দেবিদ্বারে সালাউদ্দিন রুহুলের কারসাজিতে ৪৫ টি ভুয়া কার্ডের মাধ্যমে ভিজিএফ চাল লুন্ঠন
স্টাফ রিপোর্টার:
গরিবের পেটের ক্ষুধাকে পুঁজি করে ত্রাণ ও ভিজিএফের চাল চুরির চেয়ে বড় নিষ্ঠুরতা আর কী হতে পারে? গত ৬ অক্টোবর দেবিদ্বারের ৬ নং ফতেহাবাদ ইউনিয়নে স্বয়ং উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) অশোক বিক্রম চাকমা নিজে তদন্ত করে পেয়েছেন এমনই এক ভয়াবহ জালিয়াতির চিত্র। মোট ১৪০টি ভিজিএফ কার্ডের মধ্যে ৪৫টিই সম্পূর্ণ নামে-বেনামে তৈরি করে আত্মসাৎ করা হয়েছে চাল। আর এই পুরো অমানবিক জালিয়াতির ছক কষা হয়েছিল সাবেক ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সালাহউদ্দিন রুহুলের আমলে। ক্ষুধার্ত মানুষের সামান্য কয়েক কেজি চালের প্রতি একজন জনপ্রতিনিধির এমন লোলুপ নজর সত্যিই চরম লজ্জার ও দুঃখজনক!
জনসংখ্যার চরম বৈষম্য ও কার্ড লুটের খতিয়ান
জনসংখ্যার কোনো তোয়াক্কা না করে সালাহউদ্দিন রুহুলের আমলে কীভাবে গরিবের হক লুট করে নির্দিষ্ট পকেটে ঢোকানো হয়েছে, তার একটি ওয়ার্ডভিত্তিক ভয়াবহ চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো:
১ নং ওয়ার্ড (ফতেহাবাদ): ভোটার প্রায় ৬,০০০ এবং লোকসংখ্যা ১৫ হাজারের বিপরীতে কার্ড পেয়েছে মাত্র ৯টি।
২ নং ওয়ার্ড (সুলতানপুর): ভোটার প্রায় ২,৬০০ এবং লোকসংখ্যা প্রায় ৬ হাজারের বিপরীতে কার্ড মাত্র ১২টি।
৩ নং ওয়ার্ড (নূরপুর, নোয়াবগঞ্জ): ভোটার প্রায় ৪,০০০ এবং লোকসংখ্যা প্রায় ৮ হাজারের বিপরীতে কার্ড পেয়েছে মাত্র ১৭টি।
৪ নং ওয়ার্ড (খলিলপুর, লক্ষ্মীপুর): প্রায় ৪,২০০ ভোটার এবং লোকসংখ্যা ৮ হাজারের বিপরীতে কার্ড পেয়েছে মাত্র ২৮টি।
৫ নং ওয়ার্ড (হেতিমপুর, ঘোষঘর, বড়কান্দা): প্রায় ৪,৪০০ ভোটার এবং লোকসংখ্যা ৯ হাজারের বিপরীতে কার্ড পেয়েছে মাত্র ১৩টি।
৬ নং ওয়ার্ড (জয়পুর, আশানপুর, কামারচর): সবচেয়ে কম মাত্র ২,৯৭০ ভোটার এবং লোকসংখ্যা ৫ হাজারের বিপরীতে সর্বোচ্চ ৩৮টি কার্ড!
