গাজীপুরে সাগর–রবিন বাহিনী নিয়ে তোলপাড়: দল থেকে বহিষ্কার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি
বিশেষ প্রতিনিধি | গাজীপুর
গাজীপুর মহানগরের জয়দেবপুর অঞ্চলে কথিত “সাগর–রবিন বাহিনী”কে ঘিরে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে এলাকায় চরম উদ্বেগ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা দাবি করছেন, দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী চক্র রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে।
অভিযোগে যাদের নাম এসেছে, তারা হলেন—মহানগর যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক পরিচয়ে পরিচিত মনিরুল ইসলাম সাগর এবং ২৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক পরিচয়ে পরিচিত একরামুজ্জামান রবিন। স্থানীয়দের একাংশের দাবি, তাদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলাসহ একাধিক গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
চাঁদাবাজির অভিযোগে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী
এলাকাবাসীর অভিযোগ, জয়দেবপুর ও আশপাশের এলাকায় কেউ নতুন বাড়ি নির্মাণ বা বাউন্ডারি দেয়াল তুলতে চাইলে তাকে নির্দিষ্ট অফিসে যোগাযোগ করতে বলা হয়। অভিযোগ রয়েছে, বড় অঙ্কের অর্থ ‘চাঁদা’ হিসেবে দাবি করা হয়। অর্থ প্রদান না করলে নির্মাণসামগ্রী পরিবহনে বাধা, শ্রমিকদের ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং বিভিন্নভাবে কাজ বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়।
স্থানীয় কয়েকজন ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন, দোকান ও বাসাবাড়ি প্রতি মাসে ‘নিরাপত্তা খরচ’ নামে টাকা আদায় করা হয়। কেউ দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে নানা ধরনের হয়রানির শিকার হতে হয়।
একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, যিনি বর্তমানে নিজ এলাকায় বাড়ি নির্মাণ করছেন, নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “নির্মাণকাজ শুরু করার পর আমাকে নির্দিষ্ট অফিসে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। বলা হয়েছে, নিয়ম না মানলে কাজ চালানো কঠিন হবে।”
জমি দখল ও অফিস স্থাপনের অভিযোগ
স্থানীয় সূত্রের দাবি, এক ব্যবসায়ীর জায়গা দখল করে সেখানে অফিস স্থাপন করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে এলাকায় চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। যদিও জমির মালিকানা ও আইনি অবস্থান সম্পর্কে কোনো সরকারি নথি প্রকাশ্যে আসেনি।
মাদক ও অসামাজিক কার্যকলাপের অভিযোগ
অভিযোগ উঠেছে, চক্রটির সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন ব্যক্তি এলাকায় মাদক ব্যবসা ও অসামাজিক কার্যকলাপ পরিচালনা করছে। স্থানীয়রা দাবি করেন, প্রকাশ্যে চলাফেরা করলেও প্রশাসনিক পদক্ষেপ দৃশ্যমান নয়। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই এখনো সম্ভব হয়নি।
দল থেকে বহিষ্কার ও কঠোর শাস্তির দাবি
এ ঘটনায় স্থানীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের একাংশ দাবি তুলেছেন যে, যদি অভিযোগ প্রাথমিক তদন্তে সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দলীয়ভাবে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
তারা বলেন, রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে কেউ অপরাধ করলে তা দলের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করে। তাই সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে সাময়িক বহিষ্কার, কারণ দর্শানোর নোটিশ এবং দলীয় তদন্ত কমিটি গঠন করা উচিত।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) অতীতেও শৃঙ্খলাভঙ্গ ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিয়েছে। একইভাবে এ ক্ষেত্রেও অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রমাণিত হলে দলীয় পদ থেকে অপসারণ, স্থায়ী বহিষ্কার এবং আইনানুগ বিচারের মুখোমুখি করার দাবি জোরালো হচ্ছে।
প্রশাসনের অবস্থান
স্থানীয় থানা পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, “কেউ সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দিলে আমরা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব। আইন সবার জন্য সমান।”
সাধারণ মানুষের প্রশ্ন
এলাকায় একটি প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে—রাজনীতির নামে কি অপরাধ চলবে? ভোট দিয়ে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত করার পর যদি সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, তবে দায় কার?
সচেতন মহল মনে করছে, দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত, দোষীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা এবং দলীয়ভাবে কঠোর শাস্তিই পারে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে। অন্যথায় এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও অবনতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।