বদলি আদেশ তুচ্ছ করে ৫৩ দিন ধরে ঢাকায় ‘মিশন ডার্কনেস’ | দালাল হাদীর মাধ্যমে উপদেষ্টাকে ম্যানেজ করার দুঃসাহস
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা | ৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
গণপূর্ত অধিদপ্তরের একচ্ছত্র অধিপতি ও দুর্নীতির ‘বরপুত্র’ হিসেবে পরিচিত নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ সাজেদুল ইসলামের দাপটে থরথর কম্পমান পুরো অধিদপ্তর। গত ১৪ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে তাকে পাবনায় বদলি করা হলেও সরকারের সেই আদেশকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ৫৩ দিন ধরে তিনি ঢাকায় অবস্থান করছেন। অভিযোগ উঠেছে, ৩ কোটি টাকার একটি বিশাল ‘ঘুষ ফান্ড’ নিয়ে তিনি মাঠে নেমেছেন নিজের বদলি ঠেকাতে। সাধারণ মানুষের প্রশ্ন—একটি সুশৃঙ্খল দপ্তরে একজন কর্মকর্তা কীভাবে মাসের পর মাস বদলি আদেশ অমান্য করার দুঃসাহস দেখান?
৩ কোটি টাকার ‘ঘুষ চুক্তি’ ও নেপথ্যের কারিগর
নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, সাজেদুল ইসলাম তার বদলি আদেশ বাতিল করে ঢাকায় প্রভাবশালী কোনো দপ্তরে পদায়ন পেতে ‘হাদী’ নামক এক কুখ্যাত দালালের সাথে ৩ কোটি টাকার চুক্তি করেছেন। এই হাদী নিজেকে বর্তমান প্রশাসনের প্রভাবশালীদের আশীর্বাদপুষ্ট দাবি করে বেড়াচ্ছেন। সাজেদুলের দম্ভোক্তি এখন গণপূর্তের অলিতে-গলিতে ঘুরছে—“টাকা থাকলে আইন আমার পকেটে থাকে, কোনো উপদেষ্টা আমার বদলি ঠেকাতে পারবে না।” দালালের আশ্বাসে পাবনায় যোগ না দিয়ে তিনি প্রতিদিন ঢাকার গোপন আস্তানায় বসে বদলি বাণিজ্যের ছক আঁকছেন।
সাড়ে ৩ হাজার কোটির লুণ্ঠন: যেভাবে গড়েছেন সম্পদের পাহাড়
ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকারের আমলে জনৈক নারী প্রতিমন্ত্রীর সাথে ‘বিশেষ সম্পর্কের’ দোহাই দিয়ে সাজেদুল ইসলাম গণপূর্তে এক অঘোষিত ‘স্বৈরতন্ত্র’ কায়েম করেছিলেন। তার দুর্নীতির খতিয়ান রীতিমতো আঁতকে ওঠার মতো:
কমিশন রাজ: প্রায় ৩,৫০০ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পের টেন্ডার এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছেন তিনি। প্রতিটি কাজ থেকে ১০-১৫% হারে শত শত কোটি টাকা কমিশন হিসেবে পকেটে পুরেছেন।
বেনামী সাম্রাজ্য: সরকারি বিধিনিষেধের তোয়াক্কা না করে নিজের ও নিকটাত্মীয়দের নামে একাধিক ঠিকাদারি লাইসেন্স খুলে নিজেই কাজ নিয়েছেন এবং সরকারি কোষাগারের টাকা লুট করেছেন।
রাজনৈতিক ত্রাস: সাবেক সেই নারী এমপির ক্ষমতা ব্যবহার করে সৎ ও যোগ্য প্রকৌশলীদের ওএসডি (OSD) করা বা ঢাকার বাইরে পাঠিয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে একছত্র আধিপত্য বজায় রাখতেন।
“সাজেদুল ইসলামের মতো মাফিয়াদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে ছাত্র-জনতার বিপ্লবের চেতনা ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। তাকে অবিলম্বে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নেওয়া প্রয়োজন।” — নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গণপূর্তের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা
প্রশাসনের জন্য লিটমাস টেস্ট: শাস্তি কী হওয়া উচিত?
সাজেদুল ইসলামের অপরাধ কেবল প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গ নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য বিদ্রোহ। বিশেষজ্ঞরা তার জন্য নিচের শাস্তিসমূহ দাবি করছেন:
১. চাকরি থেকে স্থায়ী বহিষ্কার (Dismissal): সরকারি আদেশ ৫৩ দিন ধরে অমান্য করায় তাকে অনতিবিলম্বে চাকরিচ্যুত করে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। ২. সম্পদ বাজেয়াপ্ত ও দুদকের মামলা: গত ১৫ বছরে অর্জিত তার কয়েকশ কোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দিতে হবে। ৩. দালাল চক্রের বিচার: ৩ কোটি টাকার বদলি বাণিজ্যের সাথে জড়িত দালাল হাদী ও তার সহযোগীদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনতে হবে। ৪. দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা: লুণ্ঠিত অর্থ পাচারের উদ্দেশ্যে যেকোনো সময় তিনি পালিয়ে যেতে পারেন, তাই জরুরি ভিত্তিতে তার পাসপোর্ট জব্দ করা প্রয়োজন।
বিপ্লবোত্তর বাংলাদেশে এ কেমন ধৃষ্টতা?
শহীদদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার কার্যক্রমকে চ্যালেঞ্জ করার নামান্তর সাজেদুলের এই ‘মিশন ডার্কনেস’। যদি টাকার জোরে একজন চিহ্নিত দুর্নীতিবাজ তার বদলি আদেশ বাতিল করতে সক্ষম হয়, তবে তা হবে বর্তমান প্রশাসনের জন্য এক বড় পরাজয়। সচেতন নাগরিক সমাজের দাবি, এই ‘লুটপাটের ডন’-কে রক্ষায় প্রশাসনের ভেতরে থাকা যে সকল ‘আগাছা’ মদত দিচ্ছে, তাদেরও চিহ্নিত করার সময় এসেছে।
স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন: গণপূর্তে সাজেদুল সিন্ডিকেটের ‘রাজ্য বনাম টাকা’ যুদ্ধ!
৩ কোটির মিশন বনাম রাষ্ট্র: লুণ্ঠিত ৩,৫০০ কোটির হিসাব চাই!
বিপ্লবোত্তর বাংলাদেশে এক চরম ধৃষ্টতা! নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ সাজেদুল ইসলাম গত ১৪ অক্টোবর ২০২৫-এর বদলি আদেশ তুচ্ছজ্ঞান করে ৫৩ দিন ধরে কর্মস্থলে অনুপস্থিত। দালালের মাধ্যমে ৩ কোটি টাকার ঘুষ লেনদেনের যে ‘মিশন’ তিনি শুরু করেছেন, তা সরাসরি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত।
১. দুর্নীতির মহাকাব্য: ৩,৫০০ কোটি টাকার কমিশন রাজ
বিগত ফ্যাসিস্ট আমলে সাজেদুল ইসলাম গণপূর্তের ‘ইএম বিভাগ’কে নিজের ব্যক্তিগত জমিদারি বানিয়েছিলেন। সাবেক এক নারী প্রতিমন্ত্রীর প্রভাব ব্যবহার করে তিনি যা করেছেন:
টেন্ডার মনোপলি: ৩,৫০০ কোটি টাকার মেগা প্রজেক্টের কার্যাদেশ শুধু তার মনোনীত সিন্ডিকেটকে দেওয়া হয়েছে।
কমিশন বাণিজ্য: প্রতিটি প্রকল্প থেকে ১০-১৫% হারে কমপক্ষে ৩৫০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
