বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট | ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
নতুন সরকার গঠনের পর প্রশাসনে শুরু হয়েছে ব্যাপক রদবদল। জনপ্রশাসনের শীর্ষ দুই কর্মকর্তা—মন্ত্রিপরিষদ সচিব শেখ আবদুর রশীদ ও প্রধান উপদেষ্টার মুখ্য সচিব এম সিরাজ উদ্দিন মিয়া—নিজ নিজ পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়ে পরিবর্তনের এই প্রক্রিয়া শুরু হয়। এরপর একে একে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পদে বদলি ও নতুন নিয়োগের সিদ্ধান্ত আসতে থাকে।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার নির্বাচনি ইশতেহারে ‘মেধাতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা’ প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রশাসনে চলমান পরিবর্তন সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন কি না, নাকি দলীয়করণের নতুন অধ্যায়—তা সময়ই বলে দেবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের প্রেক্ষাপট
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূস–এর নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রশাসনে বড় ধরনের রদবদল হয়। দায়িত্ব নেওয়ার পর সিনিয়র সচিব ও সচিব পদে ১৪ জন, গ্রেড-১ পদের একজন এবং অতিরিক্ত সচিব পদে ১৯ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। একই সময়ে ২৩ জন সিনিয়র সচিব ও সচিব, দুইজন গ্রেড-১ কর্মকর্তা এবং ৫১ জন অতিরিক্ত সচিবকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করা হয়। কয়েক দফায় ওএসডি ও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়।
নতুন সরকার এসব চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পুনর্বিবেচনার ইঙ্গিত দিয়েছে বলে জানা গেছে।
সেনাবাহিনীতে গুরুত্বপূর্ণ বদলি
রবিবার (২২ ফেব্রুয়ারি) সেনা সদর দপ্তর থেকে জারি করা আদেশে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী–এর কয়েকটি শীর্ষ পদে পরিবর্তন আনা হয়।
প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার (পিএসও) লেফটেন্যান্ট জেনারেল এস এম কামরুল হাসানকে রাষ্ট্রদূত হিসেবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বদলি করা হয়েছে।
নতুন পিএসও হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন মেজর জেনারেল মীর মুশফিকুর রহমান; তাকে লেফটেন্যান্ট জেনারেল পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে।
চিফ অব জেনারেল স্টাফ হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাইনুর রহমান।
১০ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি ও কক্সবাজার এরিয়া কমান্ডার মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ মিনহাজুল আলমকে লেফটেন্যান্ট জেনারেল পদে পদোন্নতি দিয়ে নতুন দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল গোলাম মহিউদ্দিন আহমেদ মাহিকে মেজর জেনারেল পদে পদোন্নতি দিয়ে ১০ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি ও কক্সবাজার এরিয়া কমান্ডার করা হয়েছে।
পুলিশ প্রশাসনে ধীরগতির রদবদল
নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই পুলিশ প্রশাসনের শীর্ষ পদ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলমের পদত্যাগের গুঞ্জন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, পুলিশ প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ে কিছু পরিবর্তন আসবে, তবে তা ধীরে ধীরে। তিনি বলেন, শীর্ষ পদে নিয়োগ সম্পূর্ণভাবে যোগ্যতার ভিত্তিতে দেওয়া হবে এবং কাউকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনা নেই।
ট্রাইব্যুনালে পরিবর্তন
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর হিসেবে নিয়োগ পাওয়া মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) দায়িত্ব হস্তান্তর করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আমিনুল ইসলামের কাছে। নির্বাচনের আগে জুলাই-আগস্টে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ২৪টি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ ট্রাইব্যুনালে জমা দেওয়া হয়েছিল, যার বিচারকাজ চলমান।
এদিকে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা পদেও পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে। সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল আসাদুজ্জামান বর্তমানে আইনমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
সচিবালয়ে বদলি
সোমবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিবকে সরিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে।
‘মেরিটোক্রেসি’ নাকি দলীয়করণ?
সাবেক সচিব আবু আলম শহীদ খান বলেন, মেধার দাবিতে যে আন্দোলনের মধ্য দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার এসেছিল, সেখানে প্রত্যাশিত প্রতিফলন দেখা যায়নি। নির্বাচিত সরকার ইশতেহারে মেধাতন্ত্রের কথা বলেছে—এখন দেখতে হবে বাস্তবে তার প্রতিফলন ঘটে কি না। তার মতে, নতুন সরকারকে সময় দেওয়া উচিত।
প্রশাসনে চলমান এই রদবদল শেষ পর্যন্ত কতদূর যাবে এবং তা সত্যিই মেধাভিত্তিক কাঠামো প্রতিষ্ঠা করতে পারবে কি না—সেটাই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।