বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদক | দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ
দিনাজপুর:
দিনাজপুর সদর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘নশিপুর দ্বিমুখী হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ’-এ বর্তমানে অনিয়ম, দুর্নীতি, প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতা এবং অব্যবস্থাপনার এক নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে। প্রতিষ্ঠানটির ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ভূপেশ চন্দ্র রায়ের বিরুদ্ধে শ্রেণিকক্ষে অনিয়মিত পাঠদান, শিক্ষকদের হাজিরা দিয়ে পলায়ন, বিদ্যালয়ের অর্থ আত্মসাৎ এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের প্রশাসনিক ও আইনি নির্দেশ অমান্য করার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এনে শিক্ষা প্রশাসন ও সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে পৃথক দুটি লিখিত আবেদন জমা দেওয়া হয়েছে।
একটি অভিযোগ সাধারণ শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের নামে গণস্বাক্ষরযুক্ত এবং অপরটি করেছেন এলাকার স্বনামধন্য দাতা পরিবারের সন্তান, বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. নজরুল ইসলাম। এই জোড়া অভিযোগের অনুলিপি দিনাজপুর জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী অফিসার, দিনাজপুর-৩ আসনের জাতীয় সংসদ সদস্য এবং জেলা শিক্ষা অফিসারের দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির এই চরম বিশৃঙ্খলার নেপথ্যে প্রচলিত আইন, আদালত এবং ফৌজদারি দণ্ডবিধির দৃষ্টিতে যেসব গুরুতর অপরাধ সংঘটিত হয়েছে এবং অভিযুক্তদের যে ধরনের শাস্তির বিধান রয়েছে, তার একটি বিস্তারিত বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো।
১. অভিভাবকদের গণস্বাক্ষরযুক্ত আবেদনে বেরিয়ে এলো প্রাতিষ্ঠানিক ধস
দিনাজপুর সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার বরাবর পেশকৃত প্রথম আবেদনে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ভূপেশ চন্দ্র রায়ের বিরুদ্ধে চরম প্রশাসনিক স্থবিরতা ও দুর্নীতির প্রতিকার চাওয়া হয়েছে।
শিক্ষার মান তলানিতে: অভিভাবকদের অভিযোগ অনুযায়ী, প্রায় আট মাস পূর্বে ভূপেশ চন্দ্র রায় ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই প্রতিষ্ঠানটির সামগ্রিক শিক্ষা কার্যক্রম মুখ থুবড়ে পড়েছে। নিয়মিত ও মানসম্মত পাঠদান বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীরা চরম বিপাকে পড়েছে।
হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর ও পলায়ন: প্রধান শিক্ষকসহ একটি নির্দিষ্ট শিক্ষক সিন্ডিকেট সকালে হাজিরা খাতায় নাম স্বাক্ষর করেই বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ ত্যাগ করেন। ফলে ক্লাস রুমগুলো শিক্ষকশূন্য থাকে এবং শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।
গণহারে শিক্ষার্থী স্থানান্তর: পরিবেশ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে অনেক অভিভাবক তাঁদের সন্তানদের অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। যেসব দরিদ্র পরিবারের পক্ষে সন্তান স্থানান্তর সম্ভব নয়, তাদের ভবিষ্যৎ আজ অনিশ্চয়তার মুখে।
অর্থ আত্মসাৎ:প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন তহবিল ও সরকারি অনুદાન থেকে কোনো নিয়মনীতি না মেনে লক্ষাধিক টাকা যথেচ্ছভাবে তছরুপ ও আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে জোরালো দাবি করা হয়েছে।
২. বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. নজরুল ইসলামের আবেদন: দাতার রক্ত ও ঘামের ইতিহাস মুছে ফেলার চক্রান্ত
দ্বিতীয় চাঞ্চল্যকর আবেদনটি করেছেন নশিপুর ডাক্তারপাড়ার নিবাসী, প্রয়াত ডা. ফেরাজ উদ্দিনের সুযোগ্য পুত্র—বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. নজরুল ইসলাম (৬৭)।
৩.০৫ একর জমি দানের ইতিহাস: আবেদনপত্রে তিনি উল্লেখ করেন যে, তাঁর প্রয়াত পিতা ডা. ফেরাজ উদ্দিন স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে ৩.০৫ একর মহার্ঘ জমি দান করেছিলেন, যার ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে নশিপুর প্রাইমারি স্কুল এবং বর্তমান নশিপুর দ্বিমুখী হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ।
নাম নিশানা মুছে ফেলার অপচেষ্টা:প্রাথমিক বিদ্যালয়টিতে দাতার নাম পাথরে খোদাই করে সংরক্ষিত থাকলেও, হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজের কোনো সাইনবোর্ড, ফলক বা নথিতে দাতা পরিবারের ন্যূনতম স্বীকৃতি বা নাম রাখা হয়নি।
* প্রশাসনিক নির্দেশ অমান্য: ইতিপূর্বে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন থেকে দাতা পরিবারের নাম ফলক ও নথিতে সংযুক্ত করার স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হলেও ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ভূপেশ চন্দ্র রায় রহস্যজনক কারণে সেই নির্দেশ সম্পূর্ণ উপেক্ষা ও অমান্য করে আসছেন।
