বিশেষ প্রতিবেদক:
দেশের সফটওয়্যার ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতের অন্যতম প্রধান বাণিজ্য সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস—বেসিসের নির্বাচন ঘিরে অনিশ্চয়তা যেন কাটছেই না। ভোটার তালিকা নিয়ে বিরোধ, নির্বাচনী তফসিল বাতিল, সহায়ক কমিটি গঠন, সেই কমিটির গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন এবং সর্বশেষ কমিটির কার্যক্রম স্থগিত—সব মিলিয়ে বেসিসের নির্বাচনী প্রক্রিয়া আবারও জটিলতার মধ্যে পড়েছে।
এর মধ্যেই জাতীয়তাবাদী আইসিটি ফোরামের সাংগঠনিক সম্পাদক এবং বেসিসের কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত প্রকৌশলী মোহাম্মদ জুয়েলকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট’ হিসেবে উপস্থাপন করে প্রচারণার অভিযোগ উঠেছে।
জুয়েলের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, সাংবাদিক ইলিয়াস, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকর্মী রূপম রাজ্জাকসহ কয়েকটি অ্যাকাউন্ট থেকে তাঁর ছবি ব্যবহার করে এ ধরনের প্রচারণা চালানো হয়েছে।
তবে বিষয়টির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, প্রচারণায় ব্যবহৃত একটি ছবির questioned version বা প্রশ্নবিদ্ধ সংস্করণ নিয়ে করা ডিজিটাল ইমেজ ফরেনসিক বিশ্লেষণে ছবিটিতে পরবর্তীতে গ্রাফিক উপাদান যুক্ত করার আলামত পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট ফরেনসিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা জরুরি—কোনো ছবিতে ডিজিটাল সম্পাদনার আলামত পাওয়া গেলেই কে ছবিটি তৈরি করেছেন, কে সেটি ছড়িয়েছেন কিংবা এর পেছনে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা নির্বাচনী পক্ষ ছিল—তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রমাণিত হয় না। এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে আরও তদন্ত ও ডিজিটাল তথ্য যাচাই প্রয়োজন।
নির্বাচন ঘিরে শুরু থেকেই অনিশ্চয়তা
বেসিসের ২০২৬–২০২৮ মেয়াদের নির্বাচন নিয়ে শুরু থেকেই নানা জটিলতা তৈরি হয়।
প্রথমে ২৬ সেপ্টেম্বর নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। ২৭ আগস্ট প্রকাশিত প্রাথমিক তালিকায় ১১টি পরিচালক পদের বিপরীতে ২৬ জন প্রার্থীর নাম আসে। পরে ২ সেপ্টেম্বর নির্বাচন বোর্ড বৈধ ও অবৈধ প্রার্থীদের তালিকা প্রকাশ করে।
ওই তালিকায় সভাপতি পদপ্রার্থী রাফেল কবির ও মোস্তফা রফিকুল ইসলামসহ কয়েকজনের প্রার্থিতা অবৈধ ঘোষণা করা হয়।
কিন্তু চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশের পরদিনই নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় বড় পরিবর্তন আসে। ৩ সেপ্টেম্বর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ঘোষিত নির্বাচনী তফসিল বাতিল করে। একই সঙ্গে বেসিসের বৈধ সদস্য যাচাই, ভোটার তালিকা হালনাগাদ এবং বাদ পড়া যোগ্য সদস্যদের অন্তর্ভুক্তির লক্ষ্যে সহায়ক কমিটি গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়।
এরপর নতুন করে নির্বাচন আয়োজনের পরিবর্তে শুরু হয় ভোটার তালিকা যাচাই ও সহায়ক কাঠামো নিয়ে আলোচনা।
সহায়ক কমিটি নিয়েও তৈরি হয় বিরোধ
৩ সেপ্টেম্বরের নির্দেশনার পর ২২ সেপ্টেম্বর প্রশাসককে সহযোগিতার জন্য সাত সদস্যের একটি সহায়ক কমিটি গঠন করা হয়।
কমিটিতে ছিলেন ইঞ্জি. মোহাম্মদ জুয়েল, আব্দুল্লাহ ইবনে নূরুল ইসলাম, মো. আহসান হাবিব, ফেরদৌস আলম, মো. ফুয়াদ হাসান, মো. রাশেদ উল হক সরকার এবং মোহাম্মদ তাফিদ হাসান চৌধুরী।
কমিটির দায়িত্ব ছিল নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্তি এবং বিদ্যমান সদস্যদের তথ্য যাচাই ও হালনাগাদে প্রশাসককে সহযোগিতা করা।
কিন্তু কমিটি গঠনের পরপরই এর সদস্য নির্বাচন নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়। জাতীয়তাবাদী আইসিটি ফোরামের পক্ষ থেকেও কমিটি বাতিলের আবেদন করা হয়েছিল বলে প্রকাশিত সংবাদে উল্লেখ রয়েছে।
এর মধ্যেই মাত্র ছয় দিনের মাথায়, ২৮ সেপ্টেম্বর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বাণিজ্য সংগঠন-২ শাখার উপসচিব চৌধুরী সামিয়া ইয়াসমীনের স্বাক্ষরিত আদেশে ওই সহায়ক কমিটির কার্যক্রম স্থগিত করা হয়।
অর্থাৎ ২২ সেপ্টেম্বর গঠিত কমিটি ২৮ সেপ্টেম্বরই কার্যত স্থগিত হয়ে যায়।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কমিটির কার্যক্রম স্থগিতের সরকারি আদেশে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা অভিযোগকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা ও বিভিন্ন পক্ষের আপত্তির খবর থাকলেও সরকারি আদেশ এবং রাজনৈতিক বা সামাজিক আলোচনাকে একই বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
এর মধ্যেই জুয়েলকে ঘিরে রাজনৈতিক প্রচারণা
সহায়ক কমিটি নিয়ে এই বিরোধের মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকৌশলী মোহাম্মদ জুয়েলের একটি পুরোনো ছবির পরিবর্তিত সংস্করণ ছড়িয়ে পড়ে।
প্রচারিত ছবিতে জুয়েলের portrait-এর সঙ্গে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি cut-out ছবি এবং ‘WE ALL ARE SHEIKH HASINA’S MEN’ লেখা সবুজ-লাল গ্রাফিক দেখা যায়।
ছবিটি ব্যবহার করে জুয়েলের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয় বলে তাঁর পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে।
জুয়েলের দাবি, ছবিটি তাঁর মূল ছবি নয়; বরং একটি পুরোনো ছবির সঙ্গে রাজনৈতিক গ্রাফিক যুক্ত করে সেটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
এই দাবির সত্যতা যাচাইয়ের অংশ হিসেবে দুটি ছবির ডিজিটাল ফরেনসিক তুলনা করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
ফরেনসিক পরীক্ষায় কী পাওয়া গেছে
২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখের Digital Image Forensic Comparison Report-এ একটি reference বা তুলনামূলক ছবি এবং একটি questioned image বিশ্লেষণ করা হয়।
রিপোর্টের executive summary অনুযায়ী, দুই ছবির portrait ও background-এর বড় অংশ একই source photograph-এর সঙ্গে উচ্চমাত্রায় সামঞ্জস্যপূর্ণ।
ফরেনসিক পরীক্ষায় reference image-এ ৪ হাজার ৭৯৫টি এবং questioned image-এ ৫ হাজার ORB feature শনাক্ত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ratio-test-এর ৬৩৮টি match-এর মধ্যে ৫৬৮টি RANSAC inlier পাওয়া যায়। রিপোর্টে এর inlier ratio প্রায় ৮৯ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
সহজ ভাষায়, পরীক্ষায় দুই ছবির মূল portrait ও background-এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য মিল পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে questioned image-এ যে রাজনৈতিক graphic দেখা যাচ্ছে, সেটি reference image-এ ছিল না বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
