নিজস্ব প্রতিবেদক
দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ
আজ ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ১৯তম কারামুক্তি দিবস। বিএনপির নেতাকর্মীদের কাছে দিনটি একই সঙ্গে রাজনৈতিক সংগ্রাম, কারাবরণ, প্রতিকূলতা মোকাবিলা এবং দীর্ঘ প্রত্যাবর্তনের এক তাৎপর্যপূর্ণ স্মারক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিএনপি ও দলটির নেতাকর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়গুলোর একটি শুরু হয়েছিল ২০০৭ সালের ৭ মার্চ। সে সময়ের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও জরুরি অবস্থার প্রেক্ষাপটে বিএনপির তৎকালীন সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব তারেক রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়। ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট এলাকার বাসা থেকে ভোররাতে তাকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে নেওয়া হয়।
এরপর দীর্ঘ সময় তিনি কারাবন্দি ছিলেন। বিএনপির পক্ষ থেকে বরাবরই অভিযোগ করা হয়েছে, তারেক রহমানকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল এবং কারাবন্দি অবস্থায় তাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সময়ের সরকারি বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বক্তব্য এবং মামলাগুলোর আইনি নথিপত্রের আলোকে পৃথকভাবে যাচাইয়ের প্রয়োজন রয়েছে।
২০০৭ সালের ৭ মার্চ তারেক রহমানের গ্রেপ্তারের ঘটনা বাংলাদেশের রাজনীতিতে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। বিএনপির তৎকালীন সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে তিনি তখন দলের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছিলেন।
গ্রেপ্তারের পর তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের করা হয়। বিএনপি এসব মামলাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও ষড়যন্ত্রমূলক বলে দাবি করে আসছে। অন্যদিকে, তৎকালীন রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় তার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলো আইনগত প্রক্রিয়ার অংশ ছিল বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ছিল।
কারাবন্দিত্বের সময় তার শারীরিক অবস্থার অবনতি নিয়ে বিএনপি ও পরিবারের পক্ষ থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। পরবর্তীতে তার চিকিৎসা ও মুক্তির বিষয়টি দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে।
দীর্ঘ কারাবাসের পর ২০০৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর জামিনে মুক্তি পান তারেক রহমান। বিএনপির কাছে এই দিনটি পরবর্তীতে তারেক রহমানের কারামুক্তি দিবস হিসেবে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
জামিনে মুক্তির পর উন্নত চিকিৎসার জন্য তিনি যুক্তরাজ্যে যান। এরপর দীর্ঘ সময় তিনি দেশের বাইরে অবস্থান করেন। প্রবাসে থাকাকালীনও বিএনপির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড ও দলীয় রাজনীতিতে তার ভূমিকা অব্যাহত ছিল বলে দলটির নেতাকর্মীরা দাবি করে আসছেন।
তারেক রহমানের দীর্ঘ প্রবাসজীবন বিএনপির রাজনীতিতে একটি পৃথক অধ্যায়ের জন্ম দেয়। দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি বিভিন্ন সময়ে নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন এবং দলীয় নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন বলে বিএনপির পক্ষ থেকে জানানো হয়।
দীর্ঘ ১৭ বছরেরও বেশি সময় দেশের বাইরে থাকার পর ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশে ফেরেন তারেক রহমান। তার দেশে ফেরাকে ঘিরে বিএনপির নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়।
বিএনপির পক্ষ থেকে তার দেশে ফেরাকে রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে বর্ণনা করা হয়। দীর্ঘ প্রবাসজীবনের অবসান ঘটিয়ে দেশে ফেরার পর তারেক রহমানকে ঘিরে দলীয় রাজনীতিতে নতুন গতি তৈরি হয় বলে দলটির নেতাকর্মীরা মনে করেন।
দেশে ফেরার পর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় হন তিনি। দীর্ঘদিন পর সরাসরি দেশের রাজনৈতিক মাঠে তার উপস্থিতি বিএনপির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে নতুন মাত্রা যোগ করে।
এরপর ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে বলে বিএনপি দাবি করছে। নির্বাচনে জনগণ বিএনপিকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে এবং দলটি সরকার গঠন করেছে—এমনটাই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নির্বাচনের পর বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দীর্ঘ কারাবাস, প্রবাসজীবন এবং রাজনৈতিক প্রতিকূলতার পর দেশের সরকারপ্রধানের দায়িত্বে তার অভিষেককে বিএনপির নেতাকর্মীরা তার রাজনৈতিক জীবনের একটি ঐতিহাসিক পরিণতি হিসেবে দেখছেন।
