সিলেটে মুক্তিযোদ্ধাদের নামে বরাদ্দ প্লট ও খাস জমি দখলের অভিযোগ
অনুমোদন ছাড়া টিলা-পতিত ভূমি কাটা, কথিত স্ট্যাম্পে প্লট বেচাকেনা ও অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ; ‘হযরত শাহপরান (ওসমানী) মুক্তিযোদ্ধা আদর্শ গুচ্ছগ্রাম’ ঘিরে প্রশ্ন—প্রশাসনের জরুরি তদন্ত দাবি
সিলেট ব্যুরো
সিলেট নগরীর ৩৪ নম্বর ওয়ার্ডের শাহপরান থানাধীন খাদিমনগর ও বহর মৌজার বিভিন্ন সরকারি খাস ও বন্দোবস্তকৃত ভূমি নিয়ে নতুন করে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় সচেতন মহল ও কয়েকজন বীর মুক্তিযোদ্ধার অভিযোগ, বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নামে সরকার কর্তৃক বরাদ্দ দেওয়া প্লট, অবশিষ্ট সরকারি খাস জমি, পতিত সাইল ও টিলা শ্রেণির ভূমি ঘিরে একটি প্রভাবশালী মহল দীর্ঘদিন ধরে দখল, কথিত বেচাকেনা ও স্থাপনা নির্মাণের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, সংশ্লিষ্ট এলাকায় সরকারি খাস জমির অংশ বিশেষ আগে খাদিম চা বাগানের নামে লিজভুক্ত ছিল। পরবর্তী সময়ে সরকারি প্রক্রিয়ায় জমির একটি অংশ পৃথক করে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নামে বন্দোবস্ত দেওয়া হয়। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০০১ নম্বর দাগসহ অন্যান্য দাগের নির্দিষ্ট অংশে কোনো মুক্তিযোদ্ধাকে ৬ শতক, কাউকে ৪ শতক করে জমি বরাদ্দ দেওয়া হলেও অবশিষ্ট বড় একটি অংশ এখনও সরকারি খাস খতিয়ানে থাকার কথা।
কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, ওই সরকারি জমি এবং মুক্তিযোদ্ধাদের নামে বরাদ্দকৃত এলাকার বিভিন্ন অংশে বহিরাগত ও স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি দখল প্রতিষ্ঠা করছেন। কোথাও কথিত অনিবন্ধিত স্ট্যাম্প বা চুক্তির মাধ্যমে জমি হস্তান্তর ও বেচাকেনার অভিযোগ রয়েছে। আবার কোথাও টিলা কেটে, গাছপালা ও প্রাকৃতিক ভূমি নষ্ট করে পাকা দেয়াল ও ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে বলে দাবি স্থানীয়দের।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা সরকারি নথি, ভূমি রেকর্ড, বরাদ্দপত্র, লিজের শর্ত, দলিল এবং সরেজমিন তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। অভিযোগে যাদের নাম বা ভূমিকা স্থানীয়ভাবে উঠে এসেছে, তদন্তে দোষ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তাদের অপরাধী হিসেবে গণ্য করা যাবে না।
‘হযরত শাহপরান (ওসমানী) মুক্তিযোদ্ধা আদর্শ গুচ্ছগ্রাম’ ঘিরে অভিযোগ
স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সরকার বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানার্থে সংশ্লিষ্ট এলাকায় একটি নির্দিষ্ট নাম ও পরিচয়ের অধীনে প্লট বরাদ্দ দিয়ে গুচ্ছগ্রাম গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়। এলাকাটি স্থানীয়ভাবে ‘হযরত শাহপরান (ওসমানী) মুক্তিযোদ্ধা আদর্শ গুচ্ছগ্রাম’ নামে পরিচিত বলে দাবি করা হচ্ছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, সরকারি বরাদ্দের এই পরিচয়কে পাশ কাটিয়ে পরবর্তীতে বিভিন্ন ব্যক্তি ও গোষ্ঠী নিজেদের সুবিধামতো এলাকার নাম ব্যবহার করছেন। কোথাও ‘শান্তিনগর’, কোথাও ‘শান্তিনগর শান্তিবাগ কালাটিকর’সহ বিভিন্ন নাম ব্যবহার করে আবাসিক এলাকার পরিচিতি তৈরি করার চেষ্টা চলছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, সরকারি কোনো প্রকল্প বা মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বরাদ্দকৃত গুচ্ছগ্রামের নির্ধারিত পরিচয়ের বাইরে ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নিজেদের ইচ্ছামতো নতুন আবাসিক এলাকার নাম ব্যবহার করে জমি বেচাকেনা বা দখল কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারেন কি না।
