ডিজিটাল জালিয়াচক্রের মূলহোতা বিপ্লব ধরাছোঁয়ার বাইরে: কোটি টাকার সাম্রাজ্য ও অন্তরালের অজানা কাহিনী
স্টাফ রিপোর্টার, যশোর
যশোরে বিভিন্ন দেশের নকল ড্রাইভিং লাইসেন্স, স্মার্টকার্ড ও অনলাইনে জাল নথি তৈরি চক্রের চার সদস্য গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে গেলেও এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছেন এই প্রতারক চক্রের মূলহোতা মো. খালিদ হাসান বিপ্লব। র্যাবের হাতে তাঁর সহযোগীরা গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকেই তিনি আত্মগোপনে রয়েছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, যশোরের শার্শা উপজেলার লক্ষণপুর গ্রামের বাসিন্দা খালিদ হাসান বিপ্লবের শুরুটা ছিল খুবই সাধারণ। ২০১৪ সালে যশোর শহরের কারবালা মোড়ে একটি ছোট স্টেশনারি দোকান দিয়ে তাঁর ব্যবসা জীবন শুরু হয়। তবে মাত্র ছয় মাসের মাথায় ব্যবসায় লোকসান ও মন্দার কারণে তিনি দোকান গুটিয়ে উধাও হয়ে যান।
পটপরিবর্তন ও অপরাধ সাম্রাজ্যে প্রবেশ
দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকার পর, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগে বিপ্লব পুনরায় যশোরে ফিরে আসেন। এবার তিনি ই-কমার্স ব্যবসার আড়ালে সাইবার অপরাধের এক বিষাক্ত জাল বিস্তার করতে শুরু করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর ভাগ্যের চাকা অঅলৌকিকভাবে ঘুরে যায়। ২০২৬ সালের শুরুর দিকেই তিনি প্রায় কোটি টাকা ব্যয়ে যশোর শহরের আরএন রোড সংলগ্ন অম্বিকা বসু লেন এলাকায় একটি বিলাসবহুল বাড়ি কেনেন এবং দামি গাড়ি হাঁকিয়ে বিলাসী জীবনযাপন শুরু করেন।
এলাকায় নিজের অপরাধ ঢাকতে তিনি ‘ট্রাস্ট অটোমোবাইল’ নামের একটি লুব্রিকেন্ট ব্যবসার ট্রেড লাইসেন্স গ্রহণ করেন। কিন্তু এই বৈধ ব্যবসার আড়ালেই চলতো আন্তর্জাতিক সাইবার চক্রের সাথে তথ্য কেনাবেচা ও জাল নথি তৈরির রমরমা কারবার।
কীভাবে চলতো ডিজিটাল জালিয়াতি?
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, এই চক্রের মূল লক্ষ্য ছিল মূলত বিভিন্ন দেশের প্রবাসী ও সহজ-সরল মানুষ।
ডেটা হ্যাক ও ভুয়া তথ্য: প্রবাসী ও সাধারণ নাগরিকদের ড্রাইভিং লাইসেন্স, পরিচয়পত্র এবং অন্যান্য সংবেদনশীল তথ্য হ্যাক করে আন্তর্জাতিক ডার্কওয়েব বা জালিয়াতি চক্র থেকে অবৈধভাবে সংগ্রহ করা হতো।
সফটওয়্যার ও ফটোশপের কারসাজি: বিশেষ সফটওয়্যারের মাধ্যমে বাংলাদেশি প্রবাসীদের আসল নথির আদলে হুবহু জাল নথি তৈরি করা হতো। পরিচয় গোপন রাখার শর্তে চক্রটি একটি বিদেশি সাইট থেকে অনলাইনে ভুয়া নথির অর্ডার নিত। পরবর্তীতে ফটোশপের মাধ্যমে প্রবাসগামীদের ছবি ও তথ্য বসিয়ে চড়া দামে বিক্রি করা হতো।
অবৈধ ক্রিপ্টো লেনদেন: র্যাবের অভিযানে বিপ্লবের ব্যবহৃত চারটি ডিজিটাল ব্যাংক কার্ডে প্রায় ৫৭ হাজার ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৭০ লাখ টাকা) সঞ্চিত থাকার তথ্য মেলে, যা তিনি পালিয়ে যাওয়ার সময় কৌশলে সটকে পড়েন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান ও গ্রেপ্তার
গত ২৭ সেপ্টেম্বর দুপুরে শহরের রেলবাজার এলাকার একটি ভাড়া বাড়িতে অভিযান চালায় র্যাব-৬ যশোর ক্যাম্পের একটি আভিযানিক দল। অভিযানকালে গ্রেপ্তার করা হয় জালিয়াতি চক্রের ৪ সদস্যকে:
১. আল মুস্তাকিম রিয়াদ (২৪) — বাড়ি: ঝিনাইদহ সদরের বোথিকারা গ্রামে।
২. রাসেল হোসেন (২২) — বাড়ি: যশোরের বিকসাগাছা উপজেলার কলাপাগাছি গ্রামে।
৩. ফাহিম সাকিক (২০) — বাড়ি: ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার বাতানগাছি গ্রামে।
৪. সিয়াম আলী (২১) — বাড়ি: একই উপজেলার গলিপুর গ্রামে।
অভিযানস্থল থেকে প্রচুর পরিমাণে বিপুল পরিমাণ জাল ড্রাইভিং লাইসেন্স, ভুয়া ভোটার আইডি কার্ড, অনলাইন জালিয়াতিতে ব্যবহৃত অত্যাধুনিক কম্পিউটার সেট ও সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আদালতের মাধ্যমে আসামিদের জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে।
চক্রের পুনর্গঠন ও মূলহোতার খোঁজ
অভিযানের দিন র্যাবের চোখ ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন মূলহোতা বিপ্লব। জানা গেছে, তাঁর সঙ্গে তাঁর বাবা মো. জাহাঙ্গীর আলমও জালিয়াতি সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত। সম্প্রতি প্রাথমিক বিপর্যয় কাটিয়ে উঠে বিপ্লব ও তাঁর বাবা আবারও সিন্ডিকেটটি সক্রিয় করার জোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
এদিকে, চক্রের ফাঁদে পড়ে বিপাকে পড়েছেন বিপ্লবের ঘনিষ্ঠ সহযোগী দীপ্ত ও তাঁর পরিবার। স্থানীয়দের দাবি, মূল অপরাধীরা ধরা না পড়ায় এখনও সাধারণ প্রবাসগামী মানুষ জালিয়াতির ঝুঁকিতে রয়েছেন।
র্যাবের বক্তব্য:
এই বিষয়ে জানতে চাইলে এসআইআরবি যশোর ক্যাম্পের কোম্পানি কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কমান্ডার নাজিম উল হক জানান—
“পলাতক বিপ্লবসহ জালিয়াতি চক্রের অন্যান্য সহযোগীদের অবস্থান চিহ্নিত করার কাজ দ্রুত গতিতে চলছে। এই আন্তর্জাতিক ডিজিটাল অপরাধ চক্রের মূলহোতাকে দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হবে।”
(প্রতিবেদনটির সকল তথ্য স্থানীয় পুলিশ নথি, র্যাবের জবানবন্দি ও অনুসন্ধানী সূত্রের ওপর ভিত্তি করে রচিত)