নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা | ২৯ জানুয়ারি, ২০২৬
আওয়ামী লীগ সরকারের টানা ১৫ বছরের শাসনামলে গণপূর্ত অধিদপ্তরে (PWD) দুর্নীতির এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন নির্বাহী প্রকৌশলী স্বর্ণেন্দু শেখর মন্ডল। ক্ষমতাচ্যুত সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী ও সচিবদের ছায়াতলে থেকে তিনি ঢাকা নগর গণপূর্ত বিভাগকে বানিয়েছেন দুর্নীতির অভয়ারণ্য। সম্প্রতি তার বিরুদ্ধে ওঠা লোমহর্ষক সব অনিয়মের তথ্য এখন জনসমক্ষে।
১. বিশ বছর ধরে একই চেয়ারে: বদলিহীন ‘রাজত্ব’
আপনার দেওয়া তথ্যানুযায়ী, সরকারি চাকুরির বিধিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তিনি প্রায় ২০ বছর ধরে ঢাকার লোভনীয় পদগুলোতে আঁকড়ে ছিলেন। ২০০৪ সালে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে যোগদানের পর থেকে তাকে কোনো শক্তিই ঢাকার বাইরে পাঠাতে পারেনি। প্রভাবশালী মহলের আশীর্বাদে তিনি ঢাকা ও সচিবালয় কেন্দ্রিক প্রকল্পগুলোতে একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করেছিলেন।
২. কেরানীগঞ্জ জেলখানা ও জিকে শামীম কানেকশন
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কেরানীগঞ্জ জেলখানা নির্মাণ প্রকল্পে (প্রায় ৭৫০ কোটি টাকা) স্বর্ণেন্দু শেখর মন্ডল সরাসরি ২% হারে প্রায় ১৫ কোটি টাকা কমিশন পকেটে পুরেছেন। এছাড়া কুখ্যাত ঠিকাদার জিকে শামীমের সিন্ডিকেটের সাথে যোগসাজশে বড় বড় প্রকল্পের কাজ নির্দিষ্ট গ্রুপকে পাইয়ে দিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।
৩. ভুয়া বিল ও প্রাক্কলন জালিয়াতি
অভিযোগ রয়েছে, কোনো কাজ না করেই আরএপিপি (RAPP)-এর আওতায় কোটি কোটি টাকার ভুয়া বিল উত্তোলন করেছেন তিনি। টেন্ডারের প্রাক্কলন বা এস্টিমেট অস্বাভাবিক বাড়িয়ে দেখিয়ে সরকারি অর্থের সিংহভাগ লোপাট করাই ছিল তার প্রধান নেশা।
৪. বিদেশে অর্থ পাচার ও ‘র’ (RAW) ভীতি
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো দেশ থেকে অর্থ পাচার। অবৈধ উপায়ে অর্জিত শত শত কোটি টাকা তিনি হুন্ডির মাধ্যমে ভারতে পাচার করেছেন।
ভারতে সম্পদ: ভারতের কলকাতা এবং সল্টলেক এলাকায় তার ও তার পরিবারের নামে একাধিক বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ও বাণিজ্যিক ভবন রয়েছে।
ভুয়া পরিচয়: নিজেকে আইনের হাত থেকে বাঁচাতে তিনি ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ (RAW) এর সাথে ঘনিষ্ঠতার ভুয়া পরিচয় দিয়ে সহকর্মী ও সাধারণ মানুষদের নিয়মিত ভয়ভীতি প্রদর্শন করতেন।
প্রস্তাবিত ও প্রযোজ্য কঠোর শাস্তি
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, তার অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী রাষ্ট্রের উচিত তাকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করা:
সম্পদ বাজেয়াপ্ত: দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আইন ২০০৪ এর ২৬ ও ২৭ ধারা অনুযায়ী তার ও তার পরিবারের সকল স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করা।
কারাদণ্ড: অবৈধ সম্পদ অর্জন ও মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে তাকে সর্বনিম্ন ১২ বছর থেকে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান।
চাকুরি থেকে বরখাস্ত: বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে তাকে অবিলম্বে চাকুরি থেকে স্থায়ীভাবে বরখাস্ত করে সকল পেনশন ও সুযোগ-সুবিধা বাতিল করা।
ইন্টারপোল সহায়তা: ভারতে পাচারকৃত টাকা ও সম্পদ ফিরিয়ে আনতে আন্তর্জাতিক তদন্ত সংস্থার সহায়তা নেওয়া।
তদন্ত সংশ্লিষ্টদের মন্তব্য: নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা বলেন, “স্বর্ণেন্দু শেখর শুধু একজন প্রকৌশলী নন, তিনি ছিলেন সিস্টেমকে ভেতর থেকে ধ্বংস করার কারিগর। তার প্রতিটি ফাইল খতিয়ে দেখলে থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে।”