এ বিষয়ে সিলেট জেলা প্রশাসন, সিলেট সিটি কর্পোরেশন এবং সংশ্লিষ্ট ভূমি প্রশাসনের স্পষ্ট বক্তব্য প্রয়োজন বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিকরা।
২০০১ নম্বর দাগ নিয়ে প্রশ্ন
স্থানীয়দের বক্তব্যে ২০০১ নম্বর দাগসহ একাধিক দাগের জমির কথা উঠে এসেছে। তাদের দাবি, সংশ্লিষ্ট দাগের একটি অংশ সরকারি খাস খতিয়ানে রয়েছে এবং নির্দিষ্ট অংশ বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নামে বন্দোবস্ত দেওয়া হয়েছিল।
কোন জমি কতটুকু সরকারি খাস, কতটুকু মুক্তিযোদ্ধাদের নামে বরাদ্দ, কতটুকু লিজভুক্ত এবং বর্তমানে কোন অংশ কার দখলে—তা নিয়ে স্পষ্টতা প্রয়োজন।
এ জন্য সংশ্লিষ্ট দাগগুলোর সিএস, এসএ, আরএস, বিএস ও সর্বশেষ খতিয়ান, নামজারি, বন্দোবস্তপত্র, লিজ দলিল এবং মাঠপর্যায়ের দখল পরিস্থিতি একসঙ্গে যাচাই করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
মুক্তিযোদ্ধাদের বরাদ্দপত্রের শর্ত নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন
অভিযোগকারীরা দাবি করছেন, বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নামে দেওয়া বরাদ্দ বা লিজের দলিলে জমি ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিভিন্ন শর্ত উল্লেখ ছিল।
তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সরকার নির্ধারিত রাজস্ব বা খাজনা পরিশোধ, নামজারি এবং নির্দিষ্ট নিয়মে জমি ব্যবহার করার শর্ত রয়েছে। একই সঙ্গে টিলা বা পাহাড় কাটার ক্ষেত্রে পরিবেশগত অনুমোদন এবং ঘরবাড়ি নির্মাণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতির বিষয়ও উল্লেখ রয়েছে বলে তারা দাবি করেছেন।
এছাড়া বরাদ্দকৃত প্লট অবাধে বিক্রি বা হস্তান্তর করা যাবে না—এমন শর্ত থাকার দাবিও করা হয়েছে।
যদি সংশ্লিষ্ট বরাদ্দপত্রে সত্যিই এমন নিষেধাজ্ঞা থাকে, তাহলে বরাদ্দকৃত প্লট কোনো ব্যক্তি তৃতীয় পক্ষের কাছে বিক্রি বা হস্তান্তর করেছেন কি না এবং সেই লেনদেন আইনগতভাবে বৈধ কি না—তা নথি যাচাই করে দেখা প্রয়োজন।
কথিত স্ট্যাম্পে প্লট হস্তান্তরের অভিযোগ
স্থানীয়দের অভিযোগ, কিছু প্লট ও জমি নিবন্ধিত দলিলের পরিবর্তে কথিত স্ট্যাম্প, চুক্তিপত্র বা অনিবন্ধিত কাগজের মাধ্যমে এক ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তির কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে।
আইনগতভাবে শুধু স্ট্যাম্পে লিখিত কোনো কাগজ দেখালেই স্থাবর সম্পত্তির মালিকানা সৃষ্টি হয় না। স্থাবর সম্পত্তির বিক্রয় ও বিক্রয়চুক্তির ক্ষেত্রে নিবন্ধনের বিধান রয়েছে। ফলে কোনো প্লট বা জমি কীভাবে হস্তান্তর হয়েছে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বৈধ মালিকানা ছিল কি না এবং সরকারি বরাদ্দের শর্ত ভঙ্গ হয়েছে কি না—এসব বিষয় তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।
মুক্তিযোদ্ধাদের সরলতার সুযোগ নেওয়ার অভিযোগ
স্থানীয়দের অভিযোগ, এলাকায় বসবাসরত কয়েকজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের পরিবারের সদস্যরা আর্থিকভাবে অসচ্ছল ও সামাজিকভাবে দুর্বল হওয়ায় তাদের সরলতার সুযোগ নিয়ে একটি প্রভাবশালী মহল বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
কোনো মুক্তিযোদ্ধা বা তার পরিবারের সদস্য প্রকৃতপক্ষে কোনো জমি বিক্রি বা হস্তান্তর করেছেন কি না, করলে কোন শর্তে করেছেন, তিনি জমির প্রকৃত মালিক ছিলেন কি না এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি বরাদ্দের শর্ত কী ছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর দলিল ও সরকারি রেকর্ড থেকেই পাওয়া সম্ভব।
