আদ্রা আব্দুল মান্নান উচ্চ বিদ্যালয়ের দুই শিক্ষকের যোগ্যতা ও সনদ নিয়ে প্রশ্ন; গ্রন্থাগারিকের সনদ যাচাইয়ের দাবি, তদন্তের মুখে নিয়োগের বৈধতা
জামালপুর প্রতিনিধি | দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ
জামালপুরের মেলান্দহ উপজেলায় একটি উচ্চ বিদ্যালয়ের দুই শিক্ষকের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও নিয়োগসংক্রান্ত সনদ নিয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। উপজেলার আদ্রা আব্দুল মান্নান উচ্চ বিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারিক শাহ নাজ পারভীন ও আইসিটি বিভাগের শিক্ষক নাসিমা আক্তারের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় যোগ্যতার সনদ এবং সনদের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সনদ দেখাতে না পারায় নাসিমা আক্তারকে সাময়িক অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ফরহাদ হোসেন।
অন্যদিকে, গ্রন্থাগারিক শাহ নাজ পারভীনের নিয়োগের সময় দাখিল করা সনদ এবং পরবর্তী সময়ে জমা দেওয়া আরেকটি সনদের সত্যতা যাচাইয়ের দাবি উঠেছে। এ ছাড়া বিদ্যালয়ের আরেক সহকারী শিক্ষক গোলাম মোস্তফার বিরুদ্ধে নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিত না থেকে কোচিং সেন্টারে সময় দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। তবে তিনি এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
অভিযোগগুলো সত্য হলে সংশ্লিষ্টদের নিয়োগের বৈধতা, বেতন-ভাতা গ্রহণ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত অভিযোগগুলোর সবকিছু স্বাধীন তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে—এমন তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে সনদ যাচাই, নিয়োগসংক্রান্ত নথি পর্যালোচনা এবং সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্যের ভিত্তিতে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
নিয়োগের শুরু থেকেই সনদ নিয়ে প্রশ্ন
বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০১০ সালের ২৬ জুন তৎকালীন ম্যানেজিং কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শাহ নাজ পারভীনকে বিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারিক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, নিয়োগের সময় তিনি দারুল এহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সনদ জমা দিয়েছিলেন, যার সত্যতা নিয়ে পরবর্তী সময়ে প্রশ্ন ওঠে।
তবে ওই সনদটি জাল কি না, সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় বা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো প্রতিবেদন বা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি।
অভিযোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, শাহ নাজ পারভীন ২০২৬ সালে বগুড়ার সিট ফাউন্ডেশনের ২০১৩ সালের ডিপ্লোমা ইন লাইব্রেরি সায়েন্স অ্যান্ড ইনফরমেশন টেকনোলজি কোর্সের একটি সনদ জমা দিয়েছেন বলে বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে।
উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, ওই সনদে ২০১৩ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত এক বছর মেয়াদি কোর্স সম্পন্ন করার কথা উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু অভিযোগকারীদের দাবি, ওই সময়ের মধ্যে তিনি বিদ্যালয়ে উপস্থিত থেকে দায়িত্ব পালন ও বেতন উত্তোলন করেছেন বলে নথিতে তথ্য রয়েছে।
এখানেই তৈরি হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—একই সময়ে নিয়মিত চাকরির দায়িত্ব পালন এবং এক বছর মেয়াদি প্রশিক্ষণ বা কোর্স সম্পন্ন করার বিষয়টি বাস্তবসম্মত ও বিধিসম্মত ছিল কি না। কোর্সের ধরন, ক্লাসের সময়সূচি, উপস্থিতির রেকর্ড, পরীক্ষার নথি, সনদ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির চাকরির হাজিরা খাতা যাচাই না করে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
