• সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০৬:১৯ অপরাহ্ন
  • [gtranslate]
শিরোনাম
গাজীপুরে মেট্রিক্স গার্মেন্টসে আগুন, ৬৭ জনকে জীবিত উদ্ধার আটতলা ভবনের তৃতীয় তলায় অগ্নিকাণ্ড, আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের ৯টি ইউনিট নারীর মেসেঞ্জারে পুরুষাঙ্গের ছবি পাঠানোর অভিযোগ মোঃ দিদারের বিরুদ্ধে, সাইবার আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি সাউদার্ন ইউনিভার্সিটির প্রতিষ্ঠাতা, মালিকানা ও ট্রাস্ট নিয়ে পুরোনো বিরোধ: ২০১৪ সালের জেলা প্রশাসনের তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে আসে একাধিক গুরুতর অসংগতি ভবিষ্যতে ফ্যাসিবাদী শাসনের পথ বন্ধে সংবিধান সংশোধন প্রয়োজন: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ মাদক-সন্ত্রাস, দখলবাজি ও চাঁদাবাজমুক্ত সমাজ গড়তে ফখরুল ইসলাম এমপির আহ্বান হাতিয়ায় জাতীয় যুব দিবস ২০২৬ উদযাপন: যুব র‍্যালি, ঋণের চেক বিতরণ ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত ৮ মামলার বাধা পেরিয়ে এবার ইলিয়টগঞ্জ উত্তর ইউপির চেয়ারম্যান হওয়ার প্রত্যাশায় দুলাল সরকার বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী নিয়ে উসকানিমূলক বক্তব্যের অভিযোগ, থোয়াইচিং মং শাককে সিএইচটি সম্প্রীতি জোটের কারণ দর্শানোর নোটিশ মাদকের সঙ্গে জড়িত কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না: এমপি নূরুল ইসলাম নয়ন সাংবাদিক অরিত্র কুন্ডুকে কনডেম সেলে রাখার অভিযোগ: ২৪ ঘণ্টার আইনি আলটিমেটাম, অন্যথায় হাইকোর্টে রিট পুরোনো ভিডিও নতুন করে ছড়িয়ে বিজিবির বিরুদ্ধে অপপ্রচার, বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচারে সতর্ক করল সীমান্তরক্ষী বাহিনী

চিকিৎসা সেবার আড়ালে দলীয় তোষামোদ, প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার এবং কোটি কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ: জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউটের সাবেক ভারপ্রাপ্ত পরিচালক অধ্যাপক ডাঃ মোঃ খাইরুল আনামের বিরুদ্ধে অভিযোগ

বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ ডেস্ক রিপোর্ট / ২১৭ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬

 

চিকিৎসা সেবার আড়ালে দলীয় তোষামোদ, প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার এবং কোটি কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ: জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউটের সাবেক ভারপ্রাপ্ত পরিচালক অধ্যাপক ডাঃ মোঃ খাইরুল আনামের বিরুদ্ধে অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক | দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ

জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, মহাখালী, ঢাকার রেসপিরেটরি মেডিসিন বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও সাবেক ভারপ্রাপ্ত পরিচালক অধ্যাপক ডাঃ মোঃ খাইরুল আনামের প্রশাসনিক মেয়াদকালে সংঘটিত চরম ক্ষমতার অপব্যবহার, রাষ্ট্রীয় তহবিল তছরুপ এবং দলীয় প্রভাব বিস্তারের চাঞ্চল্যকর তথ্য ও প্রামাণ্য দলিল দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদের অনুসন্ধানী টিমের হাতে এসে পৌঁছেছে। বিশেষায়িত চিকিৎসা ক্ষেত্রে উচ্চতর ডিগ্রি ও দীর্ঘ অভিজ্ঞতার অধিকারী একজন চিকিৎসক হওয়া সত্ত্বেও, তাঁর প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনকালে ক্ষমতার অপব্যবহারের যে চিত্র উন্মোচিত হয়েছে, তা দেশের চিকিৎসাক্ষেত্রে নজিরবিহীন এক অন্ধ আনুগত্য ও দুর্নীতির দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

