উত্তরায় খোকন-রোকন সিন্ডিকেটের ‘রাজত্ব’: রাজনৈতিক দালালি থেকে শতকোটি টাকার সুদের সাম্রাজ্য
বিশেষ প্রতিবেদক | ঢাকা
রাজধানীর উত্তরা ৪ নং সেক্টরের ১৯ নং রোড। গত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে এই এলাকাটি ছিল দুই ভাইয়ের কাছে জিম্মি। কিশোর গ্যাং লিডার হিসেবে পরিচিত রফিকুল হাসান সরকার খোকন এবং তার ছোট ভাই উত্তরা পূর্ব থানা ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সভাপতি আমিনুল হাসান সরকার রোকন—এই দুই সহোদরের হাতে নির্যাতিত হয়নি এমন মানুষ ওই এলাকায় খুঁজে পাওয়া দায়। আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে তারা গড়ে তুলেছিলেন এক ভয়ংকর ত্রাসের রাজত্ব।

১. রাজনৈতিক দালালি ও ‘সোর্স’ হিসেবে উত্থান
অনুসন্ধানে দেখা যায়, রোকন তার ছাত্রলীগের পদকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে উত্তরা পূর্ব থানা পুলিশের সাথে এক গভীর সখ্যতা গড়ে তোলেন। ১৭ বছর ধরে তার মূল কাজ ছিল বিএনপিপন্থী নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের তালিকা তৈরি করা। টাকার বিনিময়ে তিনি পুলিশের ‘সোর্স’ হিসেবে কাজ করতেন। গভীর রাতে পুলিশ নিয়ে নেতা-কর্মীদের বাসায় হানা দেওয়া, তাদের অবস্থান শনাক্ত করা এবং টাকার বিনিময়ে কাউকে কাউকে ছাড়িয়ে দেওয়ার নাম করে দুই পক্ষ থেকেই বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিতেন তিনি। এই ‘ধরিয়ে দেওয়ার রাজনীতি’র মাধ্যমে রোকন কয়েকশ কোটি টাকার মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
২. আজমপুর বিডিআর মার্কেটে ‘সুদের বিষদাঁত’
খোকন ও রোকনের আয়ের অন্যতম উৎস ছিল আজমপুর বিডিআর মার্কেটের সুদের ব্যবসা। সাধারণ ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের বিপদে ফেলে চড়া সুদে টাকা ধার দিতে বাধ্য করা হতো। অভিযোগ আছে, তাদের সুদের হার ছিল আকাশচুম্বী। কোনো ব্যবসায়ী টাকা দিতে সামান্য দেরি করলে তার ওপর চলতো অমানবিক নির্যাতন।
৩. গোপন টর্চার সেল: উত্তরার ‘মিনি আয়নাঘর’
ভুক্তভোগীদের বর্ণনা অনুযায়ী, ৪ নং সেক্টরের ১৯ নং রোড সংলগ্ন একটি এলাকায় তারা গড়ে তুলেছিলেন নিজস্ব টর্চার সেল। টাকা দিতে ব্যর্থ হওয়া ব্যবসায়ী বা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে সেখানে তুলে নিয়ে গিয়ে দিনের পর দিন আটকে রাখা হতো। মারধরের ধরণ ছিল এতটাই নৃশংস যে, অনেকে ভয়ে এখনো মুখ খুলতে সাহস পান না। স্থানীয়দের ভাষায় এটি ছিল উত্তরার ‘মিনি আয়নাঘর’। সেখানে ভুক্তভোগীদের ওপর শারীরিক নির্যাতনের পাশাপাশি ভয়ভীতি দেখিয়ে জোরপূর্বক জমি বা দোকানের মালিকানা লিখে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
৪. কিশোর গ্যাংয়ের আশ্রয়দাতা খোকন
বড় ভাই রফিকুল হাসান সরকার খোকন মূলত কিশোর গ্যাংয়ের মাধ্যমে পুরো এলাকার রাস্তাঘাট নিয়ন্ত্রণ করতেন। ১৯ নং রোডে সাধারণ মানুষের চলাচলে বাধা সৃষ্টি করা, ইভটিজিং এবং ছোটখাটো দোকান থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায় ছিল খোকনের বাহিনীর নিত্যদিনের কাজ। রোকন রাজনৈতিক আশ্রয় দিতেন আর খোকন মাঠ পর্যায়ে সেই শক্তি প্রয়োগ করতেন।
৫. অর্থপাচার ও অবৈধ সম্পদের পাহাড়
উত্তরা ও এর আশপাশে এই দুই ভাইয়ের একাধিক ফ্ল্যাট, প্লট এবং বিলাসীবহুল গাড়ি রয়েছে বলে জানা গেছে। সাধারণ পরিবারের সন্তান হয়েও গত ১৭ বছরে তাদের এই অস্বাভাবিক সম্পদ বৃদ্ধির পেছনে সুদের ব্যবসা, রাজনৈতিক চাঁদাবাজি এবং থানা-পুলিশের দালালিই ছিল প্রধান উৎস।
জনসাধারণের দাবি: দ্রুত গ্রেপ্তার ও বিচার
৫ই আগস্টের পটপরিবর্তনের পর এই দুই ভাইয়ের অপকর্মের চিত্র একে একে বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা দাবি জানিয়েছেন:
অবিলম্বে খোকন ও রোকনকে গ্রেপ্তার করতে হবে।
তাদের গোপন টর্চার সেল এবং সুদের ব্যবসার হিসাব তদন্ত করতে হবে।
ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং তাদের অবৈধ সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে হবে।
পুলিশ প্রশাসনের একটি সূত্র জানিয়েছে, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে এলাকাবাসীর দাবি, তাদের অপরাধ এতটাই স্পষ্ট যে কোনো দেরি না করে বিশেষ অভিযানের মাধ্যমে এদের আইনের আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি।