হাসিনা আমলে গুমের সংখ্যা ৬ হাজার ছাড়াতে পারে: তদন্ত কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে ‘পৈশাচিক’ চিত্র
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা | ৫ জানুয়ারি, ২০২৬
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে বাংলাদেশে বলপূর্বক গুমের ঘটনাগুলো ছিল সুপরিকল্পিত এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। গত ৪ জানুয়ারি (রবিবার) প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে জমা দেওয়া ‘গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশন’-এর চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এই ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গুমের প্রকৃত সংখ্যা ৪ থেকে ৬ হাজার পর্যন্ত হতে পারে।
প্রতিবেদনের মূল তথ্যসমূহ: কমিশন তাদের তদন্তে গুমের ১,৯১৩টি অভিযোগ গ্রহণ করেছে, যার মধ্যে যাচাই-বাছাই শেষে ১,৫৬৯টি ঘটনাকে সুনির্দিষ্টভাবে ‘বলপূর্বক গুম’ হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৮৭টি ঘটনা ‘নিখোঁজ ও মৃত’ (Missing and Dead) ক্যাটাগরিতে পড়েছে। কমিশন জানিয়েছে, গুমের শিকার ব্যক্তিদের বড় একটি অংশ রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার।
রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা: কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, যারা এখনো নিখোঁজ রয়েছেন তাদের মধ্যে:
৬৮% বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী।
২২% জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মী।
বাকি ১০% অন্যান্য রাজনৈতিক দল বা সাধারণ নাগরিক। অন্যদিকে, গুম থেকে জীবিত ফিরে আসা ব্যক্তিদের ৭৫ শতাংশই জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী এবং ২২ শতাংশ বিএনপির।
সরাসরি নির্দেশদাতা ও জড়িত প্রতিষ্ঠান: তদন্ত প্রতিবেদনে গুমের মূল নির্দেশদাতা হিসেবে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেছে। গুমের কাজে র্যাব (RAB), ডিবি (DB), ডিজিএফআই (DGFI) এবং এনএসআই (NSI)-এর মতো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবহার করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই ভুক্তভোগীদের গোপনে ভারতে হস্তান্তরের (রেন্ডিশন) প্রমাণও পেয়েছে কমিশন।
লাশ গুমের বিভৎস স্থান: প্রতিবেদনে সবচেয়ে লোমহর্ষক তথ্য হলো লাশ গুম করার পদ্ধতি। কমিশন জানায়, বরিশালের বলেশ্বর নদী ছিল লাশ গুমের প্রধান কেন্দ্র। সেখানে শত শত মানুষকে হত্যা করে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া বুড়িগঙ্গা নদী এবং মুন্সিগঞ্জেও লাশ গুমের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ মিলেছে।
প্রধান উপদেষ্টার প্রতিক্রিয়া: প্রতিবেদন গ্রহণ করে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এই ঘটনাগুলোকে ‘পৈশাচিক’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, “গণতন্ত্রের লেবাস পরে মানুষের ওপর কতটা নৃশংস আচরণ করা যেতে পারে, এটি তারই প্রামাণ্য দলিল।” তিনি আয়নাঘরসহ বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের স্থানগুলো চিহ্নিত করে ম্যাপিং করার নির্দেশ দিয়েছেন।
বিচার প্রক্রিয়া: ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (ICT) শেখ হাসিনাসহ ৩০ জনের বিরুদ্ধে গুম ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগে চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে। জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই তদন্ত প্রক্রিয়াকে স্বাগত জানিয়ে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে।