তারিখ: ০৬ অক্টোবর ২০২৫, সোমবার
জনতার কণ্ঠস্বর ডেস্ক
দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ
বিআইডব্লিউটিএ’র নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল মতিনের অবৈধ সম্পদের পাহাড়
সোহেল রানা : অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) বিশাল প্রকল্পে ভয়াবহ অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র উন্মোচিত হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) নিশ্চিত করেছে, সংস্থার ড্রেজার ও জলযান সংগ্রহ এবং অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্পের বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করে নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল মতিন গড়ে তুলেছেন অবৈধ সম্পদের পাহাড়।
দুদকের অনুসন্ধান বলছে, প্রকল্পটির আওতায় ৩৫টি ড্রেজার, ১৬১টি জলযান, তিনটি ড্রেজার বেইজ ও নারায়ণগঞ্জে একটি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। মূল ব্যয় ছিল ৪ হাজার ৪৮৯ কোটি ৩৪ লাখ টাকা, যা সংশোধিত হয়ে দাঁড়ায় ৪ হাজার ৫১৫ কোটি ৫২ লাখ টাকা। ২০১৮ সালে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের মেয়াদ কয়েক দফা বাড়িয়ে ২০২৭ সাল পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।
কিন্তু প্রকল্পের তহবিলের একটি বড় অংশ গায়েব হয়েছে বিভিন্ন কাগজপত্র ও ভুয়া কাজের রিপোর্টের মাধ্যমে। অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল মতিন রাজধানীর রামপুরার মৌলভীরটেক এলাকায় প্রায় ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে পাঁচতলা বিলাসবহুল বাড়ি নির্মাণ করেছেন। এছাড়া খিলগাঁও রিয়াজবাগে একটি ফ্ল্যাট ও টাঙ্গাইলের নিজ গ্রামে রয়েছে কোটি কোটি টাকার সম্পদ, যা তার বৈধ আয়ের সঙ্গে কোনভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
দুদক সূত্র জানায়, মতিন, তার স্ত্রী শাহানা আক্তার জলি ও তাদের দুই সন্তানের নামে থাকা স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ যাচাইয়ে দেশের বিভিন্ন ব্যাংক, বীমা কোম্পানি, রাজউক, এনবিআর, ভূমি অফিস ও সিটি করপোরেশনে চিঠি পাঠানো হয়েছে। প্রাথমিক অনুসন্ধানে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় দুদক সহকারী পরিচালক রাকিবুল হায়াতকে অনুসন্ধান কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া অভিযোগ উঠেছে, মতিনের দুর্নীতির পেছনে শক্তিশালী পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছেন বিআইডব্লিউটিএ’র এক প্রধান প্রকৌশলী ও একজন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী। তাদের ছত্রছায়ায় প্রকল্পের ড্রেজিং কাজের বেশিরভাগই কাগজে-কলমে শেষ দেখানো হলেও বাস্তবে মাঠপর্যায়ে অনেক জায়গায় কাজ হয়নি। এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত আছে সংস্থাটির তালিকাভুক্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান “জে এন্টারপ্রাইজ” এবং এর মালিক আবু জাফর, যিনি কোটি কোটি টাকার অবৈধ লেনদেনে সহযোগিতা করেছেন বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

এছাড়া রাজধানীর রামপুরায় “ডিএলআই বাংলাদেশ লিমিটেড” নামে একটি আবাসন কোম্পানি খুলে বিআইডব্লিউটিএ’র প্রায় ২০ জন প্রকৌশলী শতকোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন। দুদকের মতে, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের এ চক্রের সদস্যদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
দুদকের এক সিনিয়র কর্মকর্তা দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ-কে জানান, “প্রাথমিক অনুসন্ধানে মতিনের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে। প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ও দুর্নীতি দমন আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়।”
অন্যদিকে, নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল মতিন চলতি মাসে অবসরে যাচ্ছেন বলে জানা গেছে। তবে দুদক নিশ্চিত করেছে, অবসর তার বিরুদ্ধে তদন্ত বা সম্ভাব্য মামলার কার্যক্রম থামাবে না।
এ বিষয়ে মতিনের প্রতিক্রিয়া জানতে তার ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি সাড়া দেননি, এমনকি মন্তব্য দিতেও অনিচ্ছুক ছিলেন তার ঘনিষ্ঠজনরা।
দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ-এর অনুসন্ধান বলছে, বিআইডব্লিউটিএ’র এ দুর্নীতি কেবল একটি ব্যক্তির নয়—বরং এটি দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা একটি প্রশাসনিক চক্রের প্রতিচ্ছবি, যেখানে ক্ষমতার আড়ালে লুটপাট হয়েছে রাষ্ট্রীয় সম্পদ।
যদি দুদক তদন্তে প্রমাণ পায়, তবে রাষ্ট্রের অর্থ আত্মসাৎকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে—এমনটাই আশা দেশের সৎ নাগরিকদের।
—
বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ ডেস্ক
www.bangladeshprothomsangbad.com