৩. প্রশাসনিক নির্দেশ অমান্য এবং উৎকোচের বিনিময়ে অপরাধ ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগ**
উভয় আবেদনপত্রে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ কার্যকর না করার গুরুতর অপরাধের চিত্র উঠে এসেছে।
বরখাস্তের আদেশ ধামাচাপা: বাংলা বিষয়ের শিক্ষক মো. মেরাজুল ইসলাম মেরাজ (মেরাজ সোনা) সহ সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের এর পূর্বে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের দপ্তর থেকে বরখাস্ত বা অব্যাহতি দেওয়ার লিখিত নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
ঘুষের বিনিময়ে পুনর্বহাল: কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ভূপেশ চন্দ্র রায় মোটা অঙ্কের উৎকোচের বিনিময়ে সেই প্রশাসনিক নির্দেশ বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ওই অভিযুক্ত শিক্ষকদের পুনরায় ক্লাসে পাঠদান অব্যাহত রাখার সুযোগ করে দিয়েছেন।
৪. আইনি ও আদালতের দৃষ্টিতে অপরাধ এবং সম্ভাব্য শাস্তির বিধান
নশিপুর দ্বিমুখী হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ভূপেশ চন্দ্র রায়ের বিরুদ্ধে আনীত সুনির্দিষ্ট অভিযোগগুলো কেবল প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়মের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এগুলো বাংলাদেশের প্রচলিত ফৌজদারি আইন, পেনাল কোড (দণ্ডবিধি), এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের দৃষ্টিতে মারাত্মক অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। আইন ও আদালতের দৃষ্টিতে অভিযুক্তদের সম্ভাব্য শাস্তি ও আইনি পরিণতি নিচে বিশ্লেষণ করা হলো:
ক. সরকারি প্রশাসনিক ও আদালতের নির্দেশ অমান্য (দণ্ডবিধির ১৮৮ ধারা):
উপজেলা নির্বাহী অফিসারের দপ্তর থেকে শিক্ষক বরখাস্তের যে স্পষ্ট প্রশাসনিক ও লিখিত নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, তা অমান্য করার কারণে দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ১৮৮ ধারা অনুযায়ী অপরাধ সংঘটিত হয়েছে।
সম্ভাব্য শাস্তি: এই ধারার অপরাধ প্রমাণিত হলে অপরাধীর সর্বোচ্চ ৬ মাস পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড অথবা ১ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা**, অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন।
খ. অর্থ আত্মসাৎ ও তহবিল তছরুপ (পেনাল কোডের ৪০৯ ও ৪২০ ধারা এবং দুদক আইন):
ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ভূপেশ চন্দ্র রায় বিদ্যালয়ের তহবিল ও সরকারি অনুদানের অর্থ আত্মসাৎ করায় তা পেনাল কোডের ৪০৯ ধারা(বিশ্বাসভঙ্গ বা ক্রিমিনাল ব্রিচ অব ট্রাস্ট) এবং ৪২০ ধারা (প্রতারণা)-র আওতায় পড়ে।
সম্ভাব্য শাস্তি:৪০৯ ধারায় দোষী প্রমাণিত হলে আদালত আসামিকে **যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অথবা ১০ বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড,এবং অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করতে পারেন। পাশাপাশি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আইনের আওতায় বিশেষ জজ আদালতে বিচার সম্পন্ন করে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে।
গ. দাতা পরিবারের নাম ও অধিকার অস্বীকার (জালিয়াতি ও প্রতারণা):
বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. নজরুল ইসলামের পিতা প্রয়াত ডা. ফেরাজ উদ্দিনের দান করা ৩.০৫ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠানটি গড়ে উঠলেও, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ইচ্ছাকৃতভাবে দাতার নাম ও সাইনবোর্ড মুছে ফেলেছেন এবং প্রশাসনিক নির্দেশ পালন করেননি। দলিলপত্র ও দানের শর্ত গোপন করা বা জালিয়াতি করা দণ্ডবিধির ৪৬৭ এবং ৪৭১ ধারা-র আওতায় পড়ে, যার শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অথবা ৭ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড* হতে পারে।
৫. শেষ কথা ও কঠোর প্রশাসনিক তদন্তের দাবি
নশিপুর দ্বিমুখী হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজকে ঘিরে চলা আর্থিক দুর্নীতি, প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা, দাতার নাম মুছে ফেলার চক্রান্ত এবং আইনি নির্দেশ অমান্যের ঘটনায় এলাকার সচেতন মহল, অভিভাবক এবং বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে।
তাঁদের জোর দাবি—অবিলম্বে জেলা প্রশাসন, শিক্ষা বোর্ড এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পক্ষ থেকে একটি উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করা হোক। বিদ্যালয়ের হাজিরা খাতা, আর্থিক অডিট রিপোর্ট, জমি দানের মূল দলিল এবং পূর্বের প্রশাসনিক বরখাস্তের নির্দেশ যাচাই করে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে বৃহত্তর আইনি পদক্ষেপ ও আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন এলাকাবাসী।