ঢাকা-৭ আসনে ধানের শীষকে ‘ঢাল’ বানিয়ে প্রবাসীর কোটি টাকা সাবাড়: প্রার্থী আব্দুল হামিদের সরলতার সুযোগে অপরাধের স্বর্গরাজ্য গড়ছেন সাহেদ!
মো. লুৎফুর রহমান রাকিব, আন্তর্জাতিক প্রতিনিধি | ১৪ জানুয়ারি ২০২৬
ঢাকা: ৫ আগস্টের ঐতিহাসিক পটপরিবর্তনের পর সারাদেশে যখন সংস্কার ও ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম চলছে, তখন ঢাকা-৭ (লালবাগ-বংশাল) আসনে এক ভয়ংকর ‘রাজনৈতিক পরজীবী’র উত্থান ঘটেছে। নাম তার সাহেদ আলী। ৫ আগস্টের আগ পর্যন্ত যিনি ছিলেন আওয়ামী লীগের কট্টর ঘরানার লোক ও প্রভাবশালী ক্যাডার, তিনি এখন রাতারাতি ভোল পাল্টে গায়ে মাখলেছেন ‘ধানের শীষের’ পবিত্র রং। ঢাকা-৭ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী, পরিচ্ছন্ন ও সজ্জন রাজনীতিক হিসেবে পরিচিত জনাব আব্দুল হামিদকে ‘বড় ভাই’ ও ‘ঢাল’ হিসেবে ব্যবহার করে সাহেদ আলী এখন এলাকায় এক মূর্তমান আতঙ্কে পরিণত হয়েছেন। তার সবশেষ শিকার হয়েছেন আপন শ্যালক, এক রেমিট্যান্স যোদ্ধা; যার সারাজীবনের উপার্জিত প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ টাকা আত্মসাৎ করে এখন তাকেই এলাকা ছাড়া করার হুমকি দিচ্ছেন এই ‘নয়া নেতা’।

মরুভূমির তপ্ত রোদে ঘাম ঝরানো টাকায় আপনজনের থাবা
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সৌদি আরব প্রবাসী সালাম খান (৩৩) দীর্ঘ ১০ বছর প্রবাসে হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে উপার্জিত টাকা মা-বাবার নিরাপদ ভবিষ্যতের জন্য দেশে পাঠিয়েছিলেন। পারিবারিক বিশ্বাসের সর্বোচ্চ মর্যাদা দিয়ে তিনি এই বিশাল অংকের টাকা (৯১ লাখ টাকা ব্যাংকে এবং বাকি টাকা নগদ ও বিকাশ যোগে) তার মেজো বোন রেহানা আক্তার ও ভগ্নিপতি সাহেদ আলীর কাছে গচ্ছিত রাখেন। কিন্তু সালাম খান দেশে ফিরে নিজের কষ্টের টাকা ফেরত চাইলে শুরু হয় সাহেদের আসল ‘ভয়ংকর’ রূপের প্রদর্শনী।
ভুক্তভোগী সালাম খান আর্তনাদ করে বলেন, “প্রখর রোদে পুড়ে প্রবাসে জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময় পার করে যে টাকা পাঠিয়েছি, তা আজ আমার আপন বোন ও দুলাভাই গিলে ফেলেছে। আমি টাকা চাইলে তারা আব্দুল হামিদের ক্যাডার বাহিনীর ভয় দেখায় এবং আমাকে ও আমার স্ত্রীকে প্রাণনাশের হুমকি দেয়। তারা বলছে টাকা তো দিবেই না, বরং আমার বাড়ি দখল করে নেবে।”

“টাকা চাইলে হামিদ সাহেব এর সাথে কথা বলো” – সাহেদের দাপট
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, অভিযুক্ত সাহেদ আলী নিজেকে ঢাকা-৭ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী জনাব আব্দুল হামিদের ‘অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ’ এবং ‘নির্বাচনী সিপাহসালার’ পরিচয় দিয়ে এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন। ভুক্তভোগী টাকা ফেরত চাইলে সাহেদ আলী ঔদ্ধত্য দেখিয়ে বলেন, “টাকা পয়সা নিয়ে যা বলার আব্দুল হামিদের সাথে কথা বলো।” একজন চিহ্নিত প্রতারক ও আওয়ামী ঘরানার মানুষ কিভাবে ধানের শীষের প্রার্থীকে নিজের ব্যক্তিগত পাওনা-দেনার ‘সুরক্ষাকবচ’ হিসেবে ব্যবহার করার সাহস পায়, তা নিয়ে খোদ বিএনপির ত্যাগী নেতা-কর্মীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আব্দুল হামিদের মতো একজন পরিচ্ছন্ন ও জনপ্রিয় নেতাকে বিতর্কিত করার জন্যই সাহেদ আলী তার নাম যত্রতত্র ব্যবহার করছে।