হাসপাতালের নামে মাধ্যম ব্যবহার ও রাজনৈতিক তোষামোদ

অনুসন্ধানে প্রাপ্ত ডিজিটাল ডকুমেন্টস এবং ভিডিও প্রমাণের ভিত্তিতে দেখা গেছে, ২০২২ সাল থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন পর্যন্ত সময়কালে তিনি হাসপাতালের প্রশাসনিক প্রধান বা ভারপ্রাপ্ত পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি সাধারণ রোগীদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করার বা হাসপাতালের চিকিৎসাসেবার মানোন্নয়নের চেয়ে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আদর্শ প্রচার ও বন্দনায় সম্পূর্ণ আত্মনিয়োগ করেছিলেন। হাসপাতালের প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম পরিচালনার পরিবর্তে তিনি একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের প্ল্যাটফর্মে পরিণত করেছিলেন প্রতিষ্ঠানটিকে।

করোনাকালের সংকট ও দলীয় শোক দিবস উদযাপনের নামে অর্থ তছরুপ

এর আগে যারা দায়িত্ব ছিল,বিশ্বজুড়ে যখন করোনা মহামারীর ভয়াবহ তাণ্ডব চলছিল এবং সাধারণ মানুষ জীবনের ঝুঁকিতে হাসপাতালে কাতরাচ্ছিল, তখন বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার কঠোর স্বাস্থ্যবিধি ও চিকিৎসাসামগ্রীর চরম সংকটকে তোয়াক্কা না করে মহাখালী বক্ষব্যাধি হাসপাতালে বিশাল আয়োজনে দলীয় শোক দিবস এবং বিভিন্ন জয়ন্তী পালন করা হয়েছিল। বিশেষ টি-শার্ট বা গেঞ্জি বানিয়ে এবং তাতে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক স্লোগান ও ছবি মুদ্রণ করে তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত পরিচালক নিজে উপস্থিত থেকে কেক কাটা ও উৎসবে মাততেন। হাসপাতালের ভেতরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভাষ্যমতে, সাধারণ রোগীদের খাদ্য ক্রয়ের বরাদ্দ, ওষুধ ও জরুরি চিকিৎসাসামগ্রী কেনার সরকারি বাজেট থেকে লাখ লাখ টাকা এই ধরনের দলীয় অনুষ্ঠান ও প্রোপাগাণ্ডা চালাতে বেপরোয়াভাবে খরচ করা হতো।

রোগী সেবায় অনিহা ও অঘোষিত দলীয় প্রতিনিধির ভূমিকা

ইনস্টিটিউটের একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তার সাক্ষ্য অনুযায়ী, অধ্যাপক ডাঃ মোঃ খাইরুল আনাম পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় সাধারণ রোগীদের সুচিকিৎসা ও প্রশাসনিক তত্ত্বাবধানের প্রতি সম্পূর্ণ অনিচ্ছা প্রকাশ করতেন। তৎকালীন সময়ে তিনি হাসপাতালের নামে একটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম অ্যাকাউন্ট বা ফেসবুক পেজ খুলেছিলেন, যেখানে চিকিৎসাসেবার খবরের চেয়ে তৎকালীন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রশংসা সূচক নানা বিষয় প্রচারে সর্বদাই মুখর থাকত। তৎকালীন সরকারের মন্ত্রী ও নীতিনির্ধারকদের কাছে নিজের রাজনৈতিক আনুগত্য প্রদর্শনের জন্য তিনি এতটাই উন্মুখ ছিলেন যে, তাকে অনেকেই অঘোষিত রাজনৈতিক প্রতিনিধির সমতুল্য বলে অভিহিত করতেন।

জ্ঞাতআয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও দুর্নীতির পাহাড়

একজন সরকারি অধ্যাপকের নির্দিষ্ট বেতন স্কেল ও সরকার অনুমোদিত প্র্যাকটিসের বৈধ আয়ের বাইরে ক্ষমতার অপব্যবহার করে তিনি কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ গড়ে তুলেছেন বলে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। হাসপাতালের কেনাকাটা, ঠিকাদারদের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ এবং বিভিন্ন পদের বদলি বা পদোন্নতির বাণিজ্যের মাধ্যমে তিনি বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। তাঁর এই অবৈধ উপার্জনের মাধ্যমে অর্জিত স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির পরিমাণ তাঁর বৈধ আয়ের উৎসবের সঙ্গে কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও প্রচলিত আইনি কাঠামোর প্রয়োগ

আইন বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সরকারি পদে দায়িত্ব পালনকালে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও তহবিল অপব্যবহার করে দলীয় প্রোপাগাণ্ডা চালানো এবং জ্ঞাতআয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং দেশের প্রচলিত ফৌজদারি আইনের অধীনে সরাসরি বিচার্য অপরাধ। এই অপরাধের সুনির্দিষ্ট আইনি ধারা ও শাস্তির বিধানগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:

জ্ঞাতআয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও সম্পত্তি বাজেয়াপ্তকরণ: দুর্নীতি দমন কমিশন আইন ২০০৪-এর ২৬ ও ২৭ ধারা অনুযায়ী, কোনো সরকারি কর্মকর্তা তাঁর আয়ের উৎসের বাইরে অসদুপায়ে জ্ঞাতআয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করলে দুদক তাঁর স্থাবর (জমি, ফ্ল্যাট, প্লট) এবং অস্থাবর (ব্যাংক ব্যালেন্স, শেয়ার, যানবাহন) সম্পত্তি অনুসন্ধান করে। তদন্তে অবৈধ সম্পদ প্রমাণিত হলে দুদক আইনের ২৭(১) ধারা অনুসারে সেই সমস্ত সম্পত্তি রাষ্ট্রীয় অনুকূলে চিরতরে বাজেয়াপ্ত (Confiscation) করার আইনগত বিধান রয়েছে। এই অপরাধের দায়ে সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডের কঠোর বিধান রয়েছে।

সরকারি অর্থ আত্মসাথ ও অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ: দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ৪০৯ ধারা অনুযায়ী, সরকারি হাসপাতালের রোগীদের জন্য বরাদ্দকৃত বাজেট, ওষুধ ক্রয়ের অর্থ বা প্রাতিষ্ঠানিক তহবিল ব্যক্তিগত বা দলীয় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যয় করা হলে তা সরকারি কর্মচারীর অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ (Criminal Breach of Trust) হিসেবে গণ্য হয়। এই ধারায় অভিযোগ প্রমাণিত হলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।

ইনকাম পোর্ট ও ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধকরণ: দুদক ও মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২-এর বিধান অনুযায়ী, অভিযুক্ত কর্মকর্তার অফিশিয়াল বেতন, ভাতা এবং বৈধ ইনকামের পোর্ট পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে হিসাব করে তাঁর ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা সমস্ত ব্যাংক হিসাব, এফডিআর এবং আর্থিক লেনদেন অবরুদ্ধ (Freeze) করার এখতিয়ার কমিশনের রয়েছে। অবৈধ উপায়ে বিদেশে অর্থ পাচার করা হয়ে থাকলে মানিলন্ডারিং আইনে পৃথক বিচার ও অতিরিক্ত শাস্তির বিধান প্রযোজ্য হবে।

সরকারি চাকরি আইন ও পেনশন বাজেয়াপ্তকরণ: সরকারি চাকরি আইন ২০১৮ এবং শৃঙ্খলা ও আপিল বিধিমালা অনুযায়ী, ক্ষমতার অপব্যবহার, দলীয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সরাসরি সম্পৃক্ততা এবং দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেলে তাকে চাকরি থেকে বরখাস্তকরণ, বিভাগীয় মামলা এবং ভবিষ্যতের সমস্ত সরকারি আর্থিক সুবিধা ও পেনশন চিরতরে বাজেয়াপ্ত করার কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা যায়।