সনদটি প্রকৃত, বৈধ ও সংশ্লিষ্ট পদের জন্য গ্রহণযোগ্য কি না, তা নিশ্চিত করতে সিট ফাউন্ডেশনের মূল রেজিস্টার, ভর্তি ও পরীক্ষার নথি এবং সনদ প্রদানের অনুমোদন যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নিয়োগের সময় কার্যকর বিধিমালা অনুযায়ী গ্রন্থাগারিক পদে কী ধরনের শিক্ষাগত যোগ্যতা প্রয়োজন ছিল, সেটিও পরীক্ষা করা জরুরি।
সনদ দেখাতে না পারায় নাসিমা আক্তারের সাময়িক অব্যাহতি
বিদ্যালয়ের আইসিটি বিভাগের শিক্ষক নাসিমা আক্তারের প্রয়োজনীয় সনদ না থাকার অভিযোগও সামনে এসেছে। বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ফরহাদ হোসেনের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ১৫ অক্টোবর বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত জরুরি সভায় তাঁকে সাময়িক অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক জানান, নাসিমা আক্তার প্রয়োজনীয় সনদ দেখাতে পারেননি। এ কারণে তাঁকে সাময়িক অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
তবে এ সিদ্ধান্তের লিখিত আদেশ, সভার কার্যবিবরণী, অব্যাহতির নির্দিষ্ট শর্ত এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্তৃপক্ষের অনুমোদন রয়েছে কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন। সাময়িক অব্যাহতি প্রশাসনিক পদক্ষেপ; এটি নিজে থেকে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের চূড়ান্ত প্রমাণ নয়।
নাসিমা আক্তারের নিয়োগপত্র, শিক্ষাগত যোগ্যতার মূল সনদ, শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়নপত্র প্রযোজ্য হলে তার সত্যতা এবং নিয়োগের সময়কার বিধিমালা পরীক্ষা করা হলে অভিযোগের প্রকৃত অবস্থা স্পষ্ট হতে পারে।
এ বিষয়ে নাসিমা আক্তারের বিস্তারিত বক্তব্য এবং তাঁর পক্ষ থেকে কোনো নথি বা ব্যাখ্যা পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা প্রয়োজন।
সনদ যাচাইয়ের আগেই উচ্চতর স্কেল ও টাইম স্কেলের আবেদন?
বিদ্যালয় সূত্রে আরও জানা গেছে, গত ২৭ সেপ্টেম্বর শাহ নাজ পারভীনের উচ্চতর স্কেল ও টাইম স্কেলের আবেদন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরে পাঠানো হয়েছে।
এ ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে, তাঁর নিয়োগের বৈধতা ও শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে অভিযোগ থাকা অবস্থায় সংশ্লিষ্ট সনদ যাচাইয়ের অগ্রগতি কী এবং আবেদন পাঠানোর আগে প্রয়োজনীয় নথি পরীক্ষা করা হয়েছিল কি না।
তবে উচ্চতর স্কেল বা টাইম স্কেলের আবেদন পাঠানো মানেই তা অনুমোদিত হয়েছে—এমন নয়। আবেদন পাঠানোর তারিখ, প্রাপ্তি স্বীকার, সংযুক্ত নথি, যাচাই প্রতিবেদন এবং অনুমোদনসংক্রান্ত আদেশ পর্যালোচনা করলেই বিষয়টি পরিষ্কার হবে।
স্থানীয়দের দাবি, সনদ ও নিয়োগের বৈধতা নিরপেক্ষভাবে যাচাই না করে কোনো আর্থিক সুবিধা অনুমোদন করা উচিত নয়। একই সঙ্গে বৈধভাবে প্রাপ্য কোনো সুযোগ যেন অযথা আটকে না থাকে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
গোলাম মোস্তফার বিরুদ্ধে অভিযোগ, অস্বীকার তাঁর
বিদ্যালয়ের আরেক সহকারী শিক্ষক গোলাম মোস্তফার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তিনি বিদ্যালয়ে নিয়মিত উপস্থিত না থেকে কোচিং সেন্টারে সময় দেন। এ অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য বিদ্যালয়ের হাজিরা খাতা, ছুটির রেকর্ড, পাঠদান সূচি, শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতির তথ্য এবং প্রযোজ্য হলে কোচিং কার্যক্রমসংক্রান্ত নথি পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
তবে গোলাম মোস্তফা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “আমি বেকার থাকাবস্থায় ২০০০ সালে কোচিং সেন্টার খুলেছিলাম। চাকরি হওয়ার পর আর কোচিং সেন্টারে যাওয়া হয় না। পাশাপাশি আমি কখনো কোনো রাজনৈতিক দলের পদে ছিলাম না।”
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, চাকরিতে যোগদানের পর তিনি কোচিং সেন্টারে যাতায়াত করেন না এবং কোনো রাজনৈতিক দলের পদেও ছিলেন না। ফলে অভিযোগের সঙ্গে তাঁর বক্তব্যের পার্থক্য নিরসনে নির্ভরযোগ্য নথি ও প্রত্যক্ষ তথ্য যাচাই করা জরুরি।
