ঢাকা | জুলাই ২০২৫
প্রতিবেদন: ডেইলি বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ
২০২৪ সালের ২৭ জুলাই। ঢাকার আগারগাঁওয়ের ডাক ভবনে আয়োজিত এক ‘সবুজ উৎসবে’, ICT প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক দাঁড়িয়ে বলেছিলেন,
> “সরকার ইন্টারনেট বন্ধ করেনি, ইন্টারনেট নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে গেছে।”
সেদিন ছিল সজীব ওয়াজেদ জয়ের ৫৪তম জন্মদিন। ‘শান্তির জন্য বৃক্ষ’ কর্মসূচিতে সারাদেশে এক লাখ গাছের চারা রোপণের আয়োজন চলছিল, আর ব্যাকড্রপে দেশের বড় একটি ডিজিটাল ব্ল্যাকআউট—যেটির দায় নিচ্ছিল না কেউ।
এক বছর পর আজ, ২০২৫ সালে, সেই পলক আছেন কারাগারে।
তথ্য বিকৃতি, প্রযুক্তির অপব্যবহার, এবং রাষ্ট্রীয় সেন্সরশিপে প্রত্যক্ষ ভূমিকার অভিযোগে রাষ্ট্রদ্রোহ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের মামলায় আটক এই সাবেক মন্ত্রী এখন ইতিহাসের অন্ধকার অধ্যায়ের অংশ হয়ে গেছেন।
এক বছর আগের নাটকীয় বাস্তবতা
২০২৪ সালের জুলাই মাসে দেশে ১০ দিনের ভয়াবহ ইন্টারনেট বিভ্রাট দেখা যায়। পলকের বক্তব্য অনুযায়ী, এর পেছনে তিনটি ‘তথ্যগত’ ব্যাখ্যা ছিল:
1. ঢাকায় হঠাৎ ৫০,০০০–১,০০,০০০ নতুন সিম চালু হওয়া
2. মহাখালীতে ১৮টি আইআইজি সিস্টেমে ‘কারিগরি সমস্যা’
3. সরকার নয়, বরং প্রযুক্তিই ‘আপনাআপনি’ বন্ধ হয়ে যাওয়া
তবে বাস্তব ছিল ভয়ঙ্কর আলাদা।
ব্ল্যাকআউট না কি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সেন্সরশিপ?
এই বিভ্রাট এমন এক সময় ঘটেছিল, যখন:
ছাত্র ও যুব সংগঠনের রাজনৈতিক আন্দোলন তুঙ্গে
বিরোধী রাজনৈতিক দলের সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক সক্রিয়তা
সাংবাদিক ও অ্যাক্টিভিস্টদের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ধারাবাহিক প্রতিবাদ
তারপর একের পর এক ঘটতে থাকে:
ফেসবুক-লাইভ হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়া
টেলিগ্রাম/সিগনাল গ্রুপে নজরদারি
স্বাধীন নিউজ পোর্টাল ব্লক করে দেওয়া
বেশ কয়েকজন সাংবাদিক গ্রেফতার
আর পলক তখন দাঁড়িয়ে বলছিলেন, “সবই কারিগরি ত্রুটি।”
—
২০২৫ সালের বাস্তবতা: কারাগারে জুনায়েদ পলক
বর্তমান সরকারের অধীনে গঠিত ডিজিটাল অপরাধ তদন্ত সেল (DOIC) এবং হাইকোর্টে গৃহীত একাধিক সাক্ষ্য ও তদন্ত রিপোর্ট অনুযায়ী:
আইআইজি ও ISP-এ ইচ্ছাকৃতভাবে কারিগরি ব্যাঘাত ঘটানো হয়েছিল
কমপক্ষে ৭৭টি স্বাধীন নিউজ পোর্টাল ব্লক করা হয়েছিল
বিরোধী রাজনীতিক, সাংবাদিক ও ছাত্রনেতাদের ডিভাইসে স্পাইওয়্যার প্রয়োগ হয়েছিল
জাতীয় টেলিযোগাযোগ মনিটরিং সেন্টার (NTMC)-এর মাধ্যমে মনিটরিং অ্যান্ড ব্লক অপারেশন চালানো হয়
এমনকি, পলকের সাক্ষাৎকারেই উঠে আসে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরাসরি মৌখিক নির্দেশে এই সেন্সরশিপ চালানো হয়েছিল।
তদন্ত ও মামলা পরিস্থিতি
অভিযোগের ধারা:
টেলিযোগাযোগ আইন, ধারা ৫৩
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ধারা ২১, ৩১, ৩৫
মানবাধিকার সংক্রান্ত জাতিসংঘ প্রস্তাব লঙ্ঘন
তথ্য অধিকার আইন লঙ্ঘন
রাষ্ট্রদ্রোহ ও প্রযুক্তিগত জালিয়াতি
পলকের জামিন বারবার প্রত্যাখ্যাত, মামলা চলছে ICT Tribunal-এ।
ঘটনাক্রম: ‘সবুজ উৎসব’ থেকে ‘ডিজিটাল নিঃশব্দতা’
বিষয় ২০২৪ এর বয়ান ২০২৫ এর অনুসন্ধান
পলকের বক্তব্য “সরকার কিছু করেনি” আদালতে মিথ্যা প্রমাণিত
ইন্টারনেট বিভ্রাট ১০ দিনের অজুহাত পরিকল্পিত ডিজিটাল সেন্সরশিপ
আইআইজি কারিগরি সমস্যা গল্প প্রচার হস্তক্ষেপ ও নিয়ন্ত্রণ প্রমাণিত
বিরোধী দলের দাবি ‘ইচ্ছাকৃত শাটডাউন’ ট্রাইব্যুনালে প্রমাণিত সত্য
ডিজিটাল গণঅভ্যুত্থান নাকি নিপীড়নের পর্দা?
জুলাই ২০২৪-এর ইন্টারনেট বিভ্রাট ছিল একটি কৌশলী ব্ল্যাকআউট, যেখানে সরকার শান্তি রক্ষার নামে জনগণের কণ্ঠ ডিজিটালি অবরুদ্ধ করেছিল।
> গাছের চারা লাগানো হচ্ছিল মঞ্চে,
আর অনলাইনে মানুষ হারাচ্ছিল তাদের কণ্ঠ।
ইতিহাস মুখ খুলেছে
২৭ জুলাই ২০২৪ ছিল প্রতীকী এক দিন—সবুজ ব্যানারের নিচে যে কথা বলা হয়েছিল, তার ঠিক উল্টোটা ঘটছিল পর্দার আড়ালে।
এক বছর পর, ২০২৫ সালে, সেই সবুজ মঞ্চ এখন কালো ইতিহাস।
আইসিটি প্রতিমন্ত্রী বলেছিলেন, “ইন্টারনেট নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে গেছে।”
কিন্তু ইতিহাস বলছে, প্রযুক্তি ছিল সরকারের অস্ত্র, এবং সেই অস্ত্রের দায় আজ পলকের কাঁধে, কারাগারের তালা-পড়া ঘরের ভিতরে।