বেনামী ব্যবসা: নিজ পরিবার ও শ্যালক-ভাইদের নামে ৫টি ঠিকাদারি ফার্ম খুলে নিজেই নিজেকে কাজ পাইয়ে দিতেন।
২. আইনি ধারায় শাস্তির ব্লু-প্রিন্ট (প্রশাসন ও বিচার বিভাগের করণীয়)
সাজেদুল ইসলামের বর্তমান অবস্থান এবং অতীত অপকর্মের জন্য বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী নিচের শাস্তিগুলো কার্যকর হওয়া অনিবার্য:
ক. প্রশাসনিক শাস্তি (Service Rules):
চাকরি থেকে স্থায়ী বরখাস্ত: ‘সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮’ এর ধারা ৩(খ) অনুযায়ী অসদাচরণ এবং ৩(গ) অনুযায়ী পলায়নের দায়ে তাকে সরাসরি Dismissal From Service করতে হবে। ৫৩ দিন কর্মস্থলে না যাওয়া ‘পলায়ন’ হিসেবে গণ্য।
পেনশন ও সুবিধা বাতিল: দুর্নীতি প্রমাণিত হলে তার সকল অবসরকালীন সুবিধা বাজেয়াপ্ত করার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
খ. ফৌজদারি ও দুর্নীতি দমন আইন (Criminal & ACC Law):
দণ্ডবিধি ১৬১/১৬৫ ধারা: সরকারি কাজে বাধা দান এবং ঘুষের লেনদেনের চেষ্টার দায়ে সর্বোচ্চ ৭ বছর কারাদণ্ড।
দুদক আইন ২০০৪ (২৬/২৭ ধারা): ৩,৫০০ কোটি টাকার উৎসের ব্যাখ্যা দিতে না পারলে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের দায়ে ১০ বছর সশ্রম কারাদণ্ড এবং অর্জিত সকল স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ বাজেয়াপ্ত (Confiscation)।
মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন: লুণ্ঠিত অর্থ বিদেশে পাচার করে থাকলে এই আইনের অধীনে তার সম্পত্তি ক্রোক করা সম্ভব।
৩. বিশেষ দাবি: ‘দালাল হাদী’ ও অন্তরালের কুশীলব
সাজেদুল যে ৩ কোটি টাকা নিয়ে ‘হাদী’ নামক দালালের মাধ্যমে উপদেষ্টাকে ম্যানেজ করার দুঃসাহস দেখাচ্ছেন, তা দণ্ডবিধির ১১২ ধারা (অপরাধে সহায়তা) অনুযায়ী দণ্ডনীয়। এই হাদী সিন্ডিকেটকে রিমান্ডে নিলে গণপূর্তের আরও অনেক গভীর দুর্নীতির গোমর ফাঁস হবে।
সম্পাদকীয় মন্তব্য: এটি প্রশাসনের লিটমাস টেস্ট
যদি এই সাজেদুল ইসলাম ৩ কোটি টাকার বিনিময়ে পাবনার বদলি বাতিল করে ঢাকাতেই বহাল থাকতে পারেন, তবে বুঝতে হবে—ফ্যাসিবাদ বিদায় নিলেও তাদের ‘টাকার তখত’ এখনো ভাঙেনি। ৫৩ দিন পলাতক থাকার পরও তাকে গ্রেফতার না করা প্রশাসনের বড় ব্যর্থতা।
“সাজেদুল ইসলামের ক্যারিয়ারের মৃত্যু (Death of Career) কেবল সময়ের ব্যাপার হওয়া উচিত, যেন ভবিষ্যতে কোনো প্রকৌশলী রাষ্ট্রকে চ্যালঞ্জ করার সাহস না পায়।”
তদন্ত চলছে... আগামী সংখ্যায় দেখুন: সাজেদুলের সেই রহস্যময়ী নারী এমপি কে? দুবাই ও কানাডায় সাজেদুলের সম্পদের গোপন খতিয়ান!