সিসিটিভি ফুটেজে হামলার প্রমাণ: প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
গত ২৬ জুন ২০২৫ তারিখ রাত আনুমানিক ১২টার দিকে সাহেদ ও তার ক্যাডার বাহিনী সালাম খানের বাসার নিচে এসে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে এবং ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে। এই পুরো ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষিত থাকলেও সাহেদের ‘রাজনৈতিক খুঁটির জোর’ এর কারণে পুলিশ তাকে ধরছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। বংশাল থানায় দণ্ডবিধির ৪০৬/৪২০/৫০৬ ধারায় মামলা (মামলা নং- সংরক্ষিত) রুজু হলেও সাহেদ প্রকাশ্যে প্রার্থীর আশেপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছেন এবং প্রশাসনকে ভুল তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করছেন।
আব্দুল হামিদের ভাবমূর্তি বনাম অনুপ্রবেশকারী সাহেদ
ঢাকা-৭ আসনের সাধারণ ভোটাররা বলছেন, জনাব আব্দুল হামিদ একজন আদর্শিক ও জনহিতৈষী নেতা। কিন্তু সাহেদ আলীর মতো ‘অনুপ্রবেশকারী’ ও ‘সুবিধাবাদী’রা তার সরলতা ও উদারতার সুযোগ নিয়ে তার দীর্ঘদিনের অর্জিত সম্মানকে ভুলুণ্ঠিত করছে। ৫ আগস্টের পর যারা রাতারাতি বিএনপি সেজেছেন, তারা আসলে দলের বন্ধু নয় বরং চরম শত্রু। আব্দুল হামিদের উচিত এই ধরনের ‘বিষফোঁড়া’দের চিহ্নিত করে এখনই দল থেকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করা।
নির্বাচনের আগে জনমনে আতঙ্ক
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ দেশে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। জেএসএফ বাংলাদেশ সহ বিভিন্ন দল যখন জনগণকে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে, তখন ঢাকা-৭ আসনের মতো এলাকায় সাহেদ আলীর মতো ‘নয়া নেতাদের’ দাপট ও অস্ত্রের ঝনঝনানি সাধারণ ভোটারদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে। সচেতন মহলের মতে, যদি এখনই এই প্রতারক চক্রকে গ্রেপ্তার করা না হয়, তবে নির্বাচনের দিন সাধারণ ভোটারের উপস্থিতি কমে যেতে পারে।
ভুক্তভোগীর শেষ আকুতি
সালাম খান বলেন, “প্রশাসনের কাছে আমার একটাই দাবি—আমি যেন আমার কষ্টের টাকা ফেরত পাই। একজন প্রবাসী হিসেবে যদি নিজের দেশেই আমি নিরাপদ না থাকি, তবে আমাদের ত্যাগের কোনো মূল্য নেই। আমি সাহেদ আলী ও রেহানা আক্তারের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই যাতে আর কোনো প্রবাসী এমন বিশ্বাসঘাতকতার শিকার না হয়।”
সম্পাদকের নোট: ৫ আগস্টের পর থেকে দেশে যে সুস্থ ধারার রাজনীতি চর্চা শুরু হয়েছে, সেখানে সাহেদ আলীর মতো সুবিধাবাদীদের স্থান থাকা উচিত নয়। ধানের শীষের মতো একটি পবিত্র প্রতীককে কেউ যাতে নিজের অপরাধ ঢাকার ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে না পারে, সেজন্য প্রশাসনের পাশাপাশি বিএনপি হাইকমান্ডের সরাসরি হস্তক্ষেপ কাম্য।
