সাংবাদিক তুহিন হত্যাকাণ্ড: বিচারহীনতার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদে উত্তাল রাজধানী
বিশ্লেষণধর্মী রিপোর্ট
মোঃ শাহজাহান বাশার, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার
গাজীপুরে সাংবাদিক আসাদুজ্জামান তুহিনকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যার ঘটনাটি সাংবাদিক নিরাপত্তা ও মুক্ত সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। এই ঘটনাকে ঘিরে রাজধানী ঢাকায় শতাধিক গণমাধ্যমকর্মীর অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত মানববন্ধন কেবল একটি হত্যার প্রতিবাদ নয়, বরং এটি দেশের ক্রমবর্ধমান সাংবাদিক নির্যাতনের বিরুদ্ধে এক প্রতীকী আন্দোলন হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।
গত ৮ আগস্ট ২০২৫ গাজীপুরে স্থানীয় সংবাদকর্মী আসাদুজ্জামান তুহিনকে দিনের আলোয় নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, এটি ছিল পরিকল্পিত ও বার্তাবহ একটি হামলা, যেখানে হত্যাকারীরা ছিলেন নির্ভয়, যেন তারা জানতেন—তাদের কোনো বিচার হবে না।
তুহিন দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় দুর্নীতি, ভূমি দখল ও অপরাধচক্র নিয়ে প্রতিবেদন করে আসছিলেন। ধারণা করা হচ্ছে, তাঁর সাংবাদিকতা চর্চাই তাঁর মৃত্যুর কারণ।
সাংবাদিকদের প্রতিক্রিয়া: ক্ষোভ ও হতাশা
ঢাকায় অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে সাংবাদিকদের বক্তব্যে প্রকাশ পেয়েছে একটি সুস্পষ্ট বার্তা—এই হত্যাকাণ্ড কোনো একক ঘটনা নয়, বরং বিচারহীনতার ধারাবাহিকতারই ফল।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশে গত এক দশকে অন্তত ৩৫ জন সাংবাদিক হত্যার শিকার হয়েছেন, যার মধ্যে অধিকাংশ মামলারই সুরাহা হয়নি। অনেক ক্ষেত্রেই তদন্ত প্রতিবেদন বা চার্জশিট পর্যন্ত জমা পড়েনি।
এই প্রেক্ষাপটেই মানববন্ধনে দেশটিভির সাংবাদিক হাসান মাহমুদ বলেন—
> “আমাদের সিনিয়ররা নীরব। মেরুদণ্ডহীনতা আজ সাংবাদিকতাকেই হুমকির মুখে ফেলেছে।”
এই বক্তব্য স্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত সাংবাদিক মহলের নিস্ক্রিয়তাকেও কাঠগড়ায় দাঁড় করায়।
কী বলছেন মানবাধিকার কর্মীরা ও মিডিয়া বিশ্লেষকরা
মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, সাংবাদিকদের উপর হামলা প্রতিরোধে সরকারের সদিচ্ছা ও কার্যকর পদক্ষেপের অভাব রয়েছে।
মিডিয়া বিশ্লেষক ড. ফরহাদ জামান বলেন,
> “তুহিনের মৃত্যু দেখিয়ে দিল, একজন সাংবাদিক এখন নিজের শহরেই নিরাপদ নয়। এই অবস্থা চলতে থাকলে শুধু সাংবাদিকতা নয়, গণতন্ত্রই মার খাবে।”
আইনি কাঠামোর দুর্বলতা
বাংলাদেশে সাংবাদিক সুরক্ষা আইন এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। বিদ্যমান আইনে সাংবাদিকদের ওপর হামলা "সাধারণ আক্রমণ" হিসেবেই বিবেচিত হয়, যার ফলে মামলার গুরুত্বও কমে যায়। সাংবাদিক হত্যা সংক্রান্ত অধিকাংশ মামলায় প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপ ও দুর্বল তদন্ত বিচারপ্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে।
রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তা ও প্রশাসনের ব্যর্থতা
মানববন্ধনে অনেক সাংবাদিক সরাসরি সরকারের নীরবতাকে দায়ী করেছেন। বক্তারা বলেন, “রাষ্ট্র নিজেই যদি সাংবাদিক হত্যার বিচার না করে, তাহলে অপরাধীরা উৎসাহিত হয়।”
এটি একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক কাঠামোর দুর্বলতারই প্রতিচ্ছবি বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
সাংবাদিক সমাজের করণীয়
বিশ্লেষকদের মতে, সাংবাদিকদের নিজস্ব ঐক্য, পেশাগত সুরক্ষা নীতিমালা এবং শক্তিশালী প্রেস কাউন্সিল গঠনের দাবিকে সামনে আনতে হবে। বর্তমানে সাংবাদিক সমাজ একাধিক প্ল্যাটফর্মে বিভক্ত, যার ফলে কোনো আন্দোলন বা প্রতিবাদ সামগ্রিক শক্তি অর্জন করতে পারে না।
এ শুধু তুহিনের মৃত্যু নয়, সাংবাদিকতার ওপর আঘাত
সাংবাদিক আসাদুজ্জামান তুহিনের হত্যাকাণ্ড আরেকবার স্পষ্ট করে দিয়েছে—বাংলাদেশে সাংবাদিকতা একটি উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ পেশা। তবে এই ঝুঁকি শুধু সরকারের কাছ থেকেই নয়, বরং সমাজের একাংশ, প্রভাবশালী গোষ্ঠী এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উদাসীনতার সম্মিলিত ফল।
এই অবস্থায় যদি দ্রুত বিচার না হয়, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না দেওয়া হয় এবং সাংবাদিকদের সুরক্ষায় কার্যকর নীতি গ্রহণ না করা হয়, তবে এর ফলাফল হতে পারে আরো ভয়াবহ। কারণ সাংবাদিকতা নিভে গেলে, নিভে যাবে দেশের গণতন্ত্রের বাতিও।