ইসলামী ইন্স্যুরেন্সে ‘বোর্ডহীন’ রাজত্ব: আইনের তোয়াক্কা না করে কোটি কোটি টাকা লুটপাট, ধ্বংসের মুখে লক্ষাধিক বিনিয়োগকারী
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা
দেশের বীমা খাত ও পুঁজিবাজারের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন অরাজকতা তৈরি হয়েছে তালিকাভুক্ত কোম্পানি ইসলামী ইন্স্যুরেন্স বাংলাদেশ লিমিটেডে। গত পাঁচ মাস ধরে কোনো বৈধ পরিচালনা পর্ষদ (Board of Directors) ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে এই প্রতিষ্ঠানটি। আইনের তোয়াক্কা না করে একটি স্বার্থান্বেষী সিন্ডিকেট কোম্পানিটিকে ব্যক্তিগত সম্পদে পরিণত করেছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ (IDRA) এবং স্টক এক্সচেঞ্জের নির্দেশনাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে চালানো হচ্ছে এই অর্থ আত্মসাৎ।
১. প্রশাসনিক শূন্যতা ও অদৃশ্য শক্তির ইশারায় কোম্পানি
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কোম্পানির চেয়ারম্যান সাবেক মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকনসহ অধিকাংশ পরিচালক আত্মগোপনে থাকায় প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে অভিভাবকহীন। কোম্পানি আইন ১৯৯৪ অনুযায়ী, বোর্ডের কোনো অস্তিত্ব না থাকলে কোম্পানি কোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। অথচ ইসলামী ইন্স্যুরেন্সে ঘটছে তার উল্টো।
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে যারা: অনুসন্ধানে জানা গেছে, ভাইস চেয়ারম্যান ও স্পন্সর ডিরেক্টর নূর মোহাম্মদ-এর প্রত্যক্ষ মদদে কোম্পানি সেক্রেটারি চৌধুরী এহসানুল হক এবং ভারপ্রাপ্ত সিইও মো. মইনুল হাসান চৌধুরী একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। বোর্ড সভা ছাড়াই তারা নিয়োগ-পদোন্নতি এবং বড় অংকের আর্থিক লেনদেন সম্পন্ন করছেন।
২. কোটি কোটি টাকার আর্থিক লুটপাটের খতিয়ান
বোর্ড অনুমোদন ছাড়া ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলন করা সরাসরি দণ্ডবিধি ও বীমা আইনের লঙ্ঘন।
প্রিমিয়াম আত্মসাৎ: শুধুমাত্র ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসেই প্রায় ৮ কোটি টাকা প্রিমিয়াম আয় হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এই অর্থের বিশাল একটি অংশ ভুয়া বিল, অস্বাভাবিক কমিশন এবং সিগনেটরি ছাড়া চেকে সই করে উত্তোলন করা হয়েছে।
বেতন কেলেঙ্কারি: উত্তরা ব্রাঞ্চ ম্যানেজারের মাসিক ৬ লাখ টাকা বেতনের অবিশ্বাস্য তথ্য পাওয়া গেছে, যার একটি বড় অংশ যাচ্ছে সিন্ডিকেটের পকেটে।
ক্লেইম জালিয়াতি: ‘প্রতীক সিরামিক’ ক্লেইম কেলেঙ্কারির মাধ্যমে বিপুল অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি এখন দুদক (ACC) পর্যন্ত গড়িয়েছে।
৩. আইডিআরএ-র নির্দেশ অমান্য: নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে চ্যালেঞ্জ
বীমা খাতের অভিভাবক সংস্থা আইডিআরএ গত ৯ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে এক চিঠিতে অবৈধভাবে অপসারিত এমডি আব্দুল খালেককে পুনর্বহালের নির্দেশ দিলেও তা কার্যকর করা হয়নি। একটি তালিকাভুক্ত কোম্পানি যখন নিয়ন্ত্রক সংস্থার লিখিত আদেশকে তোয়াক্কা করে না, তখন পুরো খাতের শৃঙ্খলাই প্রশ্নের মুখে পড়ে।
৪. প্রচলিত আইন অনুযায়ী শাস্তির বিধান
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইসলামী ইন্স্যুরেন্সে যা ঘটছে তা কেবল অনিয়ম নয়, বরং সুষ্পষ্ট ফৌজদারি অপরাধ। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিম্নলিখিত শাস্তির মুখোমুখি হতে পারে:
অপরাধের ধরণ সংশ্লিষ্ট আইন সম্ভাব্য শাস্তি
বোর্ড ছাড়া কার্যক্রম পরিচালনা কোম্পানি আইন, ১৯৯৪ লাইসেন্স বাতিল ও কোম্পানি অবসায়ন।
অবৈধ নিয়োগ ও সিগনেটরি ছাড়া লেনদেন বীমা আইন, ২০১০ (ধারা ১৩০ ও ১৩৪) ১০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত জরিমানা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অপসারণ।
আর্থিক জালিয়াতি ও তহবিল তছরুপ দণ্ডবিধি ১৮৬০ (ধারা ৪০৬ ও ৪২০) ৩ থেকে ৭ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড।
বিএসইসি নির্দেশনা অমান্য সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অধ্যাদেশ, ১৯৬৯ স্টক এক্সচেঞ্জ থেকে ডিলিস্টিং এবং ব্যক্তিগত জরিমানা।
৫. ঝুঁকিতে লক্ষাধিক শেয়ারহোল্ডার
পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত এই কোম্পানিটির লক্ষাধিক সাধারণ বিনিয়োগকারী এখন চরম উৎকণ্ঠায়। ডিএসই (DSE) এবং সিএসই (CSE)-র নীরবতা এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে। বিনিয়োগকারীদের প্রশ্ন— “বোর্ড ছাড়া কোম্পানি চলে কীভাবে? আমাদের জমানো টাকার নিরাপত্তা কোথায়?”
৬. আশু করণীয়: বিশেষজ্ঞদের অভিমত
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কোম্পানিটিকে বাঁচাতে হলে অবিলম্বে নিচের পদক্ষেপগুলো নেওয়া জরুরি: ১. আইডিআরএ কর্তৃক দ্রুত ‘প্রশাসক’ (Administrator) নিয়োগ করা। ২. একটি স্বতন্ত্র ফরেনসিক অডিট-এর মাধ্যমে গত ৫ মাসের হিসাব পরীক্ষা করা। ৩. অবৈধ সিন্ডিকেটের সদস্যদের ব্যাংক হিসাব জব্দ ও তাদের বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা জারি। ৪. স্টক এক্সচেঞ্জ কর্তৃক কোম্পানির লেনদেন পর্যবেক্ষণ এবং কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ।
ইসলামী ইন্স্যুরেন্স বাংলাদেশ লিমিটেড এখন একটি ডুবন্ত জাহাজ। যদি দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়া না হয়, তবে এটি কেবল একটি বীমা কোম্পানির পতন হবে না, বরং পুরো পুঁজিবাজারের ওপর বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতার বড় কারণ হয়ে দাঁড়াবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কি এর দায়ভার নেবে, নাকি লুটপাটকারীদের এই মৌন সমর্থন চলতেই থাকবে?