অভিযুক্ত সাহেদ আলীর যে সমস্ত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত:
১. ফৌজদারি অপরাধের কঠোর সাজা (আইনি শাস্তি):
যেহেতু বংশাল থানায় মামলা হয়েছে, তাই দণ্ডবিধি (Penal Code) অনুযায়ী নিচের শাস্তিগুলো নিশ্চিত করা প্রয়োজন:
৭ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড (ধারা ৪২০): জালিয়াতি ও প্রতারণার মাধ্যমে প্রবাসীর ১ কোটি ২০ লাখ টাকা আত্মসাৎ করার অপরাধে তাকে সর্বোচ্চ ৭ বছরের জেল এবং বড় অঙ্কের অর্থদণ্ড দেওয়া উচিত।
৩ বছরের কারাদণ্ড (ধারা ৪০৬): আমানত হিসেবে রাখা টাকা আত্মসাৎ করে ‘বিশ্বাসভঙ্গ’ করার অপরাধে তাকে এই সাজা দেওয়া উচিত।
হুমকি ও হামলার সাজা (ধারা ৫০৬): প্রবাসীকে প্রাণনাশের হুমকি ও সিসিটিভি ফুটেজে প্রমাণিত হামলার চেষ্টার জন্য তাকে কঠোর কারাদণ্ড দেওয়া উচিত।
২. লুণ্ঠিত অর্থ উদ্ধার ও সম্পদ বাজেয়াপ্ত:
অর্থ ফেরত: প্রবাসীর কষ্টার্জিত ১ কোটি ২০ লাখ টাকা সাহেদ আলীর স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বিক্রি করে হলেও ভুক্তভোগী সালাম খানকে ফেরত দেওয়ার আদেশ দিতে হবে।
অবৈধ সম্পদের তদন্ত: ৫ আগস্টের আগে ও পরে সাহেদ আলী কতটুকু অবৈধ সম্পদ গড়েছেন, তার জন্য দুদক (ACC) কর্তৃক তদন্ত হওয়া উচিত এবং তা বাজেয়াপ্ত করা উচিত।
৩. রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক ব্যবস্থা:
স্থায়ী বহিষ্কার: বিএনপির প্রার্থী জনাব আব্দুল হামিদের নাম ভাঙিয়ে এবং ধানের শীষকে ঢাল বানিয়ে অপরাধ করায় তাকে দল থেকে চিরতরে বহিষ্কার করা উচিত।
অনুপ্রবেশকারী হিসেবে চিহ্নিতকরণ: তাকে ‘রাজনৈতিক সুবিধাবাদী’ ও ‘অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে কালো তালিকাভুক্ত করা উচিত যাতে ভবিষ্যতে কোনো দল তাকে আশ্রয় না দেয়।
৪. নির্বাচনী আইনের অধীনে ব্যবস্থা:
নির্বাচনী কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা: আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে তাকে নির্বাচনী এলাকা থেকে দূরে রাখা এবং কোনো প্রকার প্রচারণা বা পোলিং এজেন্টের দায়িত্ব পালনে অযোগ্য ঘোষণা করা উচিত।
৫. প্রশাসনিক দৃষ্টান্ত:
দ্রুত গ্রেপ্তার ও রিমান্ড: প্রার্থীর নাম ব্যবহার করে প্রশাসনকে বিভ্রান্ত করার অপরাধে তাকে অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নেওয়া উচিত, যাতে তার সাথে আর কে কে জড়িত তা বেরিয়ে আসে।
“গণদাবি: প্রবাসীর চোখের জল বৃথা যেতে পারে না। যে সাহেদ আলী প্রার্থীর সরলতাকে পুঁজি করে পবিত্র ধানের শীষের অবমাননা করছে এবং একজন রেমিট্যান্স যোদ্ধাকে সর্বস্বান্ত করেছে, তাকে দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের সর্বোচ্চ সাজা নিশ্চিত করতে হবে। এটি কেবল একটি টাকা উদ্ধারের লড়াই নয়, এটি রাজনৈতিক শুদ্ধি অভিযানেরও অংশ।”
এই তথ্য সম্পুর্ন ভুক্তভোগী সালাম খান দৈনক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ কে ফোন এ নিশ্চিত করেন।