শিক্ষক হিসেবে নিয়মিত দায়িত্ব পালন করছেন কি না, তা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয় বা পরিচিতি নয়, বরং উপস্থিতি, পাঠদান, ছুটি এবং চাকরিবিধি অনুসরণের প্রমাণই হওয়া উচিত প্রধান বিবেচ্য।
শাহ নাজ পারভীনের বক্তব্য
নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে শাহ নাজ পারভীন দাবি করেছেন, তাঁর সনদ সঠিক। তিনি আরও জানান, সিট ফাউন্ডেশনের একটি নতুন সনদ জমা দিয়েছেন।
তাঁর এই বক্তব্য অভিযোগের বিপরীতে গুরুত্বপূর্ণ। তবে সনদের বৈধতা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও কর্তৃপক্ষের। সনদ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন, মূল রেকর্ড, কোর্সের মেয়াদ, ভর্তি ও পরীক্ষার তথ্য এবং চাকরির সঙ্গে সময়ের সামঞ্জস্য যাচাই করলেই বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব হবে।
শাহ নাজ পারভীনের দাবি সত্য হলে তা প্রমাণের জন্য প্রয়োজনীয় নথি উপস্থাপন করার সুযোগ থাকা উচিত। অন্যদিকে, যাচাইয়ে কোনো অসংগতি পাওয়া গেলে তার ব্যাখ্যা গ্রহণ করে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়াও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব।
ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের বক্তব্য
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ফরহাদ হোসেন বলেন, “নাসিমা আক্তার সনদ দেখাতে না পারায় তাকে সাময়িক অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। আর শাহ নাজ পারভীনের সনদ নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। একটি সনদ পেয়েছি, সেটি যাচাই-বাছাই করা প্রয়োজন।”
তাঁর বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, অন্তত একজন শিক্ষকের সনদসংক্রান্ত বিষয়ে বিদ্যালয় প্রশাসন পদক্ষেপ নিয়েছে এবং অন্য শিক্ষকের সনদ যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেছে।
এখন প্রশ্ন হলো, সনদ যাচাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা কর্তৃপক্ষের কাছে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানো হয়েছে কি না, তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে কি না এবং নিয়োগের মূল নথি পর্যালোচনার কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে কি না।
বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের উচিত, অভিযোগের প্রতিটি বিষয় আলাদাভাবে নথিভুক্ত করে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে যাচাই করা। এতে একদিকে যেমন প্রকৃত অনিয়ম শনাক্ত করা সম্ভব হবে, অন্যদিকে ভিত্তিহীন অভিযোগের কারণে কোনো শিক্ষক যেন অন্যায়ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সেটিও নিশ্চিত করা যাবে।
উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার বক্তব্য
মেলান্দহ উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ আজাদুর রহমান ভূঁইয়া জানান, তিনি বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলেছেন। বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এখন সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রশাসনের কাছে প্রত্যাশা, অভিযোগগুলো শুধু মৌখিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ না রেখে লিখিত নথি সংগ্রহের মাধ্যমে যাচাই করা হোক। বিশেষ করে নিয়োগের মূল বিজ্ঞপ্তি, নিয়োগ কমিটির সিদ্ধান্ত, শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ, শিক্ষক নিবন্ধনসংক্রান্ত নথি, এমপিও-সংক্রান্ত তথ্য প্রযোজ্য হলে, বেতন-ভাতার রেকর্ড এবং উপস্থিতির খাতা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। আর অভিযোগ প্রমাণিত না হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ওঠা সন্দেহের অবসান ঘটিয়ে তাঁদের অবস্থানও পরিষ্কার করা জরুরি।
জাল সনদ প্রমাণিত হলে কী শাস্তি হতে পারে?
