কালীগঞ্জে পল্লী উন্নয়ন বোর্ডের অর্ধ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ: শাস্তির দাবিতে ফুঁসছে জনতা
হাফিজুর রহমান, সাতক্ষীরা (কালিগঞ্জ): সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ উপজেলা পল্লী উন্নয়ন বোর্ডে (বিআরডিবি) ভয়াবহ দুর্নীতি, অর্থ আত্মসাৎ এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ পাওয়া গেছে। আওয়ামী দোসর ও মুজিব প্রেমী হিসেবে পরিচিত সাবেক পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তা (আরডিও) জাহাঙ্গীর আলম এবং তার একান্ত সহযোগী মাঠ পরিদর্শক আব্দুস সালাম পরস্পর যোগসাজশে কেন্দ্রীয় সমবায় সমিতির (ইউসিসিএ) ২ কোটি ৩৪ লক্ষ ১৬ হাজার টাকা অনাদায় দেখিয়ে প্রায় “অর্ধ কোটি” টাকা আত্মসাৎ করে লাপাত্তা হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
এদিকে, জাহাঙ্গীর আলম তড়িঘড়ি বদলি হয়ে যাওয়ার পর তার স্থলে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে আর এক বিতর্কিত কর্মকর্তা তানজিয়ারা খাতুনকে। যাকে স্থানীয় কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ভুক্তভোগীরা “দুর্নীতিবাজ ও ঘুষখোরের মহারানী” এবং “ফ্যাসিস্ট হাসিনা প্রেমী” হিসেবে অভিহিত করেছেন। এই নিয়োগকে কেন্দ্র করে ভুক্তভোগীদের মধ্যে “চোর তাড়িয়ে ডাকাত আনার” মতো ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে, যা বর্তমানে গোটা উপজেলায় ‘টক অব দ্য টাউন’-এ পরিণত হয়েছে।
বিভাগীয় তদন্তে ভুয়া স্বাক্ষরের জালিয়াতি ফাঁস: অভিযোগ উঠেছে যে, নিজেদের অপকর্ম ঢাকতে জাহাঙ্গীর আলম ও তার চক্র বিগত আওয়ামী ফ্যাসিস্টদের স্বাক্ষরসহ বিভিন্ন জামায়াত-বিএনপি নেতাকর্মী ও বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সমন্বয়কদের নাম ব্যবহার করে বিভিন্ন দপ্তরে ভুয়া অভিযোগ ও আবেদনপত্র প্রেরণ করেছে। তবে তদন্ত কমিটির অনুসন্ধানে এই সকল আবেদন ও স্বাক্ষর ভুয়া এবং মিথ্যা বলে প্রমাণিত হয়েছে।
দুর্নীতির ফিরিস্তি ও অর্থ আত্মসাৎ: সাতক্ষীরা কালীগঞ্জ উপজেলার সাবেক আরডিও জাহাঙ্গীর আলম (ই-২৯৩৯) এবং মাঠ পরিদর্শক আব্দুস সালামের বিরুদ্ধে লাগামহীন স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ পাওয়া গেছে। শত শত কৃষকের ঋণের কিস্তির টাকা আদায় করলেও তা সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে আত্মসাৎ করা হয়েছে। গত ২৩ নভেম্বর বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ডের উপ-পরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ মহিদুর রহমান স্বাক্ষরিত এক আদেশে জাহাঙ্গীর আলমকে নড়াইল জেলার লোহাগড়া উপজেলায় ‘স্ট্যান্ড রিলিজ’ করা হয়। এই খবর ছরিয়ে পড়ার পর থেকেই মাঠ পরিদর্শক আব্দুস সালাম গা ঢাকা দিয়েছেন। ধুরন্ধর জাহাঙ্গীর আলম নিজেকে বাঁচাতে এখন সমস্ত দায় পলাতক সালামের ওপর চাপিয়ে গণমাধ্যমে অপপ্রচার চালাচ্ছেন বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন।
কর্মকর্তা ও সদস্যদের তীব্র প্রতিবাদ: জাহাঙ্গীর আলমের সাফাই বক্তব্যকে মিথ্যা ও বানোয়াট উল্লেখ করে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন ইউসিসি লিমিটেডের চেয়ারম্যান শেখ লুৎফর রহমান, ইউপিও জিএম আজমল হোসেন, শাহাদাত হোসেন, গোপাল চ্যাটার্জি ও রবিউল ইসলামসহ সাধারণ সদস্যরা। তারা জানান, জাহাঙ্গীর আলম দায়িত্ব পালনকালে কোনোদিন উপজেলা সমন্বয় কমিটির মিটিংয়ে যোগ দেননি। মাঠ পরিদর্শক সালাম মাসের পর মাস টাকা আত্মসাৎ করলেও জাহাঙ্গীর আলম কেন তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেননি বা ইউএনও-কে জানাননি, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। উল্টো বিপদে পড়ার আশঙ্কায় তিনি সমন্বয়কদের স্বাক্ষর জাল করে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছেন। অভিযোগ আছে, তিনি বেলা ১০টায় অফিসে এসে সালামের সাথে শলাপরামর্শ করে ১টার মধ্যেই অফিস ত্যাগ করতেন।
অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত তানজিয়ারা খাতুনের আমলনামা: জাহাঙ্গীর আলমের বদলির পর শ্যামনগর উপজেলার আরডিও তানজিয়ারা খাতুনকে গত ২৫/১১/২৫ তারিখে কালীগঞ্জের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়। এর প্রতিবাদে গত ৭ ডিসেম্বর বিআরডিবির উপ-পরিচালক বরাবর লিখিত আবেদন করেছেন কর্মচারীরা। আবেদনে বলা হয়েছে, তানজিয়ারা খাতুন ৫ই আগস্টের পর অফিস থেকে হাসিনা-মুজিবের ছবি সরাতে বাধা দেন। এছাড়া তার বিরুদ্ধে স্টাফদের কাছ থেকে ধার নিয়ে শোধ না করা, ঋণ প্রদানে ঘুষ গ্রহণ এবং অফিসের ল্যাপটপসহ মূল্যবান সামগ্রী আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। ইতিপূর্বে কালীগঞ্জে দায়িত্ব পালনকালে ব্যাপক দুর্নীতির দায়েই তাকে শ্যামনগরে বদলি করা হয়েছিল। বর্তমানে তানজিয়ারা ও তার স্বামী (যিনিও শ্যামনগরে কর্মরত) মিলে খুলনায় একাধিক প্লট ও অঢেল সম্পদের পাহাড় গড়েছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
শাস্তির দাবি: কালীগঞ্জ উপজেলা পল্লী উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং ইউসিসিএ লিমিটেডের সদস্যরা অতি দ্রুত এই দুর্নীতিবাজ চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। তারা পলাতক আব্দুস সালামকে আইনের আওতায় আনা এবং জাহাঙ্গীর আলম ও তানজিয়ারা খাতুনের অবৈধ সম্পদের তদন্তপূর্বক দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।