ফরেনসিক assessment অনুযায়ী, ওই graphic block-এর মধ্যে একজন নারীর cut-out portrait, সবুজ-লাল background এবং ‘WE ALL ARE SHEIKH HASINA’S MEN’ লেখা রাজনৈতিক বক্তব্য যুক্ত করা হয়েছে।
অর্থাৎ ফরেনসিক প্রতিবেদনের দাবি অনুযায়ী, প্রশ্নবিদ্ধ ছবির মূল portrait এবং background-এর সঙ্গে reference ছবির মিল থাকলেও রাজনৈতিক গ্রাফিকটি অতিরিক্তভাবে যুক্ত হয়েছে।
মেটাডেটাতেও পাওয়া গেছে Canva-এর তথ্য
ফরেনসিক প্রতিবেদনে questioned JPEG ফাইলের metadata বিশ্লেষণের কথাও উল্লেখ রয়েছে।
সেখানে ‘Canva (Renderer)’ শনাক্ত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ প্রশ্নবিদ্ধ JPEG ফাইলটি Canva-ভিত্তিক কোনো প্রক্রিয়ায় export বা render করা হয়ে থাকতে পারে।
রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, পরীক্ষিত ফাইলটিকে ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১ সালের untouched বা original Facebook image হিসেবে প্রযুক্তিগতভাবে সমর্থন করা যায়নি।
তবে এখানেও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। Canva-এর metadata পাওয়া মানেই নির্দিষ্ট ব্যক্তি ছবিটি তৈরি করেছেন—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। একইভাবে ছবিতে সম্পাদনার আলামত পাওয়া গেলেও কে সম্পাদনা করেছেন, কখন করেছেন এবং কী উদ্দেশ্যে করেছেন—সেটি আলাদাভাবে প্রমাণ করতে হবে।
ফরেনসিক রিপোর্টের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক
এই ঘটনায় ফরেনসিক রিপোর্টের গুরুত্ব মূলত এখানেই যে, এটি প্রশ্নবিদ্ধ ছবির ডিজিটাল কাঠামো নিয়ে একটি প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ দিয়েছে।
কিন্তু ফরেনসিক রিপোর্ট থেকে সরাসরি এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না যে সাংবাদিক ইলিয়াস, রূপম রাজ্জাক কিংবা অন্য কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি ছবিটি তৈরি করেছেন।
তাদের কোনো অ্যাকাউন্ট থেকে ছবিটি প্রচার হয়ে থাকলে সেটি আলাদা তদন্তের বিষয়।
কে প্রথম ছবিটি আপলোড করেছেন, মূল ফাইল কোথা থেকে এসেছে, ছবিটি কখন সম্পাদনা করা হয়েছে, প্রথম পোস্টটি কার অ্যাকাউন্ট থেকে এসেছে, কারা সেটি শেয়ার করেছেন এবং পোস্টদাতারা ছবিটির উৎস সম্পর্কে কী জানতেন—এসব তথ্য বের করা গেলে ঘটনার প্রকৃত চিত্র আরও পরিষ্কার হতে পারে।
প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মের সংরক্ষিত তথ্যও তদন্তের অংশ হতে পারে।
আগেই থানায় জিডির তথ্য
জুয়েলের সরবরাহ করা নথিতে দেখা যায়, তাঁর ছবি পরিবর্তন করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের বিষয়ে তিনি আগেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে অভিযোগ করেছিলেন।
উত্তরা পশ্চিম থানায় করা একটি সাধারণ ডায়েরির কপিতে তাঁর ছবি পরিবর্তন করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার এবং তাঁকে নিয়ে আপত্তিকর বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগের কথা উল্লেখ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে দেখা যায়।
অর্থাৎ বর্তমান বেসিস নির্বাচনকেন্দ্রিক বিতর্কের আগেও ছবি পরিবর্তন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার নিয়ে তাঁর পক্ষ থেকে আইনগত প্রতিকার চাওয়ার একটি নথি রয়েছে।
তবে ওই জিডিতে উল্লেখিত অভিযোগ এবং বর্তমান প্রশ্নবিদ্ধ ছবির ঘটনা একই সূত্রে পরিচালিত কি না, তা আলাদাভাবে তদন্তের বিষয়।