তাই মুক্তিযোদ্ধাদের নাম ব্যবহার করে কেউ অবৈধভাবে জমি দখল বা বেচাকেনা করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা পরিবার যাতে হয়রানির শিকার না হয়, সেটিও নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে।
টিলা ও পতিত সাইল ভূমি ধ্বংসের অভিযোগ
জমি দখলের পাশাপাশি টিলা, সাইল ও পতিত শ্রেণির ভূমি কেটে সমতল করার অভিযোগও রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, বিভিন্ন স্থান থেকে আসা কিছু ব্যক্তি প্রথমে জমির ওপর দখল প্রতিষ্ঠা করছেন। এরপর মাটি কেটে জায়গা সমতল করে দেয়াল, ঘরবাড়ি বা ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে।
এভাবে চলতে থাকলে এলাকার প্রাকৃতিক ভারসাম্য, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ও পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
কোনো টিলা বা পাহাড় কাটা হয়েছে কি না, হলে কার অনুমতিতে হয়েছে এবং পরিবেশ অধিদপ্তর বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো ছাড়পত্র ছিল কি না—তা সরেজমিন তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সচেতন নাগরিকরা।
মসজিদ-মাদ্রাসা ও পঞ্চায়েত কমিটি নিয়েও প্রশ্ন
অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন জায়গা থেকে আসা কিছু ব্যক্তি স্থানীয়ভাবে পঞ্চায়েত বা বিভিন্ন কমিটি গঠন করে মসজিদ-মাদ্রাসা পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন। এসব ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের জমি, অর্থায়ন ও ব্যবস্থাপনার বিষয়ে স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, জমি কেনাবেচার ক্ষেত্রে কোনো কোনো কমিটিকে চাঁদা বা অর্থ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
তবে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বা কমিটির বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের হিসাব, জমির দলিল, কমিটির বৈধতা এবং অর্থ লেনদেনের নথি যাচাই করা প্রয়োজন।
সরকারি রাস্তা ও অবকাঠামো নিয়েও অভিযোগ
এলাকার রাস্তা উন্নয়নের কাজ নিয়ে স্থানীয়দের আরও অভিযোগ রয়েছে। তাদের দাবি, সিলেট সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগে সংশ্লিষ্ট এলাকায় রাস্তার কাজ চলমান থাকলেও প্রকল্পের মান, ব্যয়, কাজের পরিমাণ এবং সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
কিছু স্থানীয় ব্যক্তি প্রকল্পের প্রকৌশলী, ঠিকাদার বা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন।
তবে কোনো প্রকৌশলী বা ঠিকাদারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি বা অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ প্রমাণ করতে প্রকল্পের টেন্ডার নথি, কার্যাদেশ, বিল, পরিমাপ বই, কাজের মান এবং প্রকল্প ব্যয়ের হিসাব পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
প্রয়োজনে সিটি কর্পোরেশনের প্রকৌশল বিভাগ বা স্বাধীন কারিগরি টিম দিয়ে কাজের গুণগত মান যাচাই করা যেতে পারে।
আইন অনুযায়ী সরকারি খাস জমি দখলের শাস্তি
বাংলাদেশে ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩ অনুযায়ী বৈধ মালিকানা, আইনানুগ হস্তান্তর বা আদালতের আদেশ ছাড়া কোনো ব্যক্তি অন্যের বা সরকারি ভূমি দখলে রাখতে পারেন না।
সরকারি বা জনসাধারণের ব্যবহার্য ভূমিতে অবৈধভাবে দখল, প্রবেশ, স্থাপনা নির্মাণ কিংবা ভূমি, স্থাপনা, বৃক্ষ বা সীমানা চিহ্নের ক্ষতি করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আইনে সর্বোচ্চ ২ বছর কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।
অর্থাৎ অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হলে সরকারি খাস জমি দখল করে স্থাপনা নির্মাণকারীদের বিরুদ্ধে প্রযোজ্য আইনে মামলা ও শাস্তির সুযোগ রয়েছে।
