তালা সমবায় কার্যালয়ের সহকারী পরিদর্শক সন্ন্যাসী কুমার মন্ডলের বিরুদ্ধে ঘুষ-দুর্নীতির অভিযোগ, সংবাদ প্রকাশের পর তৎপরতা নিয়ে আলোচনা
নবায়ন ফি’র বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, মৎস্যজীবী সমিতিতে অনিয়ম ও ব্যক্তিগত আচরণ নিয়ে একাধিক অভিযোগ; তদন্তের দাবি স্থানীয় সমিতি পরিচালকদের — অভিযোগ অস্বীকার কর্মকর্তার
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি | দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ
সাতক্ষীরার তালা উপজেলা সমবায় কার্যালয়ের সহকারী পরিদর্শক সন্ন্যাসী কুমার মন্ডলের বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ, সমবায় সমিতির নিবন্ধন নবায়নে অতিরিক্ত অর্থ আদায় এবং মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির কার্যক্রমে অনিয়মের একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগ নিয়ে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় সংবাদ প্রকাশের পরও তাঁর বিরুদ্ধে দৃশ্যমান প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় কয়েকজন সমবায় সমিতির পরিচালক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁদের দাবি, অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
অন্যদিকে, সংবাদ প্রকাশের পর সন্ন্যাসী কুমার মন্ডল ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ ও দৌড়ঝাঁপ করছেন বলে স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা রয়েছে। তবে এ বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে নথিপত্র যাচাই, অভিযোগকারীদের বক্তব্য গ্রহণ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত প্রয়োজন।
কর্মস্থল পরিবর্তনের পরও অভিযোগের ধারাবাহিকতা?
স্থানীয় সূত্র ও অভিযোগকারীদের বক্তব্য অনুযায়ী, সন্ন্যাসী কুমার মন্ডল এর আগে খুলনা জেলার কয়রা উপজেলায় কর্মরত ছিলেন। সেখানে দায়িত্ব পালনকালে তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়েছিল বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে তিনি আশাশুনি উপজেলায় বদলি হন। সেখানেও তাঁর বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ, সমবায় সমিতির নিবন্ধন নবায়নে অতিরিক্ত অর্থ আদায় এবং মৎস্যজীবী সমিতির কার্যক্রমে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে।
অভিযোগকারীদের দাবি, পরবর্তী সময়ে তাঁকে তালা উপজেলায় বদলি করা হলেও সেখানে যোগদানের পরও একই ধরনের অভিযোগ সামনে এসেছে। তবে সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় মামলার নথি, তদন্তের ফলাফল, বদলির সরকারি আদেশ এবং পূর্ববর্তী অভিযোগগুলোর নিষ্পত্তির তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে এসব অভিযোগের ভিত্তিতে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো অনিয়ম প্রমাণিত হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
নিবন্ধন নবায়নের নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ
আশাশুনি উপজেলার বাসিন্দা আশরাফ উদ্দীন সরদার ও আব্দুল আলিমের অভিযোগ, সন্ন্যাসী কুমার মন্ডল সেখানে কর্মরত থাকাকালে মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির নিবন্ধন নবায়নের জন্য নির্ধারিত সরকারি ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হতো। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, সমিতিপ্রতি বছরে পাঁচ থেকে দশ হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
তাঁরা আরও অভিযোগ করেন, প্রকৃত মৎস্যজীবী নন—এমন ব্যক্তিদের অর্থের বিনিময়ে সরকারি খালের ইজারা পাওয়ার প্রক্রিয়ায় সহায়তা করার অভিযোগও উঠেছিল। বিষয়টি নিয়ে তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছিল বলে তাঁদের দাবি।
অভিযোগকারীদের বক্তব্য অনুযায়ী, জলমহল ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিরোধের পর সংশ্লিষ্ট জলমহলকে দুই ভাগে বিভক্ত করা হয়েছিল। তবে ওই সিদ্ধান্তের প্রশাসনিক কারণ, অভিযোগের নথি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাই ঘটনাটির পূর্ণাঙ্গ চিত্র জানতে সংশ্লিষ্ট লিখিত অভিযোগ, জলমহল ইজারার নথি ও তৎকালীন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করা জরুরি।
