উলিপুরে ভিক্ষুক পুনর্বাসন কর্মসূচি: “আর ভিক্ষা করব না”—ছাগল পেয়ে কাঁদলেন পঙ্গু বছির
রফিকুল ইসলাম রফিক, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি
১৭ জুলাই ২০২৫, উলিপুর, কুড়িগ্রাম
“অহন আর ভিক্ষা করুম না। পঙ্গু মানুষ, কিছু করি খাবার পাই না, তাই ভিক্ষা করতাম। কিন্তু ভিক্ষা করা বড় শরমের কাজ গো। স্যার দয়া কইরা আমারে ছাগল দিছে। ছাগল পালমু, আর খামু।”
এই কাঁপা-কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন পঙ্গু বছির উদ্দিন। চোখে অশ্রু, হাতে ছাগল—এই একটুকু আশাতেই যেন নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখছেন কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার পূর্ব ছড়ার পাড় ভাটিয়াপাড়া গ্রামের এই হতদরিদ্র ব্যক্তি।
একই আবেগে কথা বলেন লাঠির খামার ধরনীবাড়ী গ্রামের অন্ধ হাফেজ মাজেদ আলীও। তিনি বলেন, “ভিক্ষা করা লজ্জার কাজ, কিন্ত কি করমু! ছেলে-মেয়ে নিয়া খুব কষ্টে বাঁচতেছি। ছাগল পালমু, বাঁচার চেষ্টা করমু।”
ভিক্ষাবৃত্তি নয়, এখন স্বাবলম্বনের পথ
উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ৮ জন ভিক্ষুক ও দুঃস্থ পঙ্গু মানুষের মধ্যে ৩০টি উন্নতজাতের ছাগল বিতরণ করা হয় বৃহস্পতিবার (১৭ জুলাই)।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নয়ন কুমার সাহার নেতৃত্বে এই পুনর্বাসন কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়।
ইউএনও বলেন,
> “এই ছাগলগুলো তাদের জীবিকা নির্বাহে সহায়তা করবে। যারা সৎভাবে চেষ্টা করবেন, ভবিষ্যতে আরও সহায়তা পাবেন। আমাদের উদ্দেশ্য—মানুষকে সম্মানজনক জীবিকার পথে ফিরিয়ে আনা।”
প্রতিটি পরিবারে তিনটি ছাগল, একটিতে প্রজননের ব্যবস্থা
ছাগলপ্রাপ্তরা হলেন—
ছফুরা বেওয়া (আব্দুল হাকিম গ্রাম)
আজিমন বেওয়া (দক্ষিণ মধুপুর)
লিটন মিয়া (তবকপুর, পঙ্গু)
হাফেজ মাজেদ আলী (লাঠির খামার, অন্ধ)
বছির উদ্দিন (পূর্ব ছড়ার পাড়, পঙ্গু)
ভারতী বর্ম্মন (মুন্সিবাড়ী)
সুমি বেগম (তালাকপ্রাপ্ত, রামদাস ধনিরাম)
মকবুল হোসেন (বৃদ্ধ ভ্যানচালক, পূর্ব কালু ডাঙ্গা)
প্রত্যেক পরিবারকে তিনটি করে ছাগল দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে একটি পুরুষ প্রজনন উপযোগী। প্রশাসনের ধারণা, এসব ছাগল পালনের মাধ্যমে পরিবারগুলো ভবিষ্যতে স্বাবলম্বী হতে পারবে।
🌱 একটি ছোট পা ফেললেই বড় পথ শুরু হয়
এই কর্মসূচিকে স্বাগত জানিয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও বলছেন, এটি শুধু পুনর্বাসন নয়, এটি একটি মানসিক পরিবর্তনের সূচনা। “ভিক্ষুক নয়, এখন তারা খামারী”—এই দৃষ্টিভঙ্গির বদলই মূল অর্জন।
সরকারিভাবে জানানো হয়েছে, ভিক্ষাবৃত্তি নিরুৎসাহিত করতে ভবিষ্যতে আরও এ ধরনের কার্যক্রম চালু থাকবে এবং স্থানীয় প্রশাসন সরাসরি তদারক করবে যেন উপকারভোগীরা প্রকৃতই উপকৃত হন।
মন্তব্য:
বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এমন মানবিক উদ্যোগ যদি নিয়মিত ও যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হয়, তবে সত্যিই ‘ভিক্ষুকমুক্ত’ সমাজ গড়া অসম্ভব কিছু নয়। এক ফোঁটা সহানুভূতি, এক চিমটি স্বপ্ন—এই দিয়েই পাল্টানো যায় জীবনের গন্তব্য।