সিলেট ব্যুরো
সিলেট সিটি কর্পোরেশনের ৩৪ নম্বর ওয়ার্ডের শাহপরান থানাধীন বহর মৌজার জে.এল. নম্বর ৭০-এর অন্তর্ভুক্ত সরকারি খাস জমি, লিজভুক্ত ভূমি ও টিলা শ্রেণির জমি নিয়ে দখল, বেচাকেনা ও কথিত সিন্ডিকেট কার্যক্রমের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ব্যক্তি ও গোষ্ঠী সরকারি খাস খতিয়ানভুক্ত জমির ওপর দখল প্রতিষ্ঠা করে তা কথিত স্ট্যাম্প, চুক্তিপত্র, মামলা-মোকদ্দমা কিংবা বিভিন্ন ধরনের কাগজপত্রের মাধ্যমে একে অন্যের কাছে হস্তান্তর ও বেচাকেনার চেষ্টা চালিয়ে আসছেন।
অভিযোগ রয়েছে, একসময় ভূমিহীন ও অভিবাসী পরিবারগুলোর বসবাসের জন্য ব্যবহৃত জমির একটি অংশ পরবর্তীতে প্রভাবশালী ব্যক্তি ও বিভিন্ন গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। সেখানে গড়ে ওঠে কথিত ‘আল-বারাকা গ্রিন সিটি’। এর পাশাপাশি পতিত টিলা ও ভূমির প্রকৃতি পরিবর্তন, মাটি কাটা, স্থাপনা নির্মাণ এবং জমি ভাগ-বণ্টনের অভিযোগও রয়েছে।
স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের প্রশ্ন—যে ভূমি সরকারি খাস খতিয়ানে থাকার দাবি করা হচ্ছে, সেই জমিতে ব্যক্তিমালিকানার দাবি কীভাবে তৈরি হলো? কারা এসব জমি বিক্রি করছেন? ক্রেতারা কোন দলিলের ভিত্তিতে জমি কিনছেন? আর সরকারি রেকর্ডের সঙ্গে কথিত এসব কাগজপত্রের সামঞ্জস্যই বা কতটুকু?
তবে অভিযোগে যেসব ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নাম এসেছে, তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আদালত বা তদন্তে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তাদের অপরাধী হিসেবে গণ্য করা যায় না। জমির প্রকৃত মালিকানা ও দখল নির্ধারণে সরকারি রেকর্ড, লিজের কাগজপত্র, নিবন্ধিত দলিল, নামজারি, আদালতের আদেশ এবং সরেজমিন তদন্ত প্রয়োজন।
স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বহর মৌজার ১৪২ নম্বর দাগে মোট প্রায় ৩৮ একর ৩৪ শতক ভূমি রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। তাদের ভাষ্য, এর একটি অংশ পূর্বে ফলবাগানের জন্য লিজ দেওয়া হয়েছিল।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, আনুমানিক ১৯৬৪ সালের দিকে আলাউদ্দিন, সুরাইয়া বেগম গং-এর নামে ফলবাগানের উদ্দেশ্যে প্রায় ৩০ একর জমির লিজ দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ওই লিজ বাতিল হয়ে জমি সরকারি খাস খতিয়ানে ফিরে আসে বলে দাবি স্থানীয়দের।
এরপর বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন পর্যায়ে ভূমি বন্দোবস্ত বা লিজ দেওয়ার বিষয়ও স্থানীয়দের বক্তব্যে উঠে এসেছে। আবার ভারত থেকে আসা মুজাহির বা পুনর্বাসিত পরিবারগুলোর জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ জমি বরাদ্দের কথাও বলা হচ্ছে।
এসব তথ্যের প্রকৃত সত্যতা নির্ধারণের জন্য ১৯৬৪ সালের লিজ নথি, লিজ বাতিলের আদেশ, পরবর্তী খাস খতিয়ান, বন্দোবস্তের কাগজপত্র এবং সংশ্লিষ্ট দাগের বর্তমান রেকর্ড যাচাই করা প্রয়োজন।
স্থানীয়দের দাবি, মুজাহির পরিবারগুলোর জন্য ৮ একর ৪ শতক জমি বরাদ্দ দেওয়া হলেও অবশিষ্ট প্রায় ৩০ একর ৩০ শতক ভূমি সরকারি খাস খতিয়ানে থাকার কথা।
যদি সরকারি রেকর্ডে সত্যিই ওই জমি খাস হিসেবে অন্তর্ভুক্ত থাকে, তাহলে পরবর্তী সময়ে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কীভাবে ওই জমির ওপর মালিকানা বা দখলের অধিকার দাবি করছে—এ প্রশ্নের উত্তর সরকারি ভূমি রেকর্ড থেকেই পাওয়া সম্ভব।