বিএনপির নেতাকর্মীদের ভাষ্য, যে রাজনৈতিক নেতাকে একসময় কারাগারে বন্দি করা হয়েছিল, দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে থাকতে হয়েছিল এবং নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক পথ অতিক্রম করতে হয়েছিল, তিনিই পরবর্তীতে জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে দেশের সরকারপ্রধানের দায়িত্ব নিয়েছেন। তাদের কাছে এটি রাজনৈতিক সংগ্রাম ও ধৈর্যের একটি প্রতীকী উদাহরণ।
প্রতি বছর ৩ সেপ্টেম্বর বিএনপির নেতাকর্মীরা তারেক রহমানের কারামুক্তি দিবস পালন করে থাকেন। এ দিনটি দলের কাছে কেবল একজন নেতার কারামুক্তির স্মরণ নয়, বরং রাজনৈতিক প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে দীর্ঘ সংগ্রামের স্মারক হিসেবেও বিবেচিত হয়।
দলটির নেতাকর্মীরা মনে করেন, তারেক রহমানের রাজনৈতিক জীবনে কারাবাস একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক তৈরি করেছিল। সেই সময়ের পর তার চিকিৎসার জন্য বিদেশযাত্রা, দীর্ঘ প্রবাসজীবন, দলীয় নেতৃত্বে সক্রিয় থাকা এবং পরবর্তীতে দেশে প্রত্যাবর্তন—সব মিলিয়ে তার রাজনৈতিক পথচলা বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের আলোচিত অধ্যায় হয়ে উঠেছে।
তারেক রহমানের রাজনৈতিক জীবনের এই অধ্যায়কে সময়ের হিসেবে দেখলে কয়েকটি তারিখ বিশেষভাবে সামনে আসে। ২০০৭ সালের ৭ মার্চ গ্রেপ্তার, প্রায় ১৮ মাসের কারাবাসের পর ২০০৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর জামিনে মুক্তি, এরপর উন্নত চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্যে যাত্রা এবং দীর্ঘ প্রবাস শেষে ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর দেশে প্রত্যাবর্তন।
এরপর ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ তার রাজনৈতিক জীবনে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।
এই ধারাবাহিকতার কারণে ৩ সেপ্টেম্বর বিএনপির কাছে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ একটি দিন। দলটির নেতাকর্মীরা মনে করেন, কারাগার থেকে মুক্তির ১৯ বছর পর একই রাজনৈতিক নেতা এখন দেশের সরকারপ্রধানের দায়িত্ব পালন করছেন—যা তার রাজনৈতিক জীবনের নাটকীয় পরিবর্তনের একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত।
তারেক রহমানের কারামুক্তি দিবসে বিএনপির নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা, দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো আরও শক্তিশালী হবে এবং জনগণের ভোটাধিকার ও রাজনৈতিক অধিকার সুসংহত হবে। দলটির নেতাকর্মীরা তার নেতৃত্বে রাষ্ট্র পরিচালনায় সুশাসন, আইনের শাসন, জবাবদিহিতা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রত্যাশা ব্যক্ত করছেন।
তাদের মতে, দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের অভিজ্ঞতা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে রাষ্ট্র পরিচালনায় বাস্তব অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক শিক্ষা দিয়েছে। এখন সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে দেশ পরিচালনায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন—এমন প্রত্যাশা রয়েছে দলের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে।
তারেক রহমানের রাজনৈতিক জীবনকে ঘিরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে যেমন সমর্থন রয়েছে, তেমনি রয়েছে ব্যাপক বিতর্ক ও রাজনৈতিক মতপার্থক্য। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে মামলা ও অভিযোগের বিষয়ও রাজনৈতিক আলোচনার অংশ হয়েছে। বিএনপি এসবের অনেকগুলোকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে এসেছে।
তবে রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে তারেক রহমানের কারাবাস, মুক্তি, দীর্ঘ প্রবাসজীবন, দেশে প্রত্যাবর্তন এবং পরবর্তীতে সরকারপ্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ—এই ঘটনাপ্রবাহ বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি দীর্ঘ ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
আজ ৩ সেপ্টেম্বর সেই অধ্যায়েরই একটি বিশেষ দিন। ২০০৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর যে দিনে দীর্ঘ কারাবাসের পর জামিনে মুক্ত হয়েছিলেন তারেক রহমান, ১৯ বছর পর সেই দিনটি তিনি পালন করছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে।
কারাগারের বন্দিজীবন থেকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব—তারেক রহমানের রাজনৈতিক জীবনের এই দীর্ঘ পথচলা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের রাজনীতির সাম্প্রতিক ইতিহাসের একটি আলোচিত অধ্যায় হয়ে থাকবে।
দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