‘আওয়ামী লীগ’ সংশ্লিষ্টতার অভিযোগের বিপরীতে জুয়েলের রাজনৈতিক পরিচয়
জুয়েলের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘আওয়ামী লীগ’ সংশ্লিষ্টতার যে প্রচারণা হয়েছে, তার বিপরীতে তাঁর সরবরাহ করা রাজনৈতিক জীবনবৃত্তান্তে দীর্ঘদিনের জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততার দাবি রয়েছে।
ওই নথি অনুযায়ী, ২০০৩ সাল থেকে তিনি ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ঢাকা মহানগর উত্তরের কামাল–দীপক কমিটিতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সহ-সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন বলে তাঁর নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরবর্তীতে জিয়া ব্রিগেড ও জাতীয়তাবাদী সাইবার দলের সঙ্গে যুক্ত থাকার কথাও ওই জীবনবৃত্তান্তে রয়েছে।
বর্তমানে তিনি জাতীয়তাবাদী আইসিটি ফোরামের সাংগঠনিক সম্পাদক বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
জাতীয়তাবাদী আইসিটি ফোরামের ২০২৬ সালের কমিটির নথিতেও মোহাম্মদ জুয়েলকে সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দেখানো হয়েছে।
তবে কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের পদে থাকা বা কোনো রাজনৈতিক জীবনবৃত্তান্তে কোনো পরিচয় উল্লেখ থাকা—এগুলোকে আলাদা রাজনৈতিক অভিযোগের চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে না দেখে সংশ্লিষ্ট নথির ভিত্তিতে যাচাই করা প্রয়োজন।
বেসিসের সঙ্গে জুয়েলের সম্পৃক্ততাও দীর্ঘদিনের
জুয়েলকে বেসিসের কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পূর্ণ সম্পর্কহীন হিসেবে দেখানোর সুযোগও পাওয়া তথ্যের সঙ্গে মেলে না।
BASIS-এর previous associate committee-সংক্রান্ত নথি অনুযায়ী, ২৭ অক্টোবর ২০২৫ গঠিত ১০ সদস্যের Associate Committee-তে Md Jewel সদস্য ছিলেন।
তাঁর CV-তে ২০২৪–২০২৫ সময়ে BASIS Local Market Standing Committee-এর চেয়ারম্যান এবং ২০২৫–২০২৬ সময়ে সহায়ক কমিটির সদস্য থাকার কথাও উল্লেখ রয়েছে।
এ ছাড়া ২৬ সেপ্টেম্বর বেসিস কার্যালয়ে Bitopia Group নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে Support Committee Member এবং Trust-IT (BD) Ltd.-এর চেয়ারম্যান হিসেবে মোহাম্মদ জুয়েলের বক্তব্য দেওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে।
এসব তথ্য থেকে অন্তত এতটুকু স্পষ্ট যে বেসিসের বিভিন্ন কার্যক্রম ও কমিটির সঙ্গে জুয়েলের সম্পৃক্ততা নতুন কোনো বিষয় নয়।
আগের সহায়ক কমিটিও প্রশ্নের বাইরে ছিল না
বেসিসের বর্তমান সংকট বুঝতে আগের সহায়ক কাঠামোর ঘটনাপ্রবাহও গুরুত্বপূর্ণ।
BASIS-এর previous committee-সংক্রান্ত নথি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের Associate Committee-এর চেয়ারম্যান ছিলেন রাফেল কবির।
ওই কমিটিতে সাইদ মামনুন কাদের, মো. মিজানুর রহমান, রইসুল কবির, আব্দুল্লাহ ইবনে নূরুল ইসলাম, রওশন কামাল জেমস, এ এইচ এম রকমুনুর জামান রনিসহ আরও কয়েকজন ছিলেন।
পরবর্তীতে সেই সহায়ক কাঠামোও স্থায়ী হয়নি বলে প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায়।
ফলে বর্তমান প্রশ্নটি শুধু একটি কমিটি নিয়ে নয়। গত কয়েক দফায় সহায়ক কমিটি গঠন, কমিটির কার্যক্রম নিয়ে বিরোধ, পদত্যাগ বা স্থগিতাদেশ এবং নির্বাচনী তফসিল পরিবর্তনের ধারাবাহিকতাই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তাহলে বারবার কেন থমকে যাচ্ছে বেসিস নির্বাচন?
