বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন | দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) কর্মকর্তা এ কে এম আরিফ উদ্দিনকে ঘিরে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। নারীসংক্রান্ত বিতর্ক, বিপুল দুর্নীতি ও অসদাচরণের গুরুতর অভিযোগে সাময়িক বরখাস্ত হওয়ার মাত্র এক মাসের মাথায় তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করা হয়েছে বলে প্রকাশিত তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগগুলোর তদন্তের চূড়ান্ত পরিণতি কী, সংশ্লিষ্ট ঘটনায় দায় নির্ধারণ হয়েছে কি না এবং তদন্ত নিষ্পত্তির আগেই তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ার প্রশাসনিক যুক্তি কী—এসব প্রশ্ন এখন আলোচনায়।
প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, গত ২৩ জুন তৎকালীন পরিচালক (বন্দর ও পরিবহন) পদে দায়িত্ব পালনকালে এ কে এম আরিফ উদ্দিনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। এর প্রায় এক মাস পর, ২৩ জুলাই জারি করা একটি দপ্তর আদেশে ‘কাজের স্বার্থে’ তাঁকে বিআইডব্লিউটিএর প্রধান কার্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ পরিচালক (ক্রয় ও সংরক্ষণ) পদে পদায়ন করা হয় বলে জানা গেছে।
এ ঘটনায় প্রশাসনিক মহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে পারে—যে কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগের প্রেক্ষাপটে সাময়িক বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, তাঁর বিষয়ে তদন্তের অগ্রগতি ও ফলাফল স্পষ্ট না করেই কেন তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হলো? এটি কি নিয়মিত প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, নাকি এর পেছনে রয়েছে বিশেষ কোনো বিবেচনা? যথাযথ নথিপত্র ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ছাড়া এসব প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়। তবে জনস্বার্থে বিষয়গুলো স্বচ্ছভাবে ব্যাখ্যা করা জরুরি।
সাময়িক বরখাস্ত থেকে গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন: কী ঘটেছিল?
একজন সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা মানেই তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া নয়। একইভাবে, পরবর্তী সময়ে অন্য পদে পদায়ন করাও অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পাওয়ার সমতুল্য নয়। অভিযোগের প্রকৃতি, তদন্তের অবস্থা, প্রযোজ্য চাকরিবিধি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত—সবকিছু বিবেচনা করেই বিষয়টির মূল্যায়ন করতে হবে।
এ ক্ষেত্রে মূল প্রশ্ন হলো, এ কে এম আরিফ উদ্দিনের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর তদন্ত কোন পর্যায়ে রয়েছে। তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল কি না, কোনো প্রতিবেদন জমা পড়েছে কি না, বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান কি না এবং তাঁকে নতুন পদে পদায়নের আগে সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনা করা হয়েছিল কি না—এসব তথ্য প্রকাশ করা হলে বিষয়টি পরিষ্কার হতে পারে।
বিশেষ করে, ‘কাজের স্বার্থে’ পদায়নের যে কারণ উল্লেখ করা হয়েছে, তার পেছনে কী ধরনের প্রশাসনিক প্রয়োজন ছিল, তা ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। কারণ, একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব প্রদান শুধু সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কর্মজীবনের বিষয় নয়; এর সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের সুশাসন, ক্রয়প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং জনসম্পদের যথাযথ ব্যবস্থাপনাও জড়িত।
ক্রয় ও সংরক্ষণ বিভাগে পদায়ন ঘিরে স্বচ্ছতার প্রশ্ন
বিআইডব্লিউটিএ দেশের অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন অবকাঠামো, নৌপথ ব্যবস্থাপনা এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে। এমন প্রতিষ্ঠানের ক্রয় ও সংরক্ষণ বিভাগে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে আর্থিক শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং প্রযোজ্য সরকারি ক্রয়বিধি অনুসরণের গুরুত্ব অপরিসীম।
এ অবস্থায় কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি বা অসদাচরণের অভিযোগ থাকলে সেগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত এবং পদায়ন-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা প্রয়োজন। তবে অভিযোগের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে দোষী সাব্যস্ত করা যাবে না; একই সঙ্গে অভিযোগগুলো যথাযথভাবে যাচাই না করে উপেক্ষা করাও জনস্বার্থের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।
তাই এ কে এম আরিফ উদ্দিনের পদায়ন-সংক্রান্ত আদেশ, তাঁর বিরুদ্ধে গৃহীত প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং তদন্তের বর্তমান অবস্থা পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করা উচিত।
পুরোনো দপ্তরে ফেরার তদবিরের অভিযোগ
প্রকাশিত তথ্যে আরও বলা হয়েছে, পরিচালক (ক্রয় ও সংরক্ষণ) পদে দায়িত্ব পাওয়ার পর এ কে এম আরিফ উদ্দিন আগের প্রভাবশালী ‘বন্দর ও পরিবহন’ বিভাগে ফিরে যেতে তদবির চালাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে এই তদবিরের বিষয়ে নির্ভরযোগ্য নথি, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য কিংবা আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ ছাড়া অভিযোগটিকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা সমীচীন নয়। তিনি আদৌ এ ধরনের আবেদন বা তদবির করেছেন কি না, করে থাকলে কোন কর্তৃপক্ষের কাছে করেছেন এবং এর পেছনে কী যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে—এসব তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন।
যদি এমন কোনো তদবির হয়ে থাকে, তাহলে অভিযোগের তদন্ত চলমান থাকা অবস্থায় সংশ্লিষ্ট পদে পুনরায় দায়িত্ব দেওয়ার সম্ভাবনা বিবেচনায় নেওয়ার আগে প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের উচিত বিষয়টি বিধি ও জনস্বার্থের আলোকে পর্যালোচনা করা। আর অভিযোগটি সত্য না হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বক্তব্যও যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করা প্রয়োজন।
তদন্তের অগ্রগতি কোথায়, জবাবদিহি কার কাছে?
