মোঃ শাহজাহান বাশার | স্টাফ রিপোর্টার
১৩ জুলাই ২০২৫ | ঢাকা
যখন একজন মানুষকে প্রকাশ্য রাস্তায় পিটিয়ে হত্যা করা হয়, আর শত শত মানুষ দাঁড়িয়ে থেকে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে—প্রতিবাদ তো দূরের কথা, সহানুভূতির একফোঁটা চিহ্নও দেখায় না—তখন প্রশ্ন জাগে: আমরা কি এখনো মানুষ আছি? না কি ধীরে ধীরে হিংস্র জানোয়ারে পরিণত হচ্ছি?
গণপিটুনি, বা মব ভায়োলেন্স, আজ আমাদের সমাজে এমন এক ভয়াবহ ব্যাধিতে রূপ নিয়েছে, যা শুধু ব্যক্তি নিরাপত্তাকেই হুমকির মুখে ফেলছে না, বরং আমাদের সম্মিলিত বিবেক ও মানবতাবোধকেই চ্যালেঞ্জ করছে। সামান্য সন্দেহ, গুজব, ধর্মীয় উত্তেজনা বা রাজনৈতিক বিরোধ—সবই আজ প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে।
দেশজুড়ে গণপিটুনির ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। প্রায় প্রতি মাসেই কোথাও না কোথাও এমন ঘটনার খবর আসছে, কিন্তু বিচার হয় খুব কম ক্ষেত্রেই। অনেক সময় পুলিশের উপস্থিতিতেও এই বর্বরতা ঘটে যায়। প্রশাসন একদিকে উদাসীন, আরেকদিকে স্থানীয় জনগণ অনেক সময় একে ‘ন্যায্য প্রতিক্রিয়া’ বলে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করে। এটি যেন এক বিভৎস এবং ভয়ঙ্কর নতুন স্বাভাবিকতা।
এর পেছনে প্রধান কারণ বিচারহীনতার সংস্কৃতি। যখন অপরাধীর শাস্তি হয় না, তখন মানুষ আইনের ওপর আস্থা হারিয়ে নিজের হাতে বিচার নিতে চায়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া গুজব আরও আগুনে ঘি ঢালে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, ন্যায়বিচারের অভাব এবং শাসনব্যবস্থার দুর্বলতা মিলে মানুষকে অনিয়ন্ত্রিত ও হিংস্র করে তুলছে।
এই সহিংসতার শিকার হচ্ছেন—
কখনো গুজব ছড়ায়—‘ছেলেধরা’, কখনো ধর্ম অবমাননার অভিযোগ, কখনো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শায়েস্তা করার অজুহাতে প্রতিপক্ষকে টার্গেট করা হয়। বাস্তবতা হলো—আজ কেউই নিরাপদ নন। আজকের নীরব দর্শক কাল হয়তো স্বয়ং শিকার হবেন।
১. সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি:
স্কুল, কলেজ, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, পাড়া-মহল্লায় সচেতনতামূলক সভা ও আলোচনা সভা আয়োজন করতে হবে।
২. গুজব প্রতিরোধে প্রযুক্তি ব্যবহার:
সোশ্যাল মিডিয়ায় গুজব ছড়ানো রোধে নজরদারি বাড়াতে হবে, গঠন করতে হবে দ্রুত রেসপন্স টিম।
৩. আইনের শাসন নিশ্চিতকরণ:
গণপিটুনিতে জড়িতদের চিহ্নিত করে দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।
৪. প্রশাসনিক জবাবদিহি:
যে এলাকায় এ ধরনের ঘটনা ঘটবে, সেই এলাকার দায়িত্বরত পুলিশ ও কর্মকর্তাদেরও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
আজ যদি আমরা চুপ থাকি, কাল আমাদের সন্তানরাও এই নিষ্ঠুরতার মুখোমুখি হতে পারে। অন্যায় দেখেও চুপ থাকাটা অন্যায়ের সঙ্গে মদদ দেওয়ার নামান্তর।
আসুন, নিজেদের প্রশ্ন করি—কীভাবে একজন মানুষ আরেকজন মানুষকে এমন পশুর মতো পিটিয়ে মারতে পারে? এই প্রশ্নে যেন আমাদের হৃদয় কেঁপে ওঠে।
আসুন, একসঙ্গে বলি—
“মব ভায়োলেন্স বন্ধ করুন!”
“মানবতা বাঁচান!”