শিক্ষাগত সনদ জাল করা, জাল সনদ জেনেশুনে আসল হিসেবে ব্যবহার করা কিংবা প্রতারণার উদ্দেশ্যে তা দাখিল করার অভিযোগ প্রমাণিত হলে বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী ফৌজদারি দায় তৈরি হতে পারে। তবে কোন ধারা প্রযোজ্য হবে, তা নির্ভর করবে সনদের প্রকৃতি, সেটি কীভাবে তৈরি বা ব্যবহার করা হয়েছে এবং মামলার প্রমাণের ওপর।
১. দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ৪৬৩ ও ৪৬৪ ধারা—জালিয়াতির সংজ্ঞা: কোনো দলিল প্রতারণামূলকভাবে তৈরি বা পরিবর্তন করা হয়েছে কি না, তা নির্ধারণে এসব ধারার বিধান প্রাসঙ্গিক হতে পারে। শুধু সনদ নিয়ে সন্দেহ থাকলেই জালিয়াতি প্রমাণিত হয় না।
২. দণ্ডবিধির ৪৬৫ ধারা—সাধারণ জালিয়াতির শাস্তি: জালিয়াতির অপরাধ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ দুই বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে। <Link url=”https://bdlaws.minlaw.gov.bd/act-print-11.html” title=”বাংলাদেশের দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর মূল আইন দেখুন”/>।
৩. দণ্ডবিধির ৪৬৮ ধারা—প্রতারণার উদ্দেশ্যে জালিয়াতি: প্রতারণার উদ্দেশ্যে কোনো জাল দলিল তৈরি করার অপরাধ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড হতে পারে।
৪. দণ্ডবিধির ৪৭১ ধারা—জাল দলিল আসল হিসেবে ব্যবহার: কোনো ব্যক্তি দলিলটি জাল বলে জানতেন বা জাল হওয়ার বিশ্বাস করার যুক্তিসংগত কারণ থাকা সত্ত্বেও সেটি অসৎ বা প্রতারণামূলকভাবে আসল হিসেবে ব্যবহার করেছেন—এমনটি প্রমাণিত হলে, যে ধরনের জালিয়াতির দলিল ব্যবহার করা হয়েছে, সেই অনুযায়ী জালিয়াতির জন্য নির্ধারিত শাস্তি প্রযোজ্য হতে পারে। <Link url=”https://bdlaws.minlaw.gov.bd/act-11/act-chapter-print-21.html” title=”দণ্ডবিধির দলিলসংক্রান্ত অপরাধ ও শাস্তির বিধান”/>।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোনো সনদ গ্রহণযোগ্য নয়, মেয়াদ বা যোগ্যতার সঙ্গে অসংগতি রয়েছে কিংবা প্রয়োজনীয় কাগজ দেখানো হয়নি—এসব বিষয় থেকেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফৌজদারি জালিয়াতি প্রমাণিত হয় না। জাল দলিল তৈরি বা জেনেশুনে ব্যবহারের প্রয়োজনীয় উপাদান তদন্তে প্রতিষ্ঠিত হতে হবে।
এ ছাড়া প্রতিটি সনদের ধরন অনুযায়ী আলাদা আইন বা বিধান প্রযোজ্য হতে পারে। সরকারি কর্মকর্তার পরিচয়ে জাল সনদ তৈরি, সাধারণ শিক্ষাগত সনদ জাল করা এবং কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত সনদকে ভুলভাবে ব্যবহার করার আইনি মূল্যায়ন এক নয়। তাই মামলার আগে সনদের উৎস ও প্রকৃতি শনাক্ত করা জরুরি।
চাকরি, এমপিও ও আর্থিক সুবিধার ক্ষেত্রে কী ব্যবস্থা হতে পারে?