একটি প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করে তার স্বচ্ছতা, যৌক্তিকতা এবং বিধি অনুসরণের ওপর। কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ ওঠার পর তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করা হলে পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা থাকা জরুরি। অন্যথায় তদন্তের গতি, সিদ্ধান্ত গ্রহণের নিরপেক্ষতা এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
এ ক্ষেত্রে বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষের কাছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর প্রত্যাশিত:
১. এ কে এম আরিফ উদ্দিনকে ২৩ জুন সাময়িক বরখাস্ত করার সুনির্দিষ্ট প্রশাসনিক কারণ কী ছিল?
২. তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর তদন্তের বর্তমান অবস্থা কী? তদন্ত প্রতিবেদন জমা পড়েছে কি না এবং কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে কি না?
৩. তদন্ত নিষ্পত্তির আগে ২৩ জুলাই তাঁকে পরিচালক (ক্রয় ও সংরক্ষণ) পদে পদায়নের সিদ্ধান্ত কোন প্রশাসনিক বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল?
৪. পদায়নের আগে তাঁর বিরুদ্ধে চলমান অভিযোগ ও বিভাগীয় কার্যক্রম পর্যালোচনা করা হয়েছিল কি না?
৫. পরিচালক (বন্দর ও পরিবহন) পদে ফেরার তদবিরের যে অভিযোগ উঠেছে, তার সত্যতা যাচাইয়ের কোনো সুযোগ বা আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া রয়েছে কি না?
এসব প্রশ্নের উত্তর সংশ্লিষ্ট নথি ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্যের ভিত্তিতে প্রকাশ করা হলে বিষয়টি নিয়ে তৈরি হওয়া বিভ্রান্তি দূর হতে পারে।
নিরপেক্ষ তদন্ত ও নথি প্রকাশের দাবি
বিআইডব্লিউটিএর মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের নিষ্পত্তি হতে হবে প্রযোজ্য বিধিবিধান অনুযায়ী। অভিযোগ গুরুতর হলে তদন্তের গতি ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা যেমন প্রয়োজন, তেমনি অভিযুক্ত কর্মকর্তার আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকারও সংরক্ষণ করতে হবে।
এ কে এম আরিফ উদ্দিনের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই, সাময়িক বরখাস্তের পরবর্তী প্রশাসনিক পদক্ষেপের যৌক্তিকতা পর্যালোচনা এবং পদায়ন-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা জনস্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে; আর অভিযোগ প্রমাণিত না হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার অবস্থানও পরিষ্কার করা প্রয়োজন।
প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের আড়ালে কোনো অনিয়ম বা পক্ষপাতের সুযোগ আছে কি না, তা নির্ধারণের দায়িত্ব নিরপেক্ষ তদন্ত ও যথাযথ নথি পর্যালোচনার। অনুমান, গুঞ্জন কিংবা ব্যক্তিগত বিরোধের ভিত্তিতে কাউকে দায়ী করা যেমন গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনি গুরুতর অভিযোগের নিষ্পত্তি ছাড়াই বিষয়টি উপেক্ষা করাও কাম্য নয়।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য প্রত্যাশিত
এ কে এম আরিফ উদ্দিনের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ, সাময়িক বরখাস্তের পর পদায়ন এবং পুরোনো দপ্তরে ফেরার তদবিরের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য, বিআইডব্লিউটিএর সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা এবং তদন্ত-সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই করা প্রয়োজন। এ প্রতিবেদনে উল্লিখিত অভিযোগগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই ও চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত সেগুলোকে অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে।
দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্য প্রকাশে আগ্রহী। তাঁদের বক্তব্য, প্রাসঙ্গিক নথি কিংবা নতুন কোনো যাচাইযোগ্য তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি প্রয়োজন অনুযায়ী সংশোধন, পরিমার্জন বা হালনাগাদ করা হবে।
জনস্বার্থে প্রশ্ন একটাই তদন্তের অগ্রগতি কী, পদায়নের প্রশাসনিক ভিত্তি কী এবং অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ নিষ্পত্তি কবে হবে?