ক্ষমতার অপব্যবহার ও বাসচালককে নৃশংস নির্যাতন: কাঠগড়ায় এএসপির স্বামী ও দেহরক্ষী
নিজস্ব প্রতিবেদক | নওগাঁ নওগাঁর সাপাহারে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে হিমাচল পরিবহনের এক বাসচালককে আটকে রেখে নৃশংসভাবে মারধর ও নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে নওগাঁর অতিরিক্ত সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) শ্যামলী রানী বর্মণ, তার স্বামী কলেজ শিক্ষক জয়ন্ত বর্মণ এবং তার দেহরক্ষীর বিরুদ্ধে। গত রোববার (৪ জানুয়ারি) শুরু হওয়া এই ঘটনার রেশ ধরে সোমবার ভুক্তভোগী চালক রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা গ্রহণ করেছেন।
ঘটনার সূত্রপাত: বাসের সিট নিয়ে বিতর্ক
প্রত্যক্ষদর্শী ও বাস সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গত রোববার সকাল সাড়ে ৯টায় হিমাচল পরিবহনের একটি বাস সাপাহার থেকে রাজশাহীর উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। বাসে ধানসুরা যাওয়ার জন্য সিটবিহীন টিকিট কেটে উঠেছিলেন সাপাহার সরকারি কলেজের শিক্ষক জয়ন্ত বর্মণ। বাসটি দিঘার মোড়ে পৌঁছালে ওই সিটের নিয়মিত যাত্রী ওঠায় সুপারভাইজার সিয়াম তাকে সিট ছেড়ে দিতে অনুরোধ করেন।
এতে ক্ষিপ্ত হয়ে জয়ন্ত বর্মণ নিজেকে সার্কেল এসপির স্বামী পরিচয় দিয়ে সুপারভাইজারকে হুমকি দিতে শুরু করেন। একপর্যায়ে তিনি চালক বাদলের সাথেও তুমুল বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন। ধানসুরা স্টপেজে নামার সময় তিনি চালক ও সুপারভাইজারকে “দেখে নেওয়ার” হুমকি দিয়ে বাস থেকে নামেন।
অফিসে ডেকে নিয়ে পৈশাচিক নির্যাতন
জয়ন্ত বর্মণ বাস থেকে নামার পর তার স্ত্রী এএসপি শ্যামলী রানী বর্মণ ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে সাপাহারের টিকিট মাস্টারকে অফিসে ডেকে পাঠান। টিকিট মাস্টারের ফোন থেকে তিনি চালক বাদলকে কল করে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ ও হুমকি দেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
ঘটনার চূড়ান্ত রূপ নেয় ওইদিন রাত ১০টায়, যখন বাসটি রাজশাহী থেকে পুনরায় সাপাহারে ফিরে আসে। অভিযোগ অনুযায়ী:
আটক: বাসটি স্ট্যান্ডে পৌঁছামাত্র চালক বাদলকে এএসপির অফিসে ডেকে নেওয়া হয়।
শারীরিক লাঞ্ছনা: অফিসে ঢোকা মাত্রই এএসপি শ্যামলী রানী বর্মণ চালকের মোবাইল ফোন কেড়ে নেন এবং তাকে লক্ষ্য করে পেটে সজোরে লাথি মারেন।
সম্মিলিত প্রহার: এরপর জয়ন্ত বর্মণ ও এএসপির দেহরক্ষী আনন্দ বর্মণ মিলে চালককে বেধড়ক পেটাতে শুরু করেন।
পাইপ দিয়ে নির্যাতন: শ্যামলী রানীর নির্দেশে তার দেহরক্ষী আনন্দ বর্মণ প্লাস্টিকের পাইপ দিয়ে চালককে পিটিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর জখম করেন।
চিকিৎসা নিতেও বাধা
মারধরের একপর্যায়ে চালক বাদল জ্ঞান হারিয়ে ফেললে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। তবে অভিযোগ রয়েছে, সাপাহারের কোনো স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা না নেওয়ার শর্তে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়। উপায়ান্তর না দেখে পরদিন সোমবার দুপুরে তিনি রাজশাহী ফিরে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে চিকিৎসা নেন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য
বাসের যাত্রী ও স্কুলশিক্ষক নাসির এই ঘটনাকে অত্যন্ত ন্যাক্কারজনক হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন,
“একজন শিক্ষিত মানুষ হয়েও জয়ন্ত বর্মণ যে আচরণ করেছেন তা গ্রহণযোগ্য নয়। এএসপির স্বামী পরিচয় দিয়ে তিনি চালকের কাগজপত্র যেভাবে দেখতে চেয়েছেন এবং হুমকি দিয়েছেন, তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।”
রাজশাহী কলেজের শিক্ষার্থী সজীব বলেন, বাসের ভেতরে জয়ন্ত বর্মণ স্ত্রীর ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করেছিলেন।
বর্তমান পরিস্থিতি
এই ঘটনায় পরিবহন শ্রমিকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে। একজন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কর্মকর্তার উপস্থিতিতে এবং নির্দেশে একজন সাধারণ শ্রমিকের ওপর এমন অমানবিক নির্যাতনের ঘটনায় প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ভুক্তভোগী চালক ও পরিবহন মালিক পক্ষ এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার দাবি করেছেন।