বিশেষ আদালত ও আইন প্রতিবেদনসিলেট কার্যালয়:
সিলেট মহানগরীর শিবগঞ্জসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট ও দূরপাল্লার রুটগুলোতে অবৈধ এবং রেজিস্ট্রেশনবিহীন (অন-টেস্ট) সিএনজি চালিত অটোরিকশা চলাচলে ভয়াবহ চাঁদাবাজির চক্র গড়ে তোলার অভিযোগ উঠেছে। এই অবৈধ সিন্ডিকেটের নেপথ্যে কলকাঠি নাড়ানোর সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠেছে "সিলেট অটোটেম্পু অটোরিকশা শ্রমিক জোট ২০৯৭"-এর সভাপতি রমজান মিয়ার বিরুদ্ধে।
অভিযোগে প্রকাশ, রমজান মিয়া নিজের ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে অন-টেস্ট সিএনজি অটোরিকশা চলাচলের জন্য স্বাক্ষরবিহীন 'ভিজিটিং কার্ড' বা গোপন 'টোকেন' বাণিজ্য চালাচ্ছেন। এই টোকেন বা কার্ড দেখলেই নাকি অলৌকিকভাবে টহলরত পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাত থেকে রেহাই পায় অবৈধ যানবাহনগুলো। অন্যদিকে, টোকেন না থাকলে কিংবা নির্ধারিত অবৈধ চাঁদা না দিলে মুহূর্তের মধ্যেই গাড়ি সিজ (বাজেয়াপ্ত) কিংবা রেকার এনে ডাম্পিংয়ে পাঠানোর ভয় দেখানো হয়।
প্রতিদিন ৬০০-৭০০ টাকার টোকেন বাণিজ্য: পিষ্ট সাধারণ ড্রাইভার ও মালিক সমাজ
ভুক্তভোগী চালক ও মালিকদের দেওয়া তথ্যমতে, শিবগঞ্জসহ সংলগ্ন এলাকাগুলোতে অন-টেস্ট সিএনজি চালানোর বিনিময়ে প্রতিদিন প্রতিটি গাড়ি থেকে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা পর্যন্ত অবৈধ চাঁদা বা 'টোল' আদায় করা হচ্ছে।
একজন সাধারণ সিএনজি চালক দিনভর ঘাম ঝরিয়ে যেখানে ৬০০-৭০০ টাকা আয় করতে হিমশিম খান, সেখানে সেই আয়ের পুরো টাকাটাই যদি টোকেন বা চাঁদা বাবদ প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের পেটে চলে যায়, তবে দিন শেষে তাদের খালি হাতে ঘরে ফিরতে হয়। চালকেরা জানান:
গাড়ি জমা (মহাজন ভাড়া) পরিশোধ করা অসম্ভব হয়ে পড়ছে।
পরিবার-পরিজনের অন্নসংস্থান ও সন্তান-সন্তানাদির পড়াশোনা চালানো অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
চাঁদা না দিলে প্রভাবশালী চক্রের ইশারায় পুলিশ দিয়ে গাড়ি আটক ও হয়রানি করা হয়।
একজন শীর্ষ স্থানীয় শ্রমিক নেতার দায়িত্বে থেকে শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষা করার বদলে এমন শোষণ ও চাঁদাবাজিতে লিপ্ত হওয়া নিয়ে তীব্র নৈতিক প্রশ্ন উঠেছে সচেতন মহলে।
উপজেলা থেকে নগরীতে জালের মতো ছড়ানো সিন্ডিকেট
শুধু শিবগঞ্জ এলাকাতেই সীমাবদ্ধ নয়, সিলেট নগরীর বিভিন্ন পয়েন্টসহ সীমান্তবর্তী ও আশপাশের উপজেলা—জৈন্তাপুর, গোয়াইনঘাট, কানাইঘাট এবং তামাবিল প্রধান সড়কে প্রতিনিয়ত শত শত নম্বরবিহীন সিএনজি অটোরিকশা চলাচল করছে। এসব রুট ও পয়েন্টে চলাচলকারী অন-টেস্ট গাড়িগুলোর একটি বড় অংশই এই টোকেন সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে বাধ্য হয়ে অর্থ প্রদান করছে। এর ফলে একদিকে যেমন সড়কে শৃঙ্খলা বিনষ্ট হচ্ছে, তেমনি প্রশাসনিক নজরদারিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে।
আইনগত বিশ্লেষণ ও দণ্ডবিধির আওতা
আইন বিশেষজ্ঞ ও আদালত সংশ্লিষ্টদের মতে, সড়ক পরিবহন আইন এবং বাংলাদেশের প্রচলিত দণ্ডবিধি অনুযায়ী এই জাতীয় কর্মকাণ্ড কঠোর শাস্তিযোগ্য অপরাধ:
১. সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ অনুযায়ী অপরাধ:
রেজিস্ট্রেশন ব্যতীত যান চালানো (ধারা ৭২ ও ধারা ৯৯): অন-টেস্ট বা নম্বরবিহীন গাড়ি বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে রাস্তায় চালানো সম্পূর্ণ বেআইনি। এতে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।
অবৈধ টোকেন বা পারমিট বাণিজ্য (ধারা ৯৪ ও অন্যান্য সংক্রান্ত বিধি): কোনো ব্যক্তিবর্গ বা সংগঠন নিজ এখতিয়ারের বাইরে গিয়া ভুয়া টোকেন বা কার্ড ইস্যু করে গাড়ি চালানোর অনুমতি দিতে পারে না।
২. দণ্ডবিধি (Penal Code, 1860) অনুযায়ী অপরাধ:
ধারা ৩৮৪ (extortion / জোরপূর্বক চাঁদা আদায়): ভয়ভীতি দেখিয়ে, গাড়ি জব্দের হুমকিতে নিয়মিত টাকা আদায় করা একটি মারাত্মক অপরাধ। এই ধারায় অপরাধ প্রমাণিত হলে ৩ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে।
ধারা ৪২০ (Cheating / প্রতারণা): বেআইনি টোকেন ইস্যু করে প্রশাসনিক সুরক্ষার আশ্বাস দেওয়া ও অর্থ আত্মসাৎ করা প্রতারণার সামিল।
ধারা ১২০-খ (Criminal Conspiracy / অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র): একাধিক ব্যক্তি বা চক্র মিলে অবৈধ উপায়ে অর্থ আদায়ের জন্য এই আইনবিরোধী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করলে তা অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র হিসেবে গণ্য হয়।
নিশ্চিত সংবাদের ঘোষণা ও প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপের দাবি
সাধারণ শ্রমিক ও ভুক্তভোগী মালিক সমাজ এই চাঁদাবাজ ও সিন্ডিকেটের হাত থেকে নিষ্কৃতি পেতে সিলেটের স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় প্রশাসনের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন। তারা চান:
১. ঘটনার নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত কমিটি গঠন করা হোক।
২. ভুয়া টোকেন বা কার্ড বাণিজ্য এবং চাঁদাবাজির সাথে জড়িত রমজান মিয়াসহ মূল হোতাদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
৩. সিএনজি অটোরিকশা খাতকে সম্পূর্ণ দুর্নীতি ও চাঁদাবাজমুক্ত করে সাধারণ খেটে খাওয়া শ্রমিকদের অধিকার সুনিশ্চিত করা হোক।
উল্লেখ্য, এই সিন্ডিকেটের বিস্তৃত অপকর্মের তথ্য-প্রমাণ, ভুক্তভোগীদের চাঞ্চল্যকর বক্তব্য, অডিও-ভিডিও এবং দালিলিক প্রমাণাদি সহ বিস্তারিত অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদন আগামীতে জাতীয় দৈনিক " জাতীয় বিভিন্ন পেপারে " এবং এর অনলাইন পোর্টালে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হতে যাচ্ছে।