যদি তদন্তে প্রমাণিত হয় যে কোনো শিক্ষক নিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতা পূরণ করেননি বা জাল সনদের ভিত্তিতে নিয়োগ কিংবা আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করেছেন, তাহলে সংশ্লিষ্ট নিয়োগবিধি, চাকরিবিধি এবং প্রযোজ্য এমপিও নীতিমালা অনুযায়ী প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রশ্ন উঠতে পারে।
পরিস্থিতি ও প্রযোজ্য বিধির ভিত্তিতে সম্ভাব্য ব্যবস্থার মধ্যে থাকতে পারে—
– কারণ দর্শানোর নোটিশ এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ প্রদান।
– সনদ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে সনদ যাচাই।
– নিয়োগের বৈধতা পুনর্মূল্যায়ন এবং বিধি অনুযায়ী নিয়োগ বাতিল বা চাকরিসংক্রান্ত ব্যবস্থা।
– এমপিওভুক্তির ক্ষেত্রে অনিয়ম প্রমাণিত হলে প্রযোজ্য বিধি অনুসারে এমপিও স্থগিত বা বাতিলের পদক্ষেপ।
– সরকারি অর্থ বা বেতন-ভাতা অবৈধভাবে গ্রহণের বিষয়টি প্রমাণিত হলে প্রযোজ্য আইন ও বিধি অনুসারে অর্থ পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ।
– জালিয়াতি বা প্রতারণার উপাদান পাওয়া গেলে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে ফৌজদারি তদন্ত ও মামলা দায়ের।
তবে এসব ব্যবস্থা প্রত্যেক অভিযোগে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হয় না। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিয়োগের ধরন, পদ, প্রযোজ্য বিধিমালা, আর্থিক সুবিধা গ্রহণের নথি এবং তদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এমপিওভুক্তি, চাকরির অবসান কিংবা অর্থ ফেরতের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আইনগত ক্ষমতা ও প্রযোজ্য বিধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।
বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্কুল ও কলেজের জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা-২০২৫ এবং প্রযোজ্য অন্যান্য বিধান এ ক্ষেত্রে পর্যালোচনা করা যেতে পারে। <Link url=”https://ntrca.gov.bd/pages/static-pages/698f3645e6af0a3d6f72350a” title=”সর্বশেষ জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা সংক্রান্ত সরকারি তথ্য”/>।
তদন্তে যেসব নথি যাচাই করা জরুরি
মেলান্দহের এ ঘটনা নিরপেক্ষভাবে নিষ্পত্তি করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সামনে কয়েকটি বিষয় বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করা প্রয়োজন।
প্রথমত, শাহ নাজ পারভীনের ২০১০ সালের নিয়োগের মূল নথি, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, নিয়োগ কমিটির কার্যবিবরণী এবং তখনকার প্রযোজ্য শিক্ষাগত যোগ্যতার শর্ত পরীক্ষা করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, দারুল এহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে দাখিল করা সনদ এবং সিট ফাউন্ডেশনের ২০১৩ সালের ডিপ্লোমা সনদের সত্যতা ও গ্রহণযোগ্যতা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই করতে হবে।
তৃতীয়ত, ২০১৩ সালের কোর্সের ভর্তি, উপস্থিতি, পরীক্ষায় অংশগ্রহণ ও ফলাফলের নথির সঙ্গে বিদ্যালয়ের হাজিরা খাতা, ছুটির রেকর্ড এবং বেতন উত্তোলনের তথ্য মিলিয়ে দেখতে হবে।
চতুর্থত, নাসিমা আক্তারের নিয়োগের সময় প্রয়োজনীয় যোগ্যতা কী ছিল, তিনি কী কী সনদ জমা দিয়েছিলেন এবং সাময়িক অব্যাহতির লিখিত আদেশে কী কারণ উল্লেখ করা হয়েছে, তা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