তালায় সমবায় সমিতির নবায়নেও অর্থ দাবির অভিযোগ
তালা উপজেলায় কর্মরত অবস্থায় সন্ন্যাসী কুমার মন্ডলের বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ তুলেছেন একাধিক সমবায় সমিতির পরিচালক। রহমত আলী, ইবাদুল সানা ও রুস্তম আলীসহ কয়েকজনের অভিযোগ, বার্ষিক নিবন্ধন নবায়নের নামে সমিতির ফাইলপ্রতি ১০ হাজার টাকা থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
তাঁদের আরও দাবি, প্রকৃত মৎস্যজীবী নন—এমন ব্যক্তিদের অর্থের বিনিময়ে মৎস্যজীবী সমবায় সমিতিতে অন্তর্ভুক্ত করার অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারীরা এসব বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত, আর্থিক লেনদেনের নথি যাচাই এবং সমিতিগুলোর নিবন্ধনসংক্রান্ত কার্যক্রম পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছেন।
তবে অভিযোগে উল্লেখ করা অর্থের পরিমাণ, কার কাছে কখন অর্থ চাওয়া বা দেওয়া হয়েছে, কোনো রসিদ কিংবা আর্থিক লেনদেনের প্রমাণ রয়েছে কি না—এসব বিষয় স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। অভিযোগকারীদের বক্তব্যের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সমিতির আবেদনপত্র, নবায়ন ফি জমার রসিদ, সরকারি ফি-সংক্রান্ত বিধান এবং অফিসের নথি পরীক্ষা করলেই বিষয়টি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া সম্ভব।
খলিষখালী এলাকার সমিতির সভাপতির অভিযোগ
তালার খলিষখালী এলাকার একটি মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সভাপতি গণেশ বর্মনের অভিযোগ, সন্ন্যাসী কুমার মন্ডল দায়িত্ব গ্রহণের পর সমিতির নিবন্ধন নবায়নের নামে সমিতিপ্রতি পাঁচ থেকে আট হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হচ্ছে।
গণেশ বর্মনের দাবি, বিষয়টি উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলামকে জানানো হলেও তিনি কার্যকর ব্যবস্থা নেননি। বরং অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি সন্ন্যাসী কুমার মন্ডলের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন বলে গণেশ বর্মনের দাবি।
গণেশ বর্মনসহ অভিযোগকারীরা দ্রুত অভিযোগের তদন্ত, প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
তবে উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা অভিযোগগুলো কীভাবে বিবেচনা করেছেন, তাঁর কাছে আগে কোনো লিখিত অভিযোগ জমা হয়েছিল কি না এবং সংশ্লিষ্ট সমিতির নবায়ন প্রক্রিয়ায় সরকারি বিধি অনুসরণ করা হয়েছে কি না—এসব বিষয়ে আরও তথ্য যাচাই প্রয়োজন।
ব্যক্তিগত আচরণ নিয়ে অভিযোগ, যাচাই প্রয়োজন
সন্ন্যাসী কুমার মন্ডলের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও আচরণ নিয়েও অভিযোগ তোলা হয়েছে। সাতক্ষীরা শহরের মুনজিতপুর এলাকার বাসিন্দা রাহুল কুমার সিংহ এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
রাহুল কুমার সিংহের অভিযোগ, সন্ন্যাসী কুমার মন্ডল রাজনৈতিক প্রভাবের কথা উল্লেখ করে তাঁকে হুমকিমূলক বক্তব্য দিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা ও মন্ত্রীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কথা বলে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেছেন এবং শেখ হাসিনার দেশে ফিরে আসার প্রসঙ্গও তুলেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে কথিত বক্তব্যের সময়, স্থান, প্রত্যক্ষদর্শী, কোনো লিখিত অভিযোগ বা অন্য কোনো সমর্থনকারী প্রমাণ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। ব্যক্তিগত সম্পর্কসংক্রান্ত অভিযোগের ক্ষেত্রেও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ ছাড়া কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সমীচীন নয়। এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য নেওয়া প্রয়োজন।
বিভাগীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ
নাম প্রকাশ না করার শর্তে তালা উপজেলা সমবায় কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, আশাশুনিতে কর্মরত থাকাকালে শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে সন্ন্যাসী কুমার মন্ডলের ১২ থেকে ১৮ মাসের টিএ/ডিএ বিল আটকে রাখা হয়েছিল।
