অনুসন্ধানী মহাপ্রতিবেদন: আশুলিয়ায় এসআই আনোয়ারের ‘রক্তের বাণিজ্য’—আইনের শাসন কি তবে টাকার কাছে জিম্মি?
প্রতিবেদন: বিশেষ প্রতিনিধি, সাব্বির আহমেদ তারিখ: ৮ জানুয়ারি, ২০২৬
আশুলিয়া, ঢাকা: বাংলাদেশের ইতিহাসে চব্বিশের ছাত্র-জনতার বিপ্লব এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। হাজারো শহীদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে যখন একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখা হচ্ছে, ঠিক তখনই আশুলিয়া থানার এসআই আনোয়ার হোসেন ওরফে ‘পেট মোটা আনোয়ার’-এর মতো কিছু পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে উঠেছে শহীদের রক্তের সাথে বেইমানির অভিযোগ। টাকার বিনিময়ে খুনিদের ছেড়ে দেওয়া এবং সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে অর্থ আদায়ের যে মহোৎসব তিনি শুরু করেছেন, তা কেবল অপরাধ নয়—বরং রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এক চরম বিশ্বাসঘাতকতা।
ঘটনার গভীরে: অপরাধের লোমহর্ষক খতিয়ান
স্থানীয় একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র এবং ভুক্তভোগীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এসআই আনোয়ার আশুলিয়া থানায় এক ‘সমান্তরাল প্রশাসন’ গড়ে তুলেছেন। তার আয়ের প্রধান উৎস হলো—আটক বাণিজ্য ও মামলার আসামি কেনাবেচা।
১. খুনিকে মুক্তি (জামান মীর মামলা): ছাত্র-জনতা হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি জামান মীরকে জামগড়া থেকে আটক করার পর ৫ লক্ষ টাকার বিশাল অঙ্কের বিনিময়ে ‘অসুস্থ’ দেখিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। আইনের ভাষায় একে বলা হয় ‘খুনিকে মদদ দেওয়া’।
২. কালু মিয়ার মুক্তি ও জিম্মি দশা: ঘোষবাগ এলাকার বাসিন্দা কালু মিয়াকে কোনো ওয়ারেন্ট ছাড়াই তুলে এনে ১ লক্ষ টাকা দাবি করা হয়। টাকা পাওয়ার পর কোনো প্রকার আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই তাকে গেট দিয়ে বের করে দেওয়া হয়।
রাজনৈতিক ঢাল ও তথাকথিত ‘নেতা’দের ভূমিকা
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, এসআই আনোয়ার যখন এসব অপকর্ম করছেন, তখন তার রক্ষক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন স্থানীয় বিএনপির ২/১ জন নেতা। প্রশ্ন উঠেছে, একজন দুর্নীতিবাজ অফিসারের পক্ষে এই নেতাদের এত দয়া কেন?
টাকার ভাগাভাগি: অভিযোগ রয়েছে, আসামি ছাড়ানোর টাকার একটি অংশ এই নেতাদের পকেটেও যাচ্ছে।
আদর্শিক বিচ্যুতি: যারা গতকাল ফ্যাসিবাদবিরোধী স্লোগান দিয়েছেন, তারা আজ খুনিদের বাঁচাতে দুর্নীতিবাজ পুলিশের দালালি করছেন—এটি সাধারণ কর্মীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।
আইনের দৃষ্টিতে এসআই আনোয়ারের শাস্তি: কী বলছে বাংলাদেশের সংবিধান ও দণ্ডবিধি?
এসআই আনোয়ার যে অপরাধগুলো করেছেন, বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী তার জন্য কঠিন কারাদণ্ড ও চাকরিচ্যুতির বিধান রয়েছে। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, তার বিরুদ্ধে নিচের ধারাগুলো সরাসরি প্রযোজ্য:
১. দণ্ডবিধি ২১৮ ধারা (পাবলিক সার্ভেন্ট কর্তৃক মিথ্যা নথি প্রস্তুত): যদি কোনো সরকারি কর্মচারী কাউকে শাস্তি থেকে বাঁচাতে বা সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত হওয়া থেকে রক্ষা করতে মিথ্যা রেকর্ড তৈরি করেন, তবে তার ৩ বছরের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড হবে। (আসামি জামান মীরকে অসুস্থ দেখানো এই ধারায় অপরাধ)।
২. দণ্ডবিধি ২২১ ধারা (আসামিকে গ্রেপ্তার না করা বা ছেড়ে দেওয়া): কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় কোনো অপরাধীকে যদি কোনো সরকারি কর্মচারী ইচ্ছাকৃতভাবে গ্রেপ্তার না করেন বা গ্রেপ্তার করার পর ছেড়ে দেন, তবে অপরাধের ধরণ অনুযায়ী তার ৭ বছর থেকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে।
৩. দণ্ডবিধি ১৬১ ধারা (ঘুষ গ্রহণ): কোনো সরকারি কর্মচারী বৈধ পারিশ্রমিক ছাড়া অন্য কোনো উপায়ে টাকা গ্রহণ করলে তার ৩ বছরের কারাদণ্ড হবে।
৪. দণ্ডবিধি ৩৮৩ ও ৩৮৪ ধারা (চাঁদাবাজি ও ভয় প্রদর্শন): কাউকে ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় (যেমন কালু মিয়ার ক্ষেত্রে ঘটেছে) করা একটি দণ্ডনীয় অপরাধ। এর শাস্তি ৩ বছরের কারাদণ্ড।
৫. পুলিশ রেগুলেশনস অব বেঙ্গল (PRB): বিভাগীয় তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে এসআই আনোয়ারের চাকরিচ্যুতি (Dismissal) বাধ্যতামূলক। পাশাপাশি তার অর্জিত অবৈধ সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার আইনি সুযোগ রয়েছে।
জনরোষ ও সিস্টেমের পচন
এসআই আনোয়ারের মতো কর্মকর্তাদের কারণে আজ পুরো পুলিশ বাহিনী কলঙ্কিত হচ্ছে। মানুষ প্রশ্ন করছে—থানা কি তবে নিলাম কেন্দ্র? যেখানে অপরাধীদের মুক্তি কেনাবেচা হয়?
বিশেষ প্রতিনিধি সাব্বির আহমেদের কলম থেকে: “আমি যখন এই দুর্নীতির কথা লিখলাম, তখন কিছু নেতার গায়ে আগুন লাগলো। কেন? কারণ আপনারা এই পাপের ভাগিদার। যারা আনোয়ারকে ‘পীর-দরবেশ’ বানাচ্ছেন, তারা আসলে শহীদের রক্তের সাথে মুনাফেকি করছেন। মনে রাখবেন, সিস্টেম বদলানোর লড়াইটা আপনাদের মতো দালালদের বিরুদ্ধেও।”
প্রশাসনের প্রতি দাবি
অবিলম্বে এসআই আনোয়ারকে ক্লোজ করে বিভাগীয় মামলা করতে হবে।
ছাত্র হত্যা মামলার আসামি জামান মীরকে পুনরায় গ্রেপ্তার করতে হবে।
যেসকল রাজনৈতিক ব্যক্তি এই দুর্নীতির মধ্যস্থতা করেছে, তাদের তালিকা প্রকাশ করতে হবে।
শহীদ আবু সাঈদ, মুগ্ধদের রক্তে কেনা এই বাংলাদেশে কোনো ‘আনোয়ার সিন্ডিকেট’ চলতে পারে না। এদের বিচার না হওয়া পর্যন্ত কলম থামবে না।