পঞ্চমত, গোলাম মোস্তফার বিরুদ্ধে অনিয়মিত উপস্থিতির অভিযোগ যাচাইয়ে বিদ্যালয়ের উপস্থিতি রেজিস্টার, শ্রেণি কার্যক্রমের রুটিন এবং সংশ্লিষ্ট রেকর্ড পরীক্ষা করতে হবে।
ষষ্ঠত, উচ্চতর স্কেল ও টাইম স্কেলের আবেদন পাঠানোর ক্ষেত্রে কোনো নিয়ম লঙ্ঘন হয়েছে কি না, তা নির্ধারণের জন্য আবেদন ও সংযুক্ত নথি যাচাই করা দরকার।
এ ধরনের নথিভিত্তিক তদন্তই অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
শিক্ষা প্রশাসনের কাছে স্থানীয়দের দাবি
স্থানীয়দের দাবি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়োগ ও শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে অভিযোগ উঠলে তা দীর্ঘদিন অনিষ্পন্ন রাখা উচিত নয়। সংশ্লিষ্ট সনদ দ্রুত যাচাই করে ফলাফল প্রকাশ এবং অনিয়ম প্রমাণিত হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
একই সঙ্গে অভিযোগের কারণে কোনো শিক্ষককে সামাজিকভাবে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত না করে তাঁকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে যেমন ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি, তেমনি অভিযোগ ভিত্তিহীন প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সুনাম ও পেশাগত অধিকার রক্ষাও গুরুত্বপূর্ণ।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছ নিয়োগ, যোগ্য শিক্ষক নির্বাচন এবং নিয়মিত পাঠদান নিশ্চিত করা শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। তাই এ ধরনের অভিযোগের নিষ্পত্তি কেবল ব্যক্তিবিশেষের বিষয় নয়; এটি প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও শিক্ষার মান বজায় রাখারও প্রশ্ন।
শেষ কথা: অভিযোগ নয়, নথিভিত্তিক তদন্তেই বেরিয়ে আসুক সত্য
মেলান্দহের আদ্রা আব্দুল মান্নান উচ্চ বিদ্যালয়ের দুই শিক্ষকের সনদ ও নিয়োগসংক্রান্ত অভিযোগের নিষ্পত্তি হওয়া প্রয়োজন নিরপেক্ষ, সময়সীমাবদ্ধ ও নথিভিত্তিক তদন্তের মাধ্যমে। বিশেষ করে শাহ নাজ পারভীনের সনদের সত্যতা, নাসিমা আক্তারের প্রয়োজনীয় যোগ্যতা এবং সংশ্লিষ্ট নিয়োগের বৈধতা যাচাই করে প্রশাসনের সুস্পষ্ট অবস্থান জানানো জরুরি।
একই সঙ্গে গোলাম মোস্তফার বিরুদ্ধে ওঠা উপস্থিতিসংক্রান্ত অভিযোগ তাঁর বক্তব্য ও বিদ্যালয়ের রেকর্ডের ভিত্তিতে যাচাই করতে হবে।
দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ মনে করে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোনো ধরনের অনিয়মের অভিযোগ থাকলে তা গোপন রাখা যেমন সমীচীন নয়, তেমনি যাচাইয়ের আগে কাউকে অপরাধী ঘোষণা করাও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রযোজ্য আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে; আর অভিযোগ প্রমাণিত না হলে তাঁদের অবস্থান পরিষ্কার করতে হবে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে প্রশ্ন: সনদ যাচাইয়ের আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে কি না, তদন্তের দায়িত্ব কাকে দেওয়া হয়েছে এবং তদন্তের ফলাফল কবে জানানো হবে?
এ বিষয়ে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট সনদ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের লিখিত বক্তব্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি হালনাগাদ করা হবে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও তাঁদের বক্তব্য, ব্যাখ্যা ও প্রামাণ্য নথি উপস্থাপন করতে পারবেন।