ওই কর্মকর্তার ভাষ্য, বর্তমানে তালা উপজেলা সমবায় কার্যালয়ে তাঁর দায়িত্ব পালন নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। তবে টিএ/ডিএ বিল আটকে রাখার কারণ, সময়কাল এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক আদেশের নথি পাওয়া যায়নি। ফলে এ বক্তব্যও নথিপত্রের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
সরকারি চাকরিতে কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তা যথাযথ প্রক্রিয়ায় তদন্ত করা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া এবং প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রশাসনিক জবাবদিহির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সন্ন্যাসী কুমার মন্ডল
তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে সন্ন্যাসী কুমার মন্ডল অভিযোগগুলো অস্বীকার করেছেন। তাঁর বক্তব্য, একটি কুচক্রী মহল তাঁর বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে। তিনি কোনো ঘুষ বা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত নন বলেও দাবি করেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে প্রকাশিত সংবাদগুলোর প্রতিবাদ জানিয়েছেন বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন।
তাঁর এই বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে অভিযোগকারীদের দাবির পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই করে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করা প্রয়োজন। অভিযুক্ত কর্মকর্তার বক্তব্য ও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ নিশ্চিত করাও ন্যায়সংগত সংবাদ প্রকাশের অংশ।
লিখিত অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা: উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা
তালা উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, সন্ন্যাসী কুমার মন্ডলের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে এবং তদন্তের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
তাঁর এই বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে অভিযোগকারীদের কাছে থাকা লিখিত আবেদন, নবায়ন ফি-সংক্রান্ত নথি, অর্থ লেনদেনের প্রমাণ এবং পূর্ববর্তী প্রশাসনিক অভিযোগগুলো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করা হলে বিষয়টি তদন্তের আওতায় আনা সহজ হতে পারে।
তদন্ত ও জবাবদিহির দাবি
সমবায় সমিতিগুলো স্থানীয় পর্যায়ে সদস্যদের আর্থিক ও সাংগঠনিক স্বার্থ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এসব প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন, নবায়ন ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে সরকারি বিধি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব।
সন্ন্যাসী কুমার মন্ডলের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো সত্য হলে তা সরকারি সেবা, সমবায় কার্যক্রম এবং সংশ্লিষ্ট সদস্যদের স্বার্থের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। অন্যদিকে, অভিযোগগুলো প্রমাণিত না হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সুনাম ও পেশাগত অধিকার রক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
এ অবস্থায় কয়রা, আশাশুনি ও তালায় তাঁর দায়িত্ব পালনসংক্রান্ত অভিযোগ, পূর্ববর্তী বিভাগীয় মামলার নথি, নিবন্ধন নবায়নের আর্থিক রেকর্ড এবং অভিযোগকারীদের লিখিত আবেদন যাচাই করে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ-এর পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন সমবায় কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানানো হচ্ছে। একই সঙ্গে অভিযুক্ত কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য, নথিপত্র ও ব্যাখ্যা প্রকাশের সুযোগ থাকবে। নতুন কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য বা বক্তব্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি সংশোধন বা হালনাগাদ করা হবে।