বর্তমান পেশাগত অবস্থান ও চেম্বার তথ্য

রাষ্ট্রীয় বক্ষব্যাধি হাসপাতালে এমন নজিরবিহীন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের পরেও তিনি বর্তমানে চিকিৎসাসেবা অব্যাহত রেখেছেন। সরকারি দায়িত্বের বাইরে তিনি রাজধানীর ধানমন্ডিতে নিয়মিত প্রাইভেট প্র্যাকটিস করে আসছেন। জনস্বার্থে তাঁর চেম্বারের বর্তমান ঠিকানা ও সময়সূচি নিচে উল্লেখ করা হলো:

প্রতিষ্ঠান: পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ধানমন্ডি শাখা
ঠিকানা: বাড়ি নং ১৬, রোড নং ২, ধানমন্ডি আবাসিক এলাকা, ঢাকা – ১২০৫
রোগী দেখার সময়সূচি: প্রতিদিন সন্ধ্যা ৭:০০ টা থেকে রাত ৯:০০ টা পর্যন্ত (শুক্রবার বন্ধ)
সিরিয়াল ও যোগাযোগের হটলাইন: ০৯৬৬৬৭৮৭৮০১ অথবা ০৯৬১৩৭৮৭৮০১

চিকিৎসাসেবার মতো অত্যন্ত পবিত্র ও সংবেদনশীল একটি পেশাকে নিজেদের রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ চরিতার্থ করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার এবং সরকারি হাসপাতালের রোগীদের অধিকার হরণ করে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করার ঘটনা কোনোভাবেই ক্ষমার যোগ্য নয়। দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদের অনুসন্ধানী টিমের হাতে থাকা সমস্ত ভিডিও ডকুমেন্টস, ছবি এবং ডিজিটাল প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অবিলম্বে একটি উচ্চপর্যায়ী নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করা উচিত। অভিযুক্ত কর্মকর্তার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ, ইনকামের পোর্ট খতিয়ে দেখা এবং সমস্ত অবৈধ সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক আইনগত শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি এখন সর্বস্তরের সচেতন মহলের।

জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল (NIDCH)-এর সাবেক ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ও রেসপিরেটরি মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডাঃ মোঃ খাইরুল আনামের আওয়ামী লীগ প্রীতি, তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলীয় নেতৃত্বের প্রতি অন্ধ আনুগত্য এবং শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি অগাধ ভক্তি ও শ্রদ্ধাবোধের বিষয়টি সর্বমহলে সুস্পষ্ট। হাসপাতালে দায়িত্ব পালনকালে তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক আচরণ, বক্তব্য এবং বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে নিজেকে অঘোষিত ‘মুজিব সেনা’ হিসেবে তুলে ধরার একাধিক ভিডিও ও ছবি সামাজিকভাবে চর্চিত হয়েছে।

চিকিৎসা পেশার নিরপেক্ষতা বজায় রাখার বদলে তৎকালীন সরকার ও রাজপথের দলীয় আদর্শের প্রতি তাঁর এই নজিরবিহীন টান ও ভালোবাসা নিয়ে এখন সচেতন মহল ও স্বাস্থ্যখাতে একাধিক যৌক্তিক প্রশ্ন দেখা দিয়েছে:

