অনুদানের চালে ‘চাঁদাবাজি’: অষ্টগ্রামে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে তোলপাড়, ইউএনও ও থানায় জোড়া অভিযোগ
বিজয় কর রতন, কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি:
কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলখ্যাত অষ্টগ্রাম উপজেলায় শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে সরকারের দেওয়া চাল বিতরণকে কেন্দ্র করে এক নজিরবিহীন ও বিতর্কিত ঘটনা সামনে এসেছে। উপজেলায় সরকারি বরাদ্দকৃত চাল নেওয়ার বিনিময়ে প্রতিটি পূজামণ্ডপ থেকে ১ হাজার টাকা করে বাধ্যতামূলক ‘চাঁদা’ আদায়ের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে এক প্রভাবশালী প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে।
অভিযোগের তির অষ্টগ্রাম পাইলট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক এবং উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের আহ্বায়ক দেবেশ চন্দ্র দাসের দিকে। এ ঘটনায় স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
ঘটনার সুষ্ঠু বিচার ও জড়িতদের শাস্তি দাবি করে বুধবার (১৪ অক্টোবর) উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং অষ্টগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বরাবর পৃথক দুটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন উপজেলা পূজা উদযাপন ফ্রন্টের আহ্বায়ক শ্রীকৃষ্ণ দাস।
ঘটনার বিবরণ ও অভিযোগের প্রেক্ষাপট
অভিযোগপত্র ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত সোমবার (১২ অক্টোবর) অষ্টগ্রাম উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে উপজেলার মোট ৪৫টি নিবন্ধিত দুর্গাপূজা মণ্ডপের অনুকূলে অনুদান হিসেবে মণ্ডপপ্রতি ৬০০ কেজি করে চাল বিতরণ করা হয়। পূজা মণ্ডপগুলোর সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে সরকারিভাবে এই চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল।
তবে অভিযোগ উঠেছে, চাল বিতরণ কার্যক্রম শেষ হওয়ার পরপরই বিকেলবেলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় সংলগ্ন সভাকক্ষে অবস্থান নেন দেবেশ চন্দ্র দাস ও তাঁর কয়েকজন সহযোগী। সেখানে তাঁরা নিজেদের প্রশাসনিক ও দলীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে চাল নিতে আসা প্রতিটি পূজামণ্ডপের প্রতিনিধিদের কাছ থেকে ১,০০০ টাকা করে আদায় করেন।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত কয়েকজন মণ্ডপ প্রতিনিধি অন্যায়ভাবে টাকা নেওয়ার বিষয়টি নিয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ জানালেও দেবেশ চন্দ্র দাস এবং তাঁর সঙ্গীরা তা পুরোপুরি উপেক্ষা করে জোরপূর্বক টাকা আদায় করেন বলে লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
ভুক্তভোগী ও পূজা কমিটির তোপ
অনুদানের চাল থেকে টাকা আদায়ের ঘটনাকে ‘প্রকাশ্য চাঁদাবাজি’ উল্লেখ করে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় পূজা কমিটির নেতৃবৃন্দ।
অভিযোগকারী ও উপজেলা পূজা উদযাপন ফ্রন্টের আহ্বায়ক শ্রীকৃষ্ণ দাস বলেন:
“সরকার পূজা উদযাপনের জন্য অসহায় ও ভক্তদের সহায়তায় চাল অনুদান দিয়েছে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় হলো, চাল হাতে পাওয়ার পরপরই দেবেশ চন্দ্র দাস ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে প্রতিটি মণ্ডপ থেকে ১ হাজার টাকা করে হাতিয়ে নিয়েছেন। এটি একটি জঘন্য ও নীতিবর্জিত কাজ।”
অষ্টগ্রাম সার্বজনীন যুব সংঘের সাধারণ সম্পাদক আশীষ কুমার দেবনাথ ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান:
“সরকারি চাল পাওয়ার পর প্রতিটা মণ্ডপ থেকে অন্যায়ভাবে এবং জোরপূর্বক এই টাকা আদায় করা হয়েছে। আমরা উপস্থিত থেকে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিলাম, কিন্তু তারা আমাদের কোনো কথাই শোনেনি। সরকারি অনুদানের ওপর এমন থাবা বসানো অত্যন্ত লজ্জাজনক। আমরা এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত চাই এবং অভিযুক্তদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি।”
অভিযুক্তের সাফাই ও ব্যাখ্যা
