তিতাস গ্যাসে দুর্নীতির ভয়াল চিত্র! পিয়নের বিরুদ্ধে কোটি টাকার আত্মসাতের অভিযোগ, তদন্ত ও শাস্তির দাবি উঠেছে
স্টাফ রিপোর্টার মোঃ শাহজাহান বাশার
ঢাকা, মঙ্গলবার | ২৪ জুন ২০২৫
তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (TGTDC)-এ কর্মরত এক অফিস সহায়ক (পিয়ন) রবিউল ইসলামের বিরুদ্ধে সরকারি মালামাল আত্মসাৎ ও অপব্যবহারের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সরকারি সম্পদের এমন ‘দুর্ধর্ষ লোপাটের’ অভিযোগে সারাদেশের সচেতন মহলে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। এক ভুক্তভোগী নাগরিক মোঃ সিরাজুল ইমদাদ লিখিতভাবে মাননীয় উপদেষ্টার দপ্তরে অভিযোগ জমা দিলে বিষয়টি সম্প্রতি গণমাধ্যমের নজরে আসে।
১৮ বছর ধরে ছায়ার মতো দুর্নীতির বিস্তার, অভিযোগ অনুযায়ী, রবিউল ইসলাম দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে তিতাস গ্যাসের বিভিন্ন ইউনিটে পিয়ন পদে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। কিন্তু এই দীর্ঘ সময়ে তার কার্যক্রম সীমাবদ্ধ ছিল না কেবল নথি বহন কিংবা অফিস সহায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালনে। বরং অভিযোগ রয়েছে, তিনি গোপনে প্রতিষ্ঠানটির গ্যাসচালিত যানবাহনগুলোর জন্য বরাদ্দকৃত জ্বালানি তেল চুরি করে বিক্রির ভয়ঙ্কর সিন্ডিকেট চালিয়েছেন।
প্রতিমাসে গড়ে ১২০টি গাড়ির জন্য বরাদ্দ থাকত ৯০৪ লিটার করে ডিজেল। অর্থাৎ প্রতিমাসে ১২০x৯০৪ = ১,০৮,৪৮০ লিটার তেল সরবরাহ হতো। এর মধ্যে অভিযোগ অনুযায়ী তিনি গোপনে অন্তত ১২,০০০ লিটার তেল কালোবাজারে বিক্রি করে আসছিলেন, যার বাজারমূল্য প্রতি লিটার ৩৮ টাকা ধরলে মাসিক আত্মসাৎ হতো ৪৫ লাখ ৬০ হাজার টাকা! বার্ষিক হিসাবে যার পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৫ কোটি ৪৭ লাখ টাকা!
সরকারি যন্ত্রাংশ বিক্রিরও অভিযোগ-,তেলের পাশাপাশি রবিউলের বিরুদ্ধে আরও ভয়াবহ অভিযোগ হলো—অফিসের গ্যাস মিটার, ক্যাসেটসহ বিভিন্ন যন্ত্রাংশ চুরি করে বেসরকারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানে বিক্রির ঘটনা। অভিযোগে বলা হয়, প্রতিটি গ্যাস মিটার তিনি ১৫ হাজার টাকায় বিক্রি করতেন। শুধু তাই নয়, প্রকল্পের আওতায় আসা পুরনো মালামালগুলো ঠিকাদারের সহায়তায় ‘নষ্ট’ হিসেবে দেখিয়ে আত্মসাৎ করেছেন।
বিশেষ করে ২০২০ সালে পাইপলাইন ও মিটারিং সিস্টেম উন্নয়ন প্রকল্প চলাকালে তিনি বহু মূল্যবান যন্ত্রাংশ গায়েব করে দেন। অভিযোগে উল্লেখ আছে, এসব অপকর্মে রবিউলের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী বন্ধু ও সংশ্লিষ্ট বিভাগের লোকজন জড়িত।
দপ্তরে পিয়নের প্রভাব, রোস্টার নিয়ন্ত্রণ পর্যন্ত!অভিযোগকারীর মতে, রবিউল ইসলাম কেবল পিয়নের কাজেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। বরং বর্তমানে তিনি নিরাপত্তা প্রহরী ও অন্যান্য আউটসোর্স কর্মীদের রোস্টার নিজের ইচ্ছেমতো নিয়ন্ত্রণ করছেন। তার প্রভাব এতটাই প্রবল যে, অপারেশনাল দায়িত্ব পর্যন্ত অনেক সময় নিজে পালন করছেন, যা প্রতিষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও নিয়মের সম্পূর্ণ লঙ্ঘন।
তিনি নিয়মিতভাবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে পাশ কাটিয়ে ‘নিজস্ব সিন্ডিকেট’ পরিচালনা করছেন এবং প্রতিটি অনিয়ম আড়াল করতে পটু হয়ে উঠেছেন। অভিযোগকারীর দাবি, অফিসের অনেক কর্মচারী মুখ খুলতে ভয় পান রবিউলের ভয়ঙ্কর ‘যোগাযোগের জাল’ এবং উচ্চপর্যায়ের ‘পৃষ্ঠপোষকতা’ নিয়ে।
তদন্ত ও শাস্তির দাবিতে সরব সাধারণ নাগরিক
এই ঘটনায় অভিযোগকারী মোঃ সিরাজুল ইমদাদ বলেন,
“সরকারি প্রতিষ্ঠানে বসে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করা চরম দুর্নীতি। একজন পিয়ন পদে থেকে এত বড় দুঃসাহসিক লুটপাট পরিচালনা করা, সেটাই প্রমাণ করে ভিতরে ভিতরে কত বড় সিন্ডিকেট সক্রিয়। এদের বিরুদ্ধে দ্রুত তদন্ত করে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে এই ধরনের অপরাধ আরও ছড়িয়ে পড়বে।”
তিনি এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়, পেট্রোবাংলা ও অন্যান্য দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
এই প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসি-র দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলী রাজীব কুমার সাহাকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তার সাথে যোগাযোগ স্থাপন করা সম্ভব হয়নি।
অন্যদিকে অভিযুক্ত রবিউল ইসলামকে একাধিকবার ফোন করা হলে প্রথমে তিনি কল রিসিভ করে সাংবাদিক পরিচয় জানার পর বলেন, “আমি ব্যস্ত আছি, পরে কথা বলবো।” এর পর তিনি কল কেটে দেন এবং পরবর্তীতে ফোন ধরেননি। ফলে তার বক্তব্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি।
সরকারি প্রতিষ্ঠানে নিম্নপদস্থ কর্মচারীর হাতে কোটি কোটি টাকার সরকারি সম্পদ কীভাবে দীর্ঘদিন ধরে আত্মসাৎ হলো—তা রীতিমতো প্রশাসনিক ব্যর্থতা এবং ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার প্রতিফলন। অবিলম্বে একটি উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত গঠন করে দোষীদের শাস্তির আওতায় আনাই এখন সময়ের দাবি।