প্রশাসনিক দায়িত্ব ও পদের ব্যবহার সংক্রান্ত প্রশ্ন:
১. জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল (NIDCH)-এর মতো একটি বিশেষায়িত ও সংবেদনশীল জাতীয় প্রতিষ্ঠানে তাঁকে কোন যোগ্যতার ভিত্তিতে ভারপ্রাপ্ত পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল?
২. পরিচালক পদে দায়িত্ব পালনকালে তিনি কি হাসপাতালের সার্বিক চিকিৎসাসেবা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার চেয়ে তৎকালীন রাজনৈতিক দলের এজেন্ডা বাস্তবায়নেই বেশি সময় ব্যয় করতেন?
৩. হাসপাতালের প্রাতিষ্ঠানিক ফেসবুক আইডি বা অনলাইন পেজ খোলার নেপথ্যে প্রকৃত উদ্দেশ্য কী ছিল—সেটি কি স্বাস্থ্য সচেতনতা প্রচার, নাকি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক আদর্শ ও তোষামোদি প্রচার করা?
৪. করোনাকালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কঠোর স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করে বিশেষ টি-শার্ট ও প্রতীকী পোশাক পরে শোক দিবস ও জয়ন্তী উদযাপনের সিদ্ধান্ত কার নির্দেশে এবং কোন প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতাবলে নেওয়া হয়েছিল?
৫. সরকারি হাসপাতালের প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রয়োগ করে দলীয় কোনো বিশেষ গোষ্ঠীকে বা নেতাকর্মীকে হাসপাতালে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার কোনো রেকর্ড বা প্রমাণ রয়েছে কি?

বাজেট বরাদ্দ ও আর্থিক অনিয়ম সংক্রান্ত প্রশ্ন:
৬. রোগীদের ওষুধ, পথ্য ও জরুরি চিকিৎসা সামগ্রী ক্রয়ের জন্য বরাদ্দকৃত সরকারি বাজেট থেকে দলীয় প্রোগ্রাম ও কেক কাটার অনুষ্ঠানে অর্থ ব্যয় করার প্রশাসনিক এখতিয়ার তাঁর ছিল কি?
৭. করোনাকালীন চরম সংকটের সময় হাসপাতালের আর্থিক তহবিল থেকে রাজনৈতিক ও দলীয় কর্মসূচি আয়োজনে কত টাকা খরচ হয়েছিল, তার সুনির্দিষ্ট কোনো হিসাব বা অডিট করা হয়েছে কি?
৮. তৎকালীন সময়ে হাসপাতালের কেনাকাটা (টেন্ডার প্রসেস) এবং বিভিন্ন চিকিৎসাসামগ্রী আমদানির ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অনিয়ম বা স্বজনপ্রীতির আশ্রয় নেওয়া হয়েছিল কি?
৯. সরকারি পদের ক্ষমতার অপব্যবহার করে ব্যক্তিগত ও পরিবারের নামে জ্ঞাতআয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ বা অভ্যন্তরীণ তদন্ত কি শুরু হয়েছে?
১০. তাঁর পরিচালনাকালে হাসপাতালের বিভিন্ন পদের বদলি, পদোন্নতি কিংবা নিয়োগ বাণিজ্যের সাথে তাঁর কোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সংশ্লিষ্টতা ছিল কি?

রাজনৈতিক আনুগত্য ও পেশাগত নিরপেক্ষতা সংক্রান্ত প্রশ্ন:
১১. একজন সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের অধ্যাপক হওয়া সত্ত্বেও প্রকাশ্যে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের প্রতি এমন নজিরবিহীন আনুগত্য প্রকাশ করা সরকারি চাকরি বিধিমালা বা শৃঙ্খলা ভঙ্গের আওতায় পড়ে কি না?
১২. স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ) বা আওয়ামী লীগের চিকিৎসা বিষয়ক উপ-কমিটির পদ বা প্রভাব ব্যবহার করে তিনি কি হাসপাতালের ভেতর প্রশাসনিক পেশিশক্তি প্রদর্শন করতেন?
১৩. সাধারণ রোগীদের চিকিৎসায় অবহেলা করে দলীয় নেতাকর্মী বা ভিআইপিদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে গিয়ে সাধারণ রোগীদের ভোগান্তি বাড়ানোর অভিযোগের সত্যতা কতটুকু?
১৪. হাসপাতালের কর্মচারীদের ওপর রাজনৈতিক মতাদর্শ চাপিয়ে দেওয়া বা নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক কার্যক্রমে অংশ নিতে বাধ্য করার কোনো ঘটনা ঘটেছিল কি?
১৫. চিকিৎসা সেবার মতো একটি পবিত্র পেশাকে দলীয় রাজনীতির প্ল্যাটফর্মে রূপান্তর করার পেছনে তাঁর ব্যক্তিগত উচ্চাভিলাষ নাকি রাজনৈতিক চাপ কাজ করেছিল?