তবে জোরপূর্বক চাঁদা আদায়ের অভিযোগ ভিত্তিহীন দাবি করে নিজের বক্তব্য দিয়েছেন অভিযুক্ত দেবেশ চন্দ্র দাস। মুঠোফোনে দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ-কে তিনি বলেন:
“পূজা উদযাপন পরিষদের নিজস্ব কোনো স্থায়ী ফান্ড নেই। এছাড়া বিগত দিনের বিভিন্ন অনুষ্ঠান পরিচালনার কারণে সংগঠনের কিছু বকেয়া ঋণও রয়ে গেছে। গত সোমবার চাল বিতরণের পর ৪৫টি মণ্ডপের প্রতিনিধি এবং সনাতন সমাজের জ্যেষ্ঠ নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতে সর্বসম্মতভাবেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এটি কোনো অন্যায় বা জোরপূর্বক আদায় করা চাঁদা নয়; প্রতি বছরই সংগঠনের পরিচালনা ব্যয়ের জন্য মণ্ডপগুলো থেকে সর্বসম্মতিক্রমে এমন অনুদান সংগ্রহ করা হয়ে থাকে।”
আইন ও শাস্তি: সরকারি বিধিমালা ও দণ্ডবিধির প্রতিফলন
আইনজ্ঞ ও বিশিষ্ট মহলের মতে, সরকারি অনুদান বা ত্রাণসামগ্রী বিতরণের স্থানে প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে অর্থ আদায় করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। যদি তদন্তে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হয়, তবে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি আইনি ধারায় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে:
সরকারি চাকরি বিধিমালা ও বিভাগীয় ব্যবস্থা:
যেহেতু দেবেশ চন্দ্র দাস একটি সরকারি হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক, তাই সরকারি চাকরি (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা ২০১৮ অনুযায়ী এটি চরম ‘অসদাচরণ’ (Misconduct) হিসেবে গণ্য হবে। অপরাধ প্রমাণিত হলে তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত কিংবা স্থায়ীভাবে চাকরিচ্যুত করা হতে পারে।
দণ্ডবিধি অনুযায়ী অপরাধ (Penাল Code):
দণ্ডবিধির ৩৮৩ ও ৩৮৪ ধারা (চাঁদাবাজি/Extortion): ভয়ভীতি দেখিয়ে বা জোরপূর্বক অর্থ আদায় প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ ৩ বছরের কারাদণ্ড, জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান রয়েছে।
দণ্ডবিধির ৪০৬ ধারা (বিশ্বাসভঙ্গ/Criminal Breach of Trust): সরকারি দায়িত্ব বা অর্পিত ক্ষমতার বিশ্বাসভঙ্গ করে অর্থ আত্মসাৎ করলে ৩ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
দণ্ডবিধির ১৬৬ ধারা: সরকারি কর্মচারী হয়ে আইন অমান্য করে কারো ক্ষতি সাধন করলে ১ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন (১৯৪৭):
সরকারি পদে থেকে পদমর্যাদার অপব্যবহার করে অনৈতিক আর্থিক সুবিধা গ্রহণ বা অর্থ আদায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এর আওতাভুক্ত অপরাধ হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।
প্রশাসন ও পুলিশের পদক্ষেপ
বিষয়টি নিয়ে অষ্টগ্রাম উপজেলা প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তা ও থানা পুলিশের সাথে যোগাযোগ করা হলে তাঁরা আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাথী দাস বলেন:
“পূজা উদযাপন ফ্রন্টের আহ্বায়ক শ্রীকৃষ্ণ দাস একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। বিষয়টি আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছি। অভিযুক্ত দেবেশ চন্দ্র দাসসহ উপস্থিত অন্যান্যদের সাথে কথা বলে এবং ঘটনা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
অষ্টগ্রাম থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ রুকনুজ্জামান জানান:
“এ বিষয়ে থানায় একটি লিখিত অভিযোগ এসেছে। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। তদন্তে সত্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।”
জনমনে প্রতিক্রিয়া
হাওরের প্রত্যন্ত অঞ্চলের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অভিমত, দুর্গোৎসবের মতো একটি পবিত্র ধর্মীয় উৎসবে সরকারের দেওয়া অনুদান থেকে এভাবে টাকা কেটে নেওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক। স্থানীয় সচেতন মহল আশা করছেন, নীতিনৈতিকতার চরম অবক্ষয় রোধে এবং ভীতিহীন পরিবেশে পূজা নিশ্চিত করতে প্রশাসন দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।