গত কয়েক মাসের ঘটনাগুলো পাশাপাশি রাখলে কয়েকটি বিষয় সামনে আসে—ভোটার তালিকা নিয়ে বিরোধ, বৈধ সদস্য অন্তর্ভুক্তি নিয়ে প্রশ্ন, প্রশাসনিক জটিলতা এবং সহায়ক কমিটির গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে মতবিরোধ।
প্রথম নির্বাচনী উদ্যোগ সফল হয়নি।
পরবর্তীতে ২৬ সেপ্টেম্বর নির্বাচন সামনে রেখে নতুন করে প্রক্রিয়া এগোয়। প্রাথমিক প্রার্থী তালিকা প্রকাশিত হয়, যাচাই-বাছাই শেষে বৈধ প্রার্থীদের তালিকাও প্রকাশ করা হয়।
কিন্তু ৩ সেপ্টেম্বর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় তফসিল বাতিল করে ভোটার তালিকা পুনরায় যাচাইয়ের নির্দেশ দেয়।
এরপর ভোটার তালিকা যাচাইয়ের জন্য সহায়ক কমিটি গঠন করা হয়।
সেই কমিটিও ২৮ সেপ্টেম্বর স্থগিত হয়ে যায়।
ফলে পুরো ঘটনাপ্রবাহ অনেকটা একই জায়গায় ফিরে এসেছে—
নির্বাচনের প্রস্তুতি, ভোটার তালিকা নিয়ে আপত্তি, তফসিল বাতিল, সহায়ক কমিটি গঠন, কমিটি নিয়ে বিরোধ এবং শেষ পর্যন্ত কমিটির কার্যক্রম স্থগিত।
এই ধারাবাহিকতার কারণে বেসিসের সাধারণ সদস্যদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে—শেষ পর্যন্ত নির্বাচনটি কবে হবে এবং কোন প্রক্রিয়ায় হবে?
‘আওয়ামী লীগ’ ট্যাগ কি নির্বাচনী বিরোধের অংশ?
এই প্রশ্নের উত্তর এখনো নিশ্চিত নয়।
তবে ঘটনাপ্রবাহের সময় বিবেচনায় নিলে বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
একদিকে বেসিসের নির্বাচন, ভোটার তালিকা ও সহায়ক কমিটি নিয়ে তীব্র বিরোধ চলছে; অন্যদিকে একই সময় বেসিসের কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত একজন প্রার্থীকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজনৈতিকভাবে চিহ্নিত করার প্রচারণা শুরু হয়েছে।
এর মধ্যে ব্যবহৃত একটি ছবির questioned version-এ রাজনৈতিক গ্রাফিক পরবর্তীতে যুক্ত হওয়ার প্রযুক্তিগত তথ্যও ফরেনসিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
কিন্তু এখানেই দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার জায়গা হলো—এই দুই ঘটনাকে এক করে সরাসরি ‘নির্বাচন থেকে সরিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র’ বলে সিদ্ধান্ত না দেওয়া।
বরং প্রশ্নটি তদন্তের জায়গায় রাখা দরকার।
কে ছবিটি তৈরি করেছে?
কে প্রথম এটি প্রচার করেছে?
কেন সেই সময়ে ছবিটি ছড়ানো হলো?
এর সঙ্গে বেসিস নির্বাচন বা কোনো প্রার্থীর নির্বাচনী অবস্থানের কোনো সম্পর্ক ছিল কি না?
এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেলে তখনই প্রকৃত চিত্র সামনে আসতে পারে।
অভিযুক্তদের বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবিটি ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ যাদের বিরুদ্ধে উঠেছে, তাদের বক্তব্যও নেওয়া প্রয়োজন।
সাংবাদিক ইলিয়াস, রূপম রাজ্জাক কিংবা অন্য কোনো অ্যাকাউন্টের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তাদের বক্তব্য ছাড়া পুরো ঘটনাকে একতরফাভাবে উপস্থাপন করা সাংবাদিকতার দৃষ্টিতে সঠিক হবে না।
তারা ছবিটি কোথা থেকে পেয়েছেন, ছবিটির সত্যতা সম্পর্কে তারা কী জানতেন, নিজেরা কোনো সম্পাদনা করেছেন কি না এবং কোন উদ্দেশ্যে পোস্ট করেছেন—এসব প্রশ্নের উত্তর তাদের কাছ থেকেই জানা প্রয়োজন।
তারা যদি কোনো নথি, মূল ছবি বা ভিন্ন ব্যাখ্যা দেন, সেটিও প্রতিবেদনে যথাযথভাবে তুলে ধরার সুযোগ থাকা উচিত।
ব্যক্তিকে ঘিরে বিতর্ক নয়, এখন প্রয়োজন বেসিসের নির্বাচন
বেসিসের নির্বাচন নিয়ে যত বিতর্কই থাকুক, শেষ পর্যন্ত বিষয়টি একজন জুয়েল বা কোনো একজন প্রার্থীকে ঘিরে আটকে থাকার কথা নয়।
দেশের প্রযুক্তি খাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য সংগঠনের নেতৃত্ব নির্ধারণের জন্য প্রয়োজন একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনী প্রক্রিয়া।
প্রথমেই প্রয়োজন স্বচ্ছ ও নির্ভুল ভোটার তালিকা।
প্রয়োজন সব যোগ্য সদস্যকে সমানভাবে ভোটাধিকার নিশ্চিত করা।
প্রয়োজন প্রতিটি প্রার্থীকে সমান সুযোগ দিয়ে নির্বাচনী পরিবেশ তৈরি করা।
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে সদস্যদের ভোটে নেতৃত্ব নির্বাচন করা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট, রাজনৈতিক ট্যাগ, ব্যক্তিগত আক্রমণ কিংবা কোনো পক্ষের প্রচারণা দিয়ে বেসিসের নেতৃত্ব নির্ধারিত হওয়া উচিত নয়।
শেষ পর্যন্ত উত্তর দিতে হবে তিনটি প্রশ্নের
বেসিসের বর্তমান পরিস্থিতিতে এখন তিনটি প্রশ্নের উত্তর সবচেয়ে জরুরি।
প্রথমত, একটি নির্ভুল ও গ্রহণযোগ্য ভোটার তালিকা কবে চূড়ান্ত হবে?
দ্বিতীয়ত, নির্বাচন পরিচালনার জন্য কোন কাঠামো ও প্রক্রিয়া গ্রহণ করা হবে?
তৃতীয়ত, রাজনৈতিক পরিচয় বা ব্যক্তিগত আক্রমণ থেকে মুক্ত রেখে সব প্রার্থীকে সমান সুযোগ দিয়ে নির্বাচন আয়োজন করা হবে কীভাবে?
আর জুয়েলকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারণার ক্ষেত্রে আরও একটি প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন—প্রশ্নবিদ্ধ ছবিটি কে তৈরি বা সম্পাদনা করেছে এবং কী উদ্দেশ্যে সেটি প্রচার করা হয়েছিল?
ফরেনসিক রিপোর্ট যদি সম্পাদনার আলামত দেখিয়ে থাকে, তাহলে পরবর্তী ধাপে সেই সম্পাদনার উৎস ও প্রচারের ধারাবাহিকতা অনুসন্ধান করাই হবে স্বাভাবিক তদন্তের বিষয়।
তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কাউকে অপরাধী বা ষড়যন্ত্রের মূল হোতা হিসেবে চিহ্নিত করা উচিত নয়।
বেসিসের এই দীর্ঘ অনিশ্চয়তার অবসান ঘটুক, একটি স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য ভোটার তালিকা তৈরি হোক, সব প্রার্থী সমান সুযোগ পাক এবং শেষ পর্যন্ত সদস্যদের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত নেতৃত্ব বেসিসের দায়িত্ব গ্রহণ করুক—এটাই এখন প্রযুক্তি খাতের সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা।
একই সঙ্গে জুয়েলকে ঘিরে যে রাজনৈতিক ট্যাগিং ও প্রশ্নবিদ্ধ ছবির বিতর্ক তৈরি হয়েছে, সেটির প্রকৃত উৎসও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সামনে আসুক। প্রমাণ যার পক্ষে থাকবে, সত্য শেষ পর্যন্ত তার পক্ষেই কথা বলবে।