৭ নং ওয়ার্ড (জগন্নাথপুর ও আংশিক সাইচাপাড়া): ৫,০০০ ভোটারের বিপরীতে কার্ড জুটেছে সামান্য। জগন্নাথপুরে প্রায় ১৫০০ ভোটার ও লোকসংখ্যা ৩ হাজার হলেও কার্ড পেয়েছে মাত্র ১টি। অন্যদিকে সাইচাপাড়া আংশিকে ভোটার প্রায় ৩,২০০ এবং লোকসংখ্যা ৬ হাজার হলেও এই গ্রামে একটি কার্ডও দেওয়া হয়নি।
৮ নং ওয়ার্ড (বিষ্ণুপুর, সাইচাপাড়া, নোয়াপাড়া): প্রায় ৫,৫০০০ ভোটার এবং লোকসংখ্যা প্রায় ১০ হাজার হলেও কার্ড পেয়েছে মাত্র ৯টি। উল্লেখ্য, এই ওয়ার্ডের নোয়াপাড়া গ্রামে প্রায় ৮০০ ভোটার ও ২ হাজার লোকসংখ্যা থাকলেও ১টি কার্ডও দেওয়া হয়নি।
৯ নং ওয়ার্ড (চান্দপুর, কালিকাপুর): প্রায় ৪,২০০ ভোটার এবং লোকসংখ্যা ৮ হাজার হলেও কার্ড পেয়েছে মাত্র ৩টি। এর মধ্যে কালিকাপুর গ্রামে প্রায় ৮০০ ভোটার ও ২ হাজার লোকসংখ্যা থাকা সত্ত্বেও কেউ একটি কার্ডও পায়নি।
ইউএনও মহোদয়ের তদন্তে বেরিয়ে এসেছে যে, ১৪০টি কার্ডের মধ্যে প্রকৃত ভুক্তভোগীরা পেয়েছেন ৯৫টি কার্ড। বাকি ৪৫টি কার্ড নামে-বেনামে আত্মসাৎ করেছেন সালাহউদ্দিন রুহুল ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা। ফতেহাবাদ ইউনিয়নের ভোটার ও জনসংখ্যার অনুপাত অনুযায়ী কার্ড বিতরণ না করে জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশে সাধারণ জনগণের সাথে চরম বৈষম্য করা হয়েছে। জনগণের সামান্য ৩০ কেজি ভিজিএফ চালের টাকার দিকে লোলুপ দৃষ্টি দিতে ভুলেননি তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সালাহউদ্দিন রুহুল।
দুর্নীতি ও আত্মসাতের অপরাধে প্রযোজ্য আইনি ধারা ও সম্ভাব্য শাস্তি
সরকারি ত্রাণসামগ্রী ও ভিজিএফের চাল আত্মসাতের এই ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য। সংশ্লিষ্ট আইনি বিশেষজ্ঞ ও প্রচলিত আইন অনুযায়ী সালাহউদ্দিন রুহুল ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে যেসব অপরাধ ও শাস্তির বিধান প্রযোজ্য হতে পারে:
১. দণ্ডবিধি, ১৮৬০ (Penal Code):
ধারা ৪০৯ (সরকারি কর্মচারী বা এজেন্ট কর্তৃক অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ): যেহেতু তিনি একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত জনপ্রতিনিধি (ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান) হিসেবে সরকারি চাল বিতরণের দায়িত্বে থেকে তা আত্মসাৎ করেছেন, তাই এই ধারায় তাঁর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অথবা ১০ বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার বিধান রয়েছে।
ধারা ৪২০ (প্রতারণা ও অসাধুভাবে সম্পত্তি হস্তান্তর): নামে-বেনামে ভুয়া কার্ড তৈরি করে সরকারি সম্পদ আত্মসাতের অপরাধে এই ধারায় ৭ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডসহ অর্থদণ্ড হতে পারে।
ধারা ১০৯ (অপরাধে সহায়তা): এই পুরো জালিয়াতিতে যারা তাকে সহায়তা করেছেন, তারাও সমপরিমাণ শাস্তির আওতাভুক্ত হবেন।
২. দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭:
ধারা ৫(২): ক্ষমতার অপব্যবহার করে জনসম্পদ আত্মসাৎ ও দুর্নীতির অপরাধে এই আইনের আওতায় কমপক্ষে ১ বছর থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৭ বছর বা তদোর্ধ্ব সশ্রম কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড হতে পারে। এ ছাড়া আত্মসাৎকৃত সম্পদের সমপরিমাণ অর্থ জরিমানা আদায় করা হতে পারে।
জনগণের প্রত্যাশা
জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশে এ ধরনের দুর্নীতি ও দুঃশাসনের কোনো স্থান নেই। ফতেহাবাদ ইউনিয়নের সর্বস্তরের জনগণ ও ভুক্তভোগীরা সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের নিকট অবিলম্বে সালাহউদ্দিন রুহুল ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বা নিয়মিত ফৌজদারি আদালতে মামলা দায়েরপূর্বক দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির জোরালো দাবি জানিয়েছেন।