গণপূর্তের ‘ঘুষ সম্রাট’ মইনুলের ১০ কোটি টাকার টেন্ডার জালিয়াতি: ফেঁসে যাচ্ছেন প্রধান প্রকৌশলীও!
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা | ২ জানুয়ারি, ২০২৬
ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৩ যেন দুর্নীতির এক নিরাপদ স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে। এই বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ মাইনুল ইসলামের বিরুদ্ধে প্রকল্প থেকে প্রায় ১০ কোটি টাকা ঘুষ গ্রহণ, টেন্ডার জালিয়াতি এবং ভুয়া কাগজপত্র দিয়ে পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এমনকি ১০ লাখ টাকা ঘুষ লেনদেনের ভিডিও ফাঁস হওয়ার পরও রহস্যজনকভাবে বহাল তবিয়তে আছেন এই কর্মকর্তা, যা নিয়ে সাধারণ কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের মধ্যে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে।
১০ কোটির টেন্ডারে জালিয়াতি ও সুপারিশ বাণিজ্য
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বাংলাদেশ পুলিশের থানা প্রশাসনিক কাম ব্যারাক ভবন নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় দক্ষিণ ও উত্তর কেরানীগঞ্জ থানার নতুন ভবন নির্মাণের টেন্ডারে নজিরবিহীন জালিয়াতি করেছেন মাইনুল ইসলাম।
দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ প্রকল্প: এই প্রকল্পের মূল্য ১০ কোটি ১৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা। মাইনুল ইসলাম মোটা অংকের কমিশনের বিনিময়ে ‘এমকেডি এবং বিজি (জেভি)’ নামক একটি জয়েন্ট ভেঞ্চারকে বিজয়ী করতে ত্রুটিপূর্ণ কাগজপত্রসহ প্রধান প্রকৌশলীর কাছে সুপারিশ পাঠান।
উত্তর কেরানীগঞ্জ প্রকল্প: ১০ কোটি ১৩ লাখ টাকার এই প্রকল্পের টেন্ডারেও ‘আকামিন-কিডিসি (জেভি)’ নামক প্রতিষ্ঠানকে কাজ দিতে জাল নথিপত্র ব্যবহার করেন তিনি।
উভয় ক্ষেত্রেই প্রধান প্রকৌশলী মোঃ খালেদুজ্জামান চৌধুরী নথিপত্র পর্যালোচনা করে বড় ধরনের ত্রুটি ও জালিয়াতি খুঁজে পাওয়ায় ফাইলগুলো ফেরত পাঠিয়ে পুনর্মূল্যায়নের নির্দেশ দিয়েছেন।
ঘুষের ভিডিও ফাঁসেও অটল চেয়ার
বিগত দিনে মাইনুল ইসলামের ১০ লাখ টাকা সরাসরি ঘুষ গ্রহণের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও বিভিন্ন দপ্তরে ছড়িয়ে পড়ে। অভিযোগ রয়েছে, এই জালিয়াতি ধামাচাপা দিতে তিনি প্রধান প্রকৌশলীসহ ঊর্ধ্বতন মহলে বিপুল অংকের অর্থ দিয়ে ম্যানেজ করেছেন। একাধিক প্রকৌশলী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, মাইনুল ইসলাম এতটাই প্রভাবশালী যে তার বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুললে তাকে হয়রানির শিকার হতে হয়। দুর্নীতির সংবাদ প্রকাশ করলে সংবাদকর্মীদের আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকিও দেন তিনি।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পদক্ষেপ ও আইনি পরিণতি
মাইনুল ইসলামের এসব দুর্নীতির বিস্তারিত তথ্য ও তথ্যপ্রমাণ ইতোমধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) জমা পড়েছে। আইনজ্ঞদের মতে, সরকারি প্রকল্পে টেন্ডার জালিয়াতি এবং ঘুষ গ্রহণের প্রমাণিত অভিযোগের ক্ষেত্রে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে:
১. চাকরিচ্যুতি ও জেল: দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন ও সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা অনুযায়ী, অভিযোগ প্রমাণিত হলে মাইনুল ইসলামের স্থায়ী চাকরিচ্যুতিসহ ৭ থেকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হতে পারে। ২. সম্পদ বাজেয়াপ্ত: ঘুষের মাধ্যমে উপার্জিত ১০ কোটি টাকাসহ তার নামে-বেনামে থাকা সকল স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। ৩. ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল: যেসব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জালিয়াতির মাধ্যমে কাজ নেওয়ার চেষ্টা করেছে, তাদের কালো তালিকাভুক্ত করাসহ লাইসেন্স বাতিলের আইনগত বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
এ বিষয়ে প্রধান প্রকৌশলী মোঃ খালেকুজ্জামান চৌধুরী দায়সারা মন্তব্য করে বলেন, “ছুটির দিন হওয়ায় বিস্তারিত বলতে পারছি না।” অন্যদিকে, অভিযুক্ত মাইনুল ইসলামকে ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি এবং খুদে বার্তার কোনো উত্তর দেননি।
জনগণের ট্যাক্সের টাকা নিয়ে এমন ছিনিমিনি খেলার শেষ কোথায়—সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। সচেতন মহল মনে করছেন, মাইনুল ইসলামের মতো ‘ঘুষখোর’ কর্মকর্তাদের শুধু বদলি নয়, বরং দ্রুত গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অন্যথায় গণপূর্তের মতো সেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্নীতির অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে।