জুলাই অভ্যুত্থান নস্যাৎ করার অপচেষ্টার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক দলগুলো
ঢাকা, ১৩ ডিসেম্বর ২০২৫:
ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী শরিফ ওসমান হাদির ওপর হামলাকে জুলাই অভ্যুত্থান নস্যাৎ করার গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে উল্লেখ করে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা বলেছেন, এই অভ্যুত্থানকে ব্যর্থ করার যেকোনো অপচেষ্টা ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিহত করা হবে।
আজ রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর শীর্ষ নেতারা এই ঐক্যের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
বৈঠকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ ও হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ, ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবের এবং আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল উপস্থিত ছিলেন।
হামলা পূর্বপরিকল্পিত, পেছনে শক্তিশালী নেটওয়ার্ক: প্রধান উপদেষ্টা
বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, শরিফ ওসমান হাদির ওপর হামলাটি পূর্বপরিকল্পিত এবং গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ। এর পেছনে একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক সক্রিয় রয়েছে।
তিনি বলেন, “এই হামলার উদ্দেশ্য হচ্ছে নির্বাচন বানচাল করা। এটি একটি সিম্বলিক আক্রমণ—শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে নির্বাচনের পরিবেশ ভেস্তে দেওয়ার অপচেষ্টা। এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্যে দেখা যাচ্ছে, ষড়যন্ত্রকারীরা প্রশিক্ষিত শুটার ব্যবহার করছে এবং তাদের নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করেছে।”
তিনি সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে এই ষড়যন্ত্র মোকাবিলার আহ্বান জানান।
সর্বদলীয় প্রতিবাদ সভার সিদ্ধান্ত
ওসমান হাদির ওপর ন্যাক্কারজনক হামলার প্রতিবাদে ইনকিলাব মঞ্চের উদ্যোগে সর্বদলীয় প্রতিবাদ সভা আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। আগামী দু-একদিনের মধ্যেই এই সভা অনুষ্ঠিত হবে বলে বৈঠকে জানানো হয়।
অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে কঠোর অভিযান দাবি
বৈঠকে অংশ নেওয়া নেতারা নির্বাচনের আগে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে কঠোর অভিযান পরিচালনার ওপর জোর দেন। একই সঙ্গে ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক ঐক্যে যেন কোনো ফাটল না ধরে, সে জন্য পারস্পরিক যোগাযোগ ও সংযম বাড়ানোর তাগিদ দেন তাঁরা।
ঐক্যই এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন: বিএনপি

বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, “এই সংকটময় সময়ে আমাদের অবশ্যই ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। পরস্পরের বিরুদ্ধে দোষারোপ বন্ধ করতে হবে। ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে এক কণ্ঠে আওয়াজ তুলতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক মতভেদ থাকলেও জাতির স্বার্থ ও জুলাই অভ্যুত্থানের স্বার্থে ঐক্য অপরিহার্য।
দোষারোপের রাজনীতি পরিহারের আহ্বান: জামায়াত
জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে একে অন্যকে দোষারোপ করার প্রবণতা বাড়ায় বিরোধীরা সুযোগ নিচ্ছে।
তিনি বলেন, “ক্ষুদ্র দলীয় স্বার্থে আমরা যদি নিজেদের প্রতিপক্ষ বানাই, তবে সেটাই ষড়যন্ত্রকারীদের শক্তি বাড়াবে। আমাদের পূর্বের মতো ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।”
জুলাইকে খাটো করার সংগঠিত অপচেষ্টা চলছে: এনসিপি
এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকেই এটিকে খাটো করার জন্য একটি সুসংগঠিত ক্যাম্পেইন চলছে।
তিনি বলেন, “মিডিয়া, প্রশাসন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন ন্যারেটিভ তৈরি করা হচ্ছে, যাতে মনে হয় জুলাই অভ্যুত্থান একটি অপরাধ। আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টিকে নরমালাইজ করার চেষ্টা চলছে।”
তিনি আরও বলেন, “জুলাইকে সবাই মিলে ওউন করতে হবে। আমাদের অনৈক্যই ষড়যন্ত্রকারীদের সবচেয়ে বড় শক্তি।”
নিজেদের ঐক্যই আসল নিরাপত্তা: হাসনাত আবদুল্লাহ
এনসিপির নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, “আমরা নিজেরা ঐক্যবদ্ধ থাকতে না পারলে কোনো নিরাপত্তাই কাজে আসবে না। রাজনৈতিক স্বার্থে কিছু দল আওয়ামী লীগকে সুযোগ করে দিচ্ছে।”
সংযম ও দায়িত্বশীল রাজনীতির আহ্বান
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ইউনূস বলেন, রাজনৈতিক বক্তব্য থাকবে, কিন্তু কাউকে শত্রু হিসেবে দেখার বা আক্রমণ করার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে হানাহানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই আওয়ামী লীগ শক্তিশালী হয়েছে। তিনি বলেন, “দলীয় স্বার্থের পাশাপাশি জাতীয় স্বার্থকেও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।”