সরকারি জমির শ্রেণি বা প্রকৃতি পরিবর্তন করলে শাস্তি
সরকারি স্বার্থযুক্ত বা জনসাধারণের ব্যবহার্য ভূমি অবৈধভাবে ভরাট করে তার শ্রেণি বা প্রকৃতি পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও ২০২৩ সালের ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনে সর্বোচ্চ ২ বছর কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।
তাই টিলা কেটে জমি সমতল করা, সরকারি জমির প্রকৃতি পরিবর্তন বা অবৈধভাবে স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ সত্য হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
জাল দলিল বা মিথ্যা কাগজ ব্যবহার হলে আরও কঠোর শাস্তির বিধান
কোনো ব্যক্তি যদি সরকারি বা অন্যের জমি নিজের বলে দেখানোর জন্য মিথ্যা দলিল তৈরি করেন, জাল দলিল ব্যবহার করেন অথবা প্রতারণার মাধ্যমে জমি বিক্রি করেন—তাহলে বিষয়টি শুধু ভূমি দখলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; ভূমি প্রতারণা ও জালিয়াতির অভিযোগও প্রযোজ্য হতে পারে।
ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩ অনুযায়ী ভূমি প্রতারণা ও ভূমি জালিয়াতির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৭ বছর কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।
আর প্রতারণা বা জালিয়াতির মাধ্যমে অর্থ বা সম্পত্তি হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগের ক্ষেত্রে দণ্ডবিধির সংশ্লিষ্ট ধারাও প্রযোজ্য হতে পারে।
অন্যের জমি নিজের নামে বিক্রির অভিযোগ প্রমাণিত হলে
কোনো ব্যক্তি নিজের মালিকানাধীন নয় এমন জমি নিজের বলে দাবি করে বিক্রি করলে বা নিজের মালিকানার অতিরিক্ত জমি হস্তান্তর করলে বিষয়টি গুরুতর ভূমি প্রতারণার পর্যায়ে যেতে পারে।
এ ধরনের অভিযোগ তদন্তে দলিলের উৎস, বিক্রেতার মালিকানা, খতিয়ান, নামজারি, দখল, ভূমি উন্নয়ন কর এবং রেজিস্ট্রি অফিসের তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন।
অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে ভূমি অপরাধ আইনসহ প্রযোজ্য অন্যান্য আইনে মামলা হতে পারে।
আদালতে মামলা করলেই মালিকানা সৃষ্টি হয় না
স্থানীয়দের অভিযোগের একটি অংশ হলো—কেউ কেউ বিভিন্ন মামলা-মোকদ্দমা করে দীর্ঘদিন ধরে জমির ওপর দখল বজায় রাখছেন।
আইনগতভাবে শুধু কোনো মামলা দায়ের করা বা কোনো ব্যক্তিকে বাদী-বিবাদী করা হলেই জমির মালিকানা চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় না। আদালতের আদেশ, রায়, সরকারি রেকর্ড ও বৈধ দলিলের ওপর ভিত্তি করে মালিকানা ও দখলের আইনগত অবস্থান নির্ধারিত হয়।
তাই সংশ্লিষ্ট জমি নিয়ে কোনো মামলা চলমান থাকলে সেই মামলার আরজি, আদেশ, নিষেধাজ্ঞা বা অন্যান্য আদালতের নির্দেশ যাচাই করা প্রয়োজন।
প্রশাসনের কাছে ১০ দফা দাবি
সচেতন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে কয়েকটি দাবি জানানো হয়েছে—
১. ২০০১ নম্বর দাগসহ সংশ্লিষ্ট সব দাগের সর্বশেষ খতিয়ান যাচাই করা।
২. বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নামে দেওয়া মূল বন্দোবস্ত ও লিজের কাগজপত্র পরীক্ষা করা।
৩. কোন প্লট বর্তমানে কার দখলে রয়েছে, তার তালিকা প্রস্তুত করা।
৪. কথিত স্ট্যাম্প ও অনিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে জমি হস্তান্তরের অভিযোগ তদন্ত করা।
৫. সরকারি খাস জমিতে অবৈধ স্থাপনা থাকলে আইন অনুযায়ী উচ্ছেদ করা।
৬. টিলা ও পাহাড় কাটার অভিযোগে পরিবেশ অধিদপ্তরের মাধ্যমে তদন্ত করা।
৭. সরকারি বরাদ্দের শর্ত ভঙ্গ করে কোনো প্লট বিক্রি বা হস্তান্তর করা হয়েছে কি না তা যাচাই করা।
