূজা-অর্চনা করে আসছেন, ২০২৪ সালের পর থেকে নুর মোহাম্মদ ভুট্টু ও তার সশস্ত্র দলবল সেই ঐতিহাসিক মন্দিরটি সরিয়ে নেওয়ার জন্য প্রকাশ্যে হুমকি দিচ্ছে এবং মন্দিরের চলমান সব নির্মাণকাজ জোরপূর্বক বন্ধ করে দিয়েছে।
প্রতিরোধের এক উজ্জ্বল ব্যতিক্রম: কাস্তে হাতে রেখা রানী
সব অন্যায়, নির্যাতন ও হতাশার মাঝেও এক অনন্য উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন রেখা রানী। নিরক্ষর এই সাহসী নারী জমিতে মূল মালিকের ওয়ারিশ হিসেবে নিজের অবস্থান থেকে একচুলও সরে দাঁড়াননি। হাতে কাস্তে নিয়ে ধান কাটা আর কোদাল হাতে মাটি কাটার সংকল্প নিয়ে মেম্বার পার্টির সশস্ত্র হুমকির মুখোমুখি হয়েছেন তিনি। স্থানীয়দের মতে, সমগ্র ইউনিয়নে একমাত্র এই অদম্য নারীর সাহস ও শক্ত অবস্থানের কাছেই আপাতত পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে ভয়ংকর ‘মেম্বার পার্টি’।
-আইনের লঙ্ঘন ও অপরাধের বিবরণ (ফৌজদারি ও ভূমিসংক্রান্ত আইন):
ভূক্তভোগীদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী গুরুতর ও জামিনঅযোগ্য অপরাধ। এই সন্ত্রাসী চক্রের বিরুদ্ধে অবিলম্বে নিচের ধারাগুলোতে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া আবশ্যক:
1.চাঁদাবাজি ও ভয়ভীতি প্রদর্শন (দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ৩৮৪ ও ৫০৬ ধারা): ঘর মেরামত ও জমিতে বসবাসের জন্য ৭ লক্ষ টাকা দাবি এবং নিয়মিত ভয়ভীতি দেখানোর দায়ে আসামিদের সর্বোচ্চ ৩ থেকে ৭ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান রয়েছে।
2.জোরপূর্বক জমি দখল ও অনুপ্রবেশ (দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ৪৪৭ ও ৪৪৮ ধারা):
অন্যের বৈধ স্বত্বাধিকারযুক্ত জমিতে অনধিকার প্রবেশ ও জোরপূর্বক ভিটেমাটি দখলের অপরাধে অপরাধীদের জেল ও জরিমানা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।
3. বেআইনি সমাবেশ ও দাঙ্গা (দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ১৪৩, ১৪৭ ও ১৪৮ ধারা):
* ১৫-২০ জন সশস্ত্র লোক দলবদ্ধ হয়ে মারধর, তাণ্ডব ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালানোর কারণে চক্রটির বিরুদ্ধে দাঙ্গা ও বেআইনি সমাবেশের অপরাধ পূর্ণাঙ্গভাবে প্রমাণিত হয়।
4. খুনের চেষ্টা ও মারধর (দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ৩২৪, ৩২৫ ও ৩০৭ ধারা):**
* প্রকাশ্যে নিপু রানী সাহাকে হত্যাচেষ্টা, রাজমিস্ত্রিদের মারধর এবং ধারালো বা দেশীয় অস্ত্র ব্যবহারের দায়ে ৩০৭ ধারায় যাবজ্জীবন বা ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে।
5. সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি সাধন (দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ৪২৭ ধারা):**
* নির্মাণ সামগ্রী নষ্ট করা, সিমেন্ট পানিতে ফেলে দেওয়া ও ঘরবাড়ির ক্ষতিসাধন করায় ৪২৭ ধারায় আইনি বিচার প্রক্রিয়া চালায় বিচারালয়।
6. ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩:**
* ২০২৩ সালে প্রণীত নতুন আইন অনুযায়ী ভুয়া বা অপ্রাসঙ্গিক নথিপত্র দেখিয়ে জমি দাবি করা, বলপ্রয়োগ করে জমি দখল রাখা এবং প্রদেয় জমি থেকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ করা সরাসরি একটি গুরুতর অপরাধ। এই আইনের অধীন অপরাধীরা ২ থেকে ৭ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডে দণ্ডিত হতে পারে।
আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জোর দাবি
ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) জানান, প্রশাসন বিষয়টি সম্পর্কে পূর্ণ অবগত এবং ভূক্তভোগীদের নামজারী ও রেজিস্ট্রি করা কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করা হয়েছে। ভূক্তভোগী পরিবারগুলোকে সর্বোচ্চ আইনি সহায়তা প্রদানের আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।
তবে স্থানীয় সচেতন মহল ও ভুক্তভোগী সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের দাবি—শুধু আশ্বাস নয়, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপে অনতিবিলম্বে চর জব্বর থানায় মামলা দায়ের করে নুর মোহাম্মদ ভুট্টু, জুম্মন, সুমন ও মনিরের মতো সন্ত্রাসী ভূমিখেকোদের দ্রুত গ্রেফতার করতে হবে। অন্যথায় একজন নিঃস্ব নারীর মতো পুরো এলাকার সংখ্যালঘু পরিবারগুলো নিজ জন্মভূমিতে উদ্বাস্তুতে পরিণত হবে, যা স্বাধীন দেশের আইনের শাসনের জন্য এক চরম চাটুকারিতা ও কলঙ্কজনক অধ্যায়।