এ কারণে স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, ১৪২ নম্বর দাগসহ সংশ্লিষ্ট সব দাগের সিএস, এসএ, আরএস, বিএস/সর্বশেষ খতিয়ান, নামজারি, লিজ, বন্দোবস্ত এবং ভূমি উন্নয়ন করের রেকর্ড একসঙ্গে যাচাই করা হোক।
অভিযোগের কেন্দ্রে উঠে এসেছে ‘আল-বারাকা গ্রিন সিটি’ নামের একটি আবাসিক প্রকল্প বা এলাকা। স্থানীয়দের দাবি, সরকারি খাস খতিয়ানভুক্ত জমি এবং ভূমিহীন পরিবারদের বসবাসের জায়গাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সময় মামলা-মোকদ্দমা হয়েছে। পরবর্তীতে এসব বিরোধের সুযোগ নিয়ে জমির ওপর দখল প্রতিষ্ঠা ও ভাগ-বণ্টনের চেষ্টা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগে আইয়ুব আলী মুহুরী, উছমান গনী গংসহ কয়েকজনের নাম স্থানীয়ভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা হয়নি এবং তাদের বক্তব্য ছাড়া কোনো অভিযোগকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে না।
প্রকল্পটির জমির মালিকানা, অনুমোদন, ভূমির শ্রেণি, নকশা, ভূমি উন্নয়ন, আবাসিক প্রকল্প হিসেবে কোনো সরকারি অনুমতি রয়েছে কি না এবং সংশ্লিষ্ট জমির ওপর প্রকল্প পরিচালনার আইনগত অধিকার রয়েছে কি না—এসব বিষয় সরকারি নথির মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, একসময় ভূমিহীন পরিবারগুলো সংশ্লিষ্ট এলাকায় বসবাস করত। পরবর্তীতে জমি নিয়ে বিভিন্ন মামলা-মোকদ্দমা শুরু হলে সেই পরিবারগুলো নানা ধরনের হয়রানির শিকার হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভূমিহীন পরিবারের পক্ষে মামলা করা হলেও পরবর্তীতে মামলার বাদী-বিবাদী পক্ষের মধ্যে সমঝোতা বা পারস্পরিক যোগাযোগের মাধ্যমে জমির নিয়ন্ত্রণ অন্যদের হাতে চলে যায়।
এমন অভিযোগ সত্য হলে প্রশ্ন উঠতে পারে—মামলার প্রকৃত উদ্দেশ্য কী ছিল এবং মামলার ফল বা বিচারাধীন অবস্থাকে ব্যবহার করে কেউ ব্যক্তিগত বা বাণিজ্যিক সুবিধা নিয়েছে কি না।
তবে কোনো মামলা বিচারাধীন থাকলে আদালতের নথি, আদেশ ও পক্ষগুলোর অবস্থান যাচাই না করে তার উদ্দেশ্য সম্পর্কে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট ভূমির বিভিন্ন অংশ নিয়ে একাধিক মামলা হয়েছে এবং কোনো কোনো মামলা চলমান থাকা অবস্থাতেও জমির দখল, ভাগ-বণ্টন কিংবা কথিত বেচাকেনা অব্যাহত রয়েছে।
ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩-এ ভূমি সংক্রান্ত প্রতারণা ও জালিয়াতির বিষয়ে পৃথক বিধান রয়েছে। আইনের ৪ ধারায় অন্যের বা নিজের মালিকানার অতিরিক্ত ভূমি ক্ষমতা ছাড়া হস্তান্তর, মিথ্যা বিবরণযুক্ত দলিল এবং কর্তৃপক্ষকে মিথ্যা তথ্য দেওয়াকে ভূমি প্রতারণার আওতায় আনা হয়েছে; এসব অপরাধে সর্বোচ্চ ৭ বছর কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।
একই আইনের ৫ ধারায় মিথ্যা দলিল প্রস্তুত, জাল দলিল বা দলিলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ প্রতারণামূলকভাবে পরিবর্তনের মতো কর্মকাণ্ডকে ভূমি জালিয়াতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে, যার জন্য সর্বোচ্চ ৭ বছর কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।
ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩-এর ৭ ধারায় বলা হয়েছে, সর্বশেষ কার্যকর খতিয়ান মালিকানা, আইনানুগ হস্তান্তর বা আদালতের আদেশের মাধ্যমে মালিকানা বা দখলের অধিকার না থাকলে কোনো ব্যক্তি ভূমি নিজের দখলে রাখতে পারবেন না। বিধান লঙ্ঘন করলে সর্বোচ্চ ২ বছর কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড হতে পারে।