৮. মুক্তিযোদ্ধাদের নাম ব্যবহার করে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী অবৈধ সুবিধা নিচ্ছে কি না তা তদন্ত করা।
৯. সিটি কর্পোরেশনের রাস্তা নির্মাণের প্রকল্পের ব্যয়, কাজের মান ও পরিমাপ যাচাই করা।
১০. তদন্তে অনিয়ম প্রমাণিত হলে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া।
জেলা প্রশাসকের হস্তক্ষেপ চায় সচেতন মহল
স্থানীয় সচেতন নাগরিক ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের দাবি, সিলেট জেলা প্রশাসনের নেতৃত্বে ভূমি প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর, সিলেট সিটি কর্পোরেশন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত করা হোক।
তদন্তের সময় শুধু বর্তমান দখল নয়, গত কয়েক দশকের জমির মালিকানা ও দখলের ধারাবাহিকতাও পরীক্ষা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।
বিশেষ করে সরকারি খাস খতিয়ান থেকে কোনো জমি কীভাবে ব্যক্তিগত দখলে গেল, মুক্তিযোদ্ধাদের নামে বরাদ্দ দেওয়া প্লট কীভাবে অন্যের হাতে গেল, কোনো প্লট লিজ বাতিল হয়ে থাকলে তার পরবর্তী অবস্থা কী এবং কথিত বেচাকেনা কোন দলিলের ভিত্তিতে হয়েছে—এসব প্রশ্নের উত্তর বের করা জরুরি।
প্রশাসনের বক্তব্যও জরুরি
এই প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে সিলেট জেলা প্রশাসন, সংশ্লিষ্ট সহকারী কমিশনার (ভূমি), উপজেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং সিলেট সিটি কর্পোরেশনের বক্তব্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে ২০০১ নম্বর দাগের জমির বর্তমান সরকারি রেকর্ড, মুক্তিযোদ্ধাদের নামে বরাদ্দের প্রকৃত পরিমাণ, লিজের শর্ত, লিজ বাতিলের কোনো ঘটনা, বর্তমান দখল পরিস্থিতি এবং অবৈধ স্থাপনা বা টিলা কাটার বিষয়ে প্রশাসনের কাছে কী তথ্য রয়েছে—তা প্রকাশ করা হলে জনমনে থাকা প্রশ্নের অনেকটাই পরিষ্কার হবে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনের পরবর্তী সংস্করণে যথাযথভাবে প্রকাশ করা হবে।
শেষ কথা
বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নামে বরাদ্দকৃত সরকারি জমি, সরকারি খাস ভূমি এবং পরিবেশগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ টিলা বা পতিত ভূমি নিয়ে যে অভিযোগগুলো উঠেছে, সেগুলো নিছক জমি বিরোধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এখানে একদিকে রয়েছে রাষ্ট্রীয় সম্পদ সংরক্ষণ ও মুক্তিযোদ্ধাদের অধিকার, অন্যদিকে রয়েছে ভূমি ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ সুরক্ষা এবং সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রশ্ন।
অভিযোগ সত্য হলে সরকারি জমি দখল, অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ, টিলা ধ্বংস কিংবা জালিয়াতির মাধ্যমে জমি বেচাকেনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রযোজ্য আইনে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে কোনো বৈধ বরাদ্দপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা বা তার পরিবার যেন অন্যায়ভাবে হয়রানি বা উচ্ছেদের শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করা প্রশাসনের দায়িত্ব।
তাই ২০০১ নম্বর দাগসহ সংশ্লিষ্ট সব দাগের সরকারি রেকর্ড, মুক্তিযোদ্ধাদের বরাদ্দপত্র, লিজের শর্ত, নামজারি, দলিল, মামলা এবং বর্তমান দখল সরেজমিনে যাচাই করে একটি পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এখন সময়ের দাবি।
সচেতন মহলের প্রত্যাশা, সিলেট জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করবে এবং প্রমাণ পাওয়া গেলে ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, পরিবেশ আইন, দণ্ডবিধি ও অন্যান্য প্রযোজ্য আইনে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।