দুর্নীতির বেড়াজালে আনোয়ারার উন্নয়ন
প্রকৌশলী জাহেদুল আলমের সিন্ডিকেট রাজত্ব: বিঘ্নিত হচ্ছে জনপদ ও সামাজিক শান্তি
নিজস্ব প্রতিবেদক | ২৮ জানুয়ারি ২০২৬
আনোয়ারা, চট্টগ্রাম: গ্রামীণ জনপদের উন্নয়ন মানেই সাধারণ মানুষের মুখে হাসি। কিন্তু চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলায় বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) চিত্রটি ঠিক উল্টো। উপজেলা প্রকৌশলী জাহেদুল আলমের বেপরোয়া দুর্নীতি এবং টেন্ডারবাজির কারণে উন্নয়ন কাজ এখন প্রশ্নবিদ্ধ। এই অনিয়মের ফলে বঞ্চিত সাধারণ ঠিকাদারদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে, যা যেকোনো সময় স্থানীয় সামাজিক শান্তি ও শৃঙ্খলা বিঘ্নিত করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
পকেটে যাচ্ছে ৫ কোটি টাকার উন্নয়ন বরাদ্দ
অভিযোগ উঠেছে, ৩৬টি প্যাকেজের উন্নয়ন কাজের মধ্যে মাত্র ২৩টি কাজ ইজিপি পদ্ধতিতে দেওয়া হয়েছে। বাকি ১৩টি প্যাকেজ কোনো প্রকার দরপত্র ছাড়াই নিজের পছন্দের ঠিকাদারদের মধ্যে বিলি করে দিয়েছেন প্রকৌশলী জাহেদুল আলম। প্রতিটি প্রকল্প থেকে ৫-১০ শতাংশ কমিশন আদায়ের মাধ্যমে তিনি সরকারি বরাদ্দের বড় একটি অংশ আত্মসাৎ করছেন বলে অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয়রা।
লটারি জালিয়াতি ও সিন্ডিকেট রাজত্ব
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ঠিকাদার জানিয়েছেন, প্রকৌশলীর কার্যালয়ে ইজিপি লটারির নামে রীতিমতো নাটক মঞ্চস্থ হয়। আগে থেকেই নির্ধারিত ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দিতে লটারির কার্ডে কারসাজি করা হয়। এছাড়া অফিসের ভেতর সারাক্ষণ প্রভাবশালী ঠিকাদারদের আড্ডা চলায় সাধারণ মানুষ ও সাধারণ ঠিকাদাররা সেখানে সেবা নিতে গিয়ে হেনস্তার শিকার হচ্ছেন।
লাইসেন্স নবায়নে বাড়তি অর্থ আদায়
নিয়ম অনুযায়ী ৪ হাজার ৫০০ টাকা ফি হলেও প্রতিটি ঠিকাদারি লাইসেন্স নবায়নে ১০ হাজার টাকা করে আদায় করছেন এই প্রকৌশলী। প্রায় শতাধিক ঠিকাদারের কাছ থেকে এভাবে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনায় পুরো এলাকায় অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
এলাকায় অসন্তোষ: নষ্ট হচ্ছে সামাজিক শান্তি
স্থানীয়দের মতে, ৫ আগস্টের পর দেশের পরিস্থিতির যে পরিবর্তন হয়েছে, তার সুফল আনোয়ারাবাসী পেতে চায়। কিন্তু প্রকৌশলীর এই লাগামহীন দুর্নীতি ও পক্ষপাতমূলক আচরণের কারণে বঞ্চিত ঠিকাদার ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছে। উন্নয়নের সুষম বণ্টন না হওয়ায় এবং নির্দিষ্ট কিছু অসাধু ব্যক্তিকে কাজ পাইয়ে দেওয়ায় এলাকায় দীর্ঘদিনের সাম্প্রদায়িক ও সামাজিক শান্তি নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
ঠিকাদার সুমন বলেন, “আমরা সবাই শান্তিতে ব্যবসা করতে চাই। কিন্তু প্রকৌশলী যেভাবে বৈষম্য তৈরি করছেন, তাতে এলাকার স্থিতিশীলতা নষ্ট হচ্ছে। সবাই সমান সুযোগ না পেলে ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটতে পারে।”
বদলির ইতিহাস ও প্রশাসনের মৌনতা
এর আগে কর্ণফুলী ও বাঁশখালী উপজেলাতেও একই ধরনের অনিয়মের অভিযোগে তাকে বদলি করা হয়েছিল। কিন্তু কোনো দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় তিনি নিজেকে আইনের ঊর্ধ্বে মনে করছেন। চট্টগ্রাম জেলা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল মতিন জানিয়েছেন, তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে স্থানীয়রা দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ চান।
এলাকাবাসীর দাবি: আনোয়ারার উন্নয়নের স্বচ্ছতা ফেরাতে এবং এলাকায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এই প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। অন্যথায়, সরকারি উন্নয়নের সুফল জনগণের দ্বারে পৌঁছানোর পরিবর্তে কেবল একটি সিন্ডিকেটের পকেটেই যাবে।