দায়িত্ব থেকে অপসারণ ও বর্তমান পরিস্থিতি সংক্রান্ত প্রশ্ন:
১৬. রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও প্রশাসনিক রদবদলের মুখে হঠাৎ করে তাঁর কাছ থেকে হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালকের দায়িত্ব কেন কেড়ে নেওয়া হলো?
১৭. দায়িত্ব থেকে অব্যাহতির পর তাঁর বিরুদ্ধে কি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কোনো আনুষ্ঠানিক বিভাগীয় বা প্রশাসনিক তদন্ত কমিটি গঠন করেছে?
৮. সরকারি হাসপাতালে এই ধরনের দলীয় তোষামোদ ও আর্থিক দুর্নীতির সাথে জড়িত অন্যান্য সহযোগীদের চিহ্নিত করতে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে কি?
১৯. বক্ষব্যাধি হাসপাতালের বর্তমান প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাঁর সাবেক মেয়াদকালের কোনো আর্থিক বা প্রশাসনিক অনিয়মের ফাইল দুদক বা সরকারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে কি?
২০. সরকারি দায়িত্ব থেকে সরলেও তিনি বর্তমানে রাজধানীর পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মতো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত প্র্যাকটিস চালিয়ে যাচ্ছেন—এই দ্বৈত অবস্থানে তাঁর পেশাগত নৈতিকতা এবং আইনি জবাবদিহিতা কতটুকু সুরক্ষিত?

যোগ্যতা নাকি রাজনৈতিক আনুগত্যে দায়িত্বপ্রাপ্তি?:
একজন চিকিৎসক হিসেবে তাঁর বিশেষায়িত অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও, তৎকালীন সময়ে জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউটের মতো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক শীর্ষ পদে বসানোর ক্ষেত্রে তাঁর পেশাগত দক্ষতার চেয়ে আওয়ামী লীগ ও মুজিব আদর্শের প্রতি অন্ধ তোষামোদকে মূল যোগ্যতা ধরা হয়েছিল কি না—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

দায়িত্ব হস্তান্তর ও অব্যাহতির পিছনের কারণ:
হাসপাতালের প্রশাসনিক দায়িত্ব ও পরবর্তী রদবদলের প্রেক্ষাপটে তাঁর কাছ থেকে দায়িত্ব কেন কেড়ে নেওয়া হলো? সাধারণ রোগীদের সেবা ও বাজেটের সঠিক তদারকিতে ব্যর্থতা, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে প্রতিষ্ঠানের প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের অভিযোগ, নাকি প্রশাসনিক পুনর্গঠনের কারণেই তাকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে—এ বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যার দাবি উঠছে।

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দলীয় চর্চার সুযোগ:
সরকারি হাসপাতালের মতো একটি সংবেদনশীল স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে থেকে রোগীদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করার চেয়ে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ প্রচার ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর তোষামোদে বুঁদ হয়ে থাকার পরও তৎকালীন সময়ে কেন কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি?

আওয়ামী লীগ ও মুজিব আদর্শের প্রতি তাঁর অপার ভালোবাসা ও ভক্তির বিষয়টি স্পষ্ট হলেও, রাষ্ট্রীয় জনসেবামূলক সংস্থাকে রাজনৈতিক আকর্ষণের কেন্দ্রে পরিণত করার এই চর্চা কতটা গ্রহণযোগ্যতা নিয়েই এখন প্রশাসনিক ও সচেতন মহলে নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।


More News Of This Category
bdit.com.bd