আর সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান বা জনসাধারণের ব্যবহার্য ভূমি অবৈধভাবে দখল, প্রবেশ, স্থাপনা নির্মাণ বা ভূমি/স্থাপনা/বৃক্ষ/সীমানা চিহ্ন ক্ষতিসাধনের ক্ষেত্রেও ২০২৩ সালের আইনের ১১ ধারায় সর্বোচ্চ ২ বছর কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।
একই আইনের ১২ ধারায় সরকারি স্বার্থযুক্ত বা জনসাধারণের ব্যবহার্য ভূমি অবৈধভাবে ভরাট করে শ্রেণি বা প্রকৃতি পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও সর্বোচ্চ ২ বছর কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্ট্যাম্প বা কথিত চুক্তিপত্রের মাধ্যমে সরকারি খাস বা লিজভুক্ত জমি বেচাকেনা।
আইন অনুযায়ী স্থাবর সম্পত্তি বিক্রয়ের ক্ষেত্রে নিবন্ধিত দলিলের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। Transfer of Property Act, 1882-এর ৫৪ ধারায় স্থাবর সম্পত্তির বিক্রয় নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে সম্পন্ন হওয়ার বিধান রয়েছে। একই আইনের ৫৪A ধারায় স্থাবর সম্পত্তির বিক্রয়চুক্তিও লিখিত ও নিবন্ধিত হওয়ার বিধান রয়েছে।
অন্যদিকে Registration Act, 1908-এর ১৭A ধারাতেও স্থাবর সম্পত্তির বিক্রয়চুক্তি লিখিত, সম্পাদিত ও নিবন্ধিত হওয়ার বিধান রয়েছে। ২০২৬ সালে এই ধারার নিবন্ধনের সময়সীমা ৩০ দিন থেকে ৬০ দিনে পরিবর্তিত হয়েছে।
ফলে কোনো ব্যক্তি শুধু কথিত দখল, স্ট্যাম্প বা অনিবন্ধিত কাগজের ভিত্তিতে সরকারি খাস জমিকে নিজের সম্পত্তি হিসেবে বিক্রি করেছেন কি না—তা তদন্তের বিষয়। কাগজ থাকলেই মালিকানা প্রমাণিত হয় না; সংশ্লিষ্ট সরকারি রেকর্ড ও আইনগত স্বত্ব যাচাই প্রয়োজন।
ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩-এর ৬ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো দলিল বা তথ্য ভূমি প্রতারণা বা জালিয়াতির মাধ্যমে তৈরি হয়েছে বলে যুক্তিসঙ্গত কারণ থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি উপযুক্ত ফৌজদারি আদালতে পাঠাতে পারে। একই আইনে এমন ব্যক্তির ভূমি বিক্রয়, দান, হেবা, পাওয়ার অব অ্যাটর্নি বা দলিল রেজিস্ট্রেশনের ওপর বিধিনিষেধ রয়েছে যার নামে সর্বশেষ খতিয়ান নেই এবং হালনাগাদ ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের প্রমাণও নেই—আইনে নির্ধারিত ব্যতিক্রম সাপেক্ষে।
এ ছাড়া প্রতারণার উদ্দেশ্যে মিথ্যা দলিল তৈরি বা ব্যবহার করলে Penal Code, 1860-এর forgery সংক্রান্ত বিধানও প্রযোজ্য হতে পারে। দণ্ডবিধির ৪৬৩ ধারায় জালিয়াতির সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
প্রতারণার মাধ্যমে সম্পত্তি বা অর্থ আদায়ের অভিযোগ প্রমাণিত হলে দণ্ডবিধির ৪২০ ধারাও প্রযোজ্য হতে পারে; এ ধারায় সর্বোচ্চ ৭ বছর কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।
ভূমি নিয়ে বিরোধের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—অবৈধ দখল এবং দলিল জালিয়াতি একই বিষয় নয়।
কেউ সরকারি জমি দখল করে থাকলে তার বিরুদ্ধে ভূমি অপরাধ আইনের সংশ্লিষ্ট ধারা প্রযোজ্য হতে পারে। আবার কেউ যদি মিথ্যা দলিল তৈরি করে মালিকানা দাবি বা বিক্রি করে থাকেন, তাহলে ভূমি প্রতারণা ও জালিয়াতির পৃথক অভিযোগ হতে পারে।
এ কারণে শুধু উচ্ছেদ অভিযান নয়, জমির কাগজপত্রের ফরেনসিক ও রেকর্ডভিত্তিক যাচাই প্রয়োজন।
স্থানীয়দের দাবি, সংশ্লিষ্ট এলাকায় সরকারি খাস জমির ওপর বিভিন্ন স্থাপনা ও ঘরবাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে। কোথাও টিলা কেটে জায়গা সমতল করে স্থাপনা তৈরির অভিযোগও রয়েছে।
২০২৩ সালের ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনের ১৪ ধারায় সরকারি স্বার্থযুক্ত ভূমিতে অবৈধ দখল, স্থাপনা বা প্রতিবন্ধকতা থাকলে জেলা প্রশাসক তা অপসারণ এবং ভূমিকে পূর্বের শ্রেণি বা প্রকৃতিতে পুনরুদ্ধারের উদ্দেশ্যে ব্যবস্থা নিতে পারেন।
তাই স্থানীয়দের দাবি, সংশ্লিষ্ট দাগগুলোতে সরেজমিন জরিপ করে সরকারি জমিতে অবৈধ স্থাপনা থাকলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
এলাকায় টিলা ধ্বংস ও ভূমির প্রকৃতি পরিবর্তনের অভিযোগও উঠেছে। এ অভিযোগ সত্য হলে শুধু ভূমি আইন নয়, পরিবেশগত আইনও প্রযোজ্য হতে পারে।
বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে অনুমোদন ছাড়া পাহাড় বা টিলা কাটা নিষিদ্ধ এবং সংশ্লিষ্ট পরিবেশ আইন ও বিধান অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
এছাড়া সরকারি ভূমির শ্রেণি পরিবর্তন বা অবৈধ ভরাটের ক্ষেত্রেও ২০২৩ সালের ভূমি অপরাধ আইনে শাস্তির বিধান রয়েছে।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, ভূমি দখলকে টিকিয়ে রাখতে কখনো ভূমিহীন পরিবারের নাম, কখনো মুজাহির পরিবারের নাম এবং কখনো অন্য পক্ষকে বাদী-বিবাদী করে মামলা করা হচ্ছে।
এমন অভিযোগের সত্যতা থাকলে প্রতিটি মামলার নথি পর্যালোচনা করা জরুরি। কে বাদী, কে বিবাদী, জমির দাগ নম্বর কী, মামলার আরজি কী বলছে, আদালত কোনো অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ দিয়েছেন কি না এবং সেই আদেশের ভিত্তিতে দখল বা স্থাপনা পরিবর্তন করা হয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর বের করতে হবে।
শুধু মামলা দায়ের হয়েছে বলেই কোনো ব্যক্তি জমির মালিক হয়ে যান না। আদালতের চূড়ান্ত রায় বা বৈধ দলিল ও সরকারি রেকর্ডের ভিত্তিতে মালিকানা নির্ধারণ করতে হয়।
সচেতন নাগরিকদের মূল দাবি, সংশ্লিষ্ট জমির দখল ইতিহাস অনুসন্ধান করা হোক।
তাদের প্রশ্ন—কোন পরিবার কখন এখানে বসবাস শুরু করেছে, কে ভূমিহীন হিসেবে তালিকাভুক্ত ছিল, কার নামে সরকারি বরাদ্দ ছিল, কখন কার কাছে দখল হস্তান্তর হয়েছে, কোন দলিলের মাধ্যমে হয়েছে, সেই দলিল নিবন্ধিত কি না এবং সরকারি রেকর্ডে তার প্রতিফলন আছে কি না—এসব তথ্য প্রকাশ করা হোক।
একটি পূর্ণাঙ্গ দখল-ইতিহাস তৈরি হলে প্রকৃত মালিকানা ও কথিত দখল-বাণিজ্যের চিত্র অনেকটাই স্পষ্ট হতে পারে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এসব কর্মকাণ্ড চললেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্থায়ী ও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
তবে প্রশাসন আদৌ কী কী অভিযান পরিচালনা করেছে, কতটি মামলা হয়েছে, কতটুকু সরকারি জমি উদ্ধার হয়েছে এবং বর্তমানে কী ব্যবস্থা চলমান—এসব তথ্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে জানা জরুরি।
প্রশাসনের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ প্রমাণ করতে হলে নির্দিষ্ট নথি, অভিযোগপত্র, তদন্ত প্রতিবেদন ও সরকারি কার্যক্রমের রেকর্ড প্রয়োজন। তাই এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য নেওয়াও জরুরি।
২০২৩ সালের ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনের অধীনে ভূমি প্রতারণা ও ভূমি জালিয়াতির অপরাধে সর্বোচ্চ ৭ বছর কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড হতে পারে। অবৈধ দখল এবং সরকারি স্বার্থযুক্ত ভূমিতে অবৈধ দখল বা স্থাপনা নির্মাণের মতো অপরাধে সর্বোচ্চ ২ বছর কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।
আইনটির ১৬ ধারায় অপরাধ সংঘটনে সহায়তা বা প্ররোচনার ক্ষেত্রেও প্রকৃত অপরাধীর সমপরিমাণ দণ্ডের বিধান রয়েছে। একই অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে পুনরায় অপরাধ করলে ১৭ ধারায় আগের নির্ধারিত দণ্ডের দ্বিগুণ পর্যন্ত শাস্তির বিধান রয়েছে।
আইনের ১৯ ধারায় এ আইনের অধীন অপরাধগুলো আমলযোগ্য বলা হয়েছে এবং ৪ ও ৫ ধারার অপরাধকে অ-জামিনযোগ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে; বিচার প্রথম শ্রেণির জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে হওয়ার বিধান রয়েছে।
তবে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কোন ধারা প্রযোজ্য হবে এবং কী শাস্তি হবে—তা নির্ভর করবে তদন্তে প্রমাণিত নির্দিষ্ট অপরাধের ধরন ও আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর।
স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা সিলেট জেলা প্রশাসকের সরাসরি নজরদারিতে বহর মৌজার সংশ্লিষ্ট ভূমি নিয়ে বিশেষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
তাদের দাবিগুলো হলো—
সংশ্লিষ্ট সব দাগের সর্বশেষ সরকারি খতিয়ান যাচাই করা।
লিজ ও বন্দোবস্তের মূল নথি পরীক্ষা করা।
পুরোনো লিজ বাতিলের নথি থাকলে তা যাচাই করা।
বর্তমান দখলদারদের বৈধতার কাগজপত্র পরীক্ষা করা।
কথিত স্ট্যাম্প ও বেচাকেনার কাগজপত্র যাচাই করা।
মামলা-মোকদ্দমার নথি পর্যালোচনা করা।
টিলা বা ভূমির শ্রেণি পরিবর্তনের অভিযোগ তদন্ত করা।
অবৈধ স্থাপনা থাকলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া।
সরকারি জমি উদ্ধার করে সরকারি রেকর্ড অনুযায়ী সংরক্ষণ করা।
এবং কোনো কর্মকর্তা বা প্রভাবশালী ব্যক্তি অনিয়মে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধেও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া।
বহর মৌজার সরকারি খাস জমি নিয়ে স্থানীয়দের উত্থাপিত অভিযোগগুলো শুধু একটি জমি বিরোধের বিষয় নয়; এর সঙ্গে সরকারি সম্পত্তি, ভূমি ব্যবস্থাপনা, ভূমিহীন মানুষের অধিকার, দলিলের বৈধতা এবং পরিবেশ সংরক্ষণের প্রশ্নও জড়িত।
অভিযোগগুলো সত্য হলে দীর্ঘদিন ধরে সরকারি সম্পদ বেহাত হওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন। আবার কোনো অভিযোগের পেছনে যদি ব্যক্তিগত বিরোধ, ভুল রেকর্ড বা মালিকানা নিয়ে জটিলতা থাকে, সেটিও সরকারি নথি ও আদালতের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া দরকার।
তাই ব্যক্তিবিশেষকে দায়ী করার পরিবর্তে ১৪২ নম্বর দাগসহ সংশ্লিষ্ট সব দাগের সরকারি রেকর্ড, লিজ নথি, বন্দোবস্ত, দলিল, নামজারি, মামলা এবং বর্তমান দখল সরেজমিনে যাচাই করে একটি পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এখন সময়ের দাবি।
স্থানীয় সচেতন মহলের প্রত্যাশা, সিলেট জেলা প্রশাসন বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করবে এবং সরকারি খাস জমি অবৈধভাবে দখল বা বিক্রির অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩সহ প্রযোজ্য অন্যান্য আইনে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। একই সঙ্গে বৈধ অধিকারসম্পন্ন কোনো ব্যক্তি বা ভূমিহীন পরিবার যেন অন্যায়ভাবে উচ্ছেদ বা হয়রানির শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করা হবে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য: অভিযোগে যাদের নাম এসেছে, তাদের বক্তব্য এই প্রতিবেদনের প্রকাশের আগে পাওয়া গেলে তা যথাযথভাবে সংযোজন করা হবে। একইভাবে সিলেট জেলা প্রশাসন, সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিস, শাহপরান থানা, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং অন্যান্য কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনের পরবর্তী সংস্করণে তা প্রকাশ করা হবে।