নোয়াখালী, হাতিয়া | মাহিদুল ইসলাম হিমেল
শুক্রবার রাত। সময় প্রায় ৯টা।
নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার একটি পুকুরপাড়ে চার কিশোর বসে আছে—মুঠোফোনে গেম, গলা ছেড়ে আড্ডা, যেন শহুরে সন্ধ্যার চেনা দৃশ্য। কিন্তু আচমকাই সে দৃশ্য বদলে যায়।
হঠাৎ সেখানে হাজির উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আলাউদ্দিন। তিনি কিশোরদের কাছে গিয়ে পরিচয় নেন, কথা বলেন—তারপর একেবারে সরাসরি বসিয়ে দেন পড়ার টেবিলে!
একটা বাস্তব ঘটনা—যা শুনলে গল্প মনে হয়, কিন্তু তা হয়ে উঠেছে প্রশাসনের মানবিকতাপূর্ণ ব্যতিক্রমী এক দৃষ্টান্ত।
চার কিশোরের বয়স ১৫ থেকে ১৭-এর মধ্যে, সদ্য এসএসসি পরীক্ষা শেষ করেছে। আমাদের সমাজে সন্ধ্যার পর রাস্তায় ঘোরা কিশোরদের অনেক সময়ই “উচ্ছৃঙ্খল” ভাবা হয়। কিন্তু ইউএনও আলাউদ্দিন বেছে নিলেন ভিন্ন পথ।
কঠোর আইন প্রয়োগের পরিবর্তে তিনি নিজ বাসভবনের সামনে বসিয়ে দিলেন পড়তে। হাতে খাতা-কলম, টেবিলে বই—এ যেন এক ব্যতিক্রমী পাঠশালা।
পরবর্তীতে উপজেলা প্রশাসনের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে ঘটনাটির ছবি পোস্ট করা হয়। কমেন্ট সেকশনে দেখা যায়, বিষয়টি নিয়ে মতবিরোধ স্পষ্ট।
মূল প্রশ্নটা এখন দাঁড়িয়েছে—একজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কতটা ‘শিক্ষকসুলভ’ ভূমিকা নিতে পারেন? এর মাধ্যমে প্রশাসনের গঠনমূলক অংশগ্রহণ কি শুরু হলো, না কি এটি এক ধরনের মাইক্রো-ম্যানেজমেন্ট?
ইউএনও আলাউদ্দিনের বক্তব্য সরল:
“ওরা ছাত্র। কঠিন শাস্তি দিয়ে নয়, বোঝানোর মাধ্যমে যেন ভুল বুঝতে পারে—এই চেষ্টাই করেছি। ভবিষ্যতে আবারও এমন কাউকে পেলে পড়ার টেবিলেই বসাব।”
প্রশাসন মানেই কাগজপত্র, ফাইল, শাস্তি—এই একরৈখিক ধারণা বদলানোর সময় এসেছে কি না, সেটাই এখন আলোচনার বিষয়।
ইউএনও আলাউদ্দিন হয়তো প্রশাসনিক রুলবুক অক্ষরে অক্ষরে অনুসরণ করেননি, কিন্তু মানুষের মন জয় করেছেন—একজন অভিভাবকের মতো।
এই ঘটনাটি প্রশাসনের এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গির ইঙ্গিত দেয়। সমাজের আগামী প্রজন্মের জন্য এমন হস্তক্ষেপ যদি কাঠামোবদ্ধ হয়, তাহলে এটি “ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা” থেকে রূপ নিতে পারে একটি রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে—যেখানে পুলিশ নয়, ‘পড়ার টেবিল’ দিয়েই শুরু হয় সমাজ বদলের চাবিকাঠি।
এক রাতের আড্ডা থেকে পাঠশালায়—এই রূপান্তর যদি দৃষ্টান্ত হয়, তবে সেই পথে প্রশাসনকে আরও দায়িত্বশীল, আরও মানবিক হতে হবে।
প্রতিবেদক: মাহিদুল ইসলাম হিমেল
স্থান: হাতিয়া, নোয়াখালী
১৯ জুলাই ২০২৫