নির্বাচনের ঠিক আগের রাতে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমিরের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে প্রকাশিত “লাইলাতুল গুজব চলছে” মন্তব্যটি ঘিরে সারা দেশে তোলপাড় শুরু হয়েছে। ধর্মীয় পরিভাষার এমন রাজনৈতিক ও ব্যঙ্গাত্মক ব্যবহারকে সাধারণ মানুষ এবং আলেম সমাজ 'কোরআনের অবমাননা' ও 'ধর্ম ব্যবসা' হিসেবে অভিহিত করছেন। একদিকে আগামীকালকের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন, অন্যদিকে দলটির একাত্তরের কলঙ্কিত ভূমিকা—সব মিলিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে।
১. ‘লাইলাতুল’ বিতর্ক: মুসলিম হৃদয়ে আঘাত
আরবি ‘লাইলাতুল’ (Night of) শব্দটি ইসলামে অত্যন্ত পবিত্র ও মহিমান্বিত। পবিত্র কোরআনের সুরা আল-কদর-এ ‘লাইলাতুল কদর’-কে হাজার মাসের চেয়ে উত্তম বলা হয়েছে। মুসলমানদের কাছে এই শব্দটি ইবাদত, সংযম এবং ঐশ্বরিক বরকতের প্রতীক।
সমালোচকদের মতে, এই মহিমান্বিত শব্দের সাথে ‘গুজব’ যুক্ত করে একে একটি নেতিবাচক প্রচারণার ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা চরম ধৃষ্টতা। সাধারণ ধর্মপ্রাণ ভোটারদের বক্তব্য, "যারা নিজেদেরকে ইসলামের ধারক-বাহক দাবি করে, তারা কীভাবে কোরআনিক শব্দকে রাজনৈতিক উপহাসের বস্তুতে পরিণত করে?" একে সরাসরি 'ইসলাম বিক্রেতাদের' কাজ হিসেবে দেখছেন অনেকে।
২. একাত্তরের সেই বিভীষিকা: জামায়াতের কলঙ্কিত অধ্যায়
বর্তমান বিতর্কের রেশ ধরে আলোচনায় উঠে এসেছে ১৯৭১ সালে জামায়াতে ইসলামীর স্বাধীনতাবিরোধী ভূমিকা। ইতিহাসের দালিলিক প্রমাণ বলছে:
রাজাকার ও আল-বদর গঠন: একাত্তরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে সহায়তা করতে জামায়াত গঠন করেছিল ঘাতক বাহিনী 'আল-বদর' ও 'রাজাকার'।
বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড: ১৬ই ডিসেম্বরের ঠিক আগে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের পরিকল্পিতভাবে হত্যার নেপথ্যে ছিল এই আল-বদর বাহিনী, যার নেতৃত্বে ছিলেন জামায়াতের শীর্ষ নেতারা।
ধর্মের অপব্যবহার: একাত্তরেও তারা ইসলামকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে লাখ লাখ বাঙালির রক্ত ঝরিয়েছিল। আজও সেই একই কায়দায় ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা চলছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
৩. বর্তমান প্রেক্ষাপট ও নির্বাচনী উত্তাপ
আগামীকাল ১২ই ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের ভাগ্য নির্ধারণী নির্বাচন। এই নির্বাচনের প্রাক্কালে জামায়াত আমিরের এমন বিতর্কিত মন্তব্য ভোটারদের মাঝে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
ধর্ম ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অবস্থান: সাধারণ মানুষের মাঝে একটি প্রবল আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে যে, যারা ধর্মের দোহাই দিয়ে রাজনীতি করে এবং পবিত্র কোরআনের অবমাননা করে, তাদের ব্যালটের মাধ্যমে উপযুক্ত জবাব দেওয়া হবে।
ধানের শীষ ও জনমত: নির্বাচনের মাঠে 'ধানের শীষ' বা ইনসাফের পক্ষে যে জোয়ার দেখা যাচ্ছে, তা মূলত এই তথাকথিত ধর্ম ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে এক ধরণের নৈতিক প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
৪. বিশ্লেষকদের অভিমত
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতে ইসলামী যখনই সংকটে পড়ে, তখনই তারা ধর্মীয় আবেগ নিয়ে খেলতে শুরু করে। ‘লাইলাতুল গুজব’ শব্দচয়ন তাদের সেই পুরনো কৌশলেরই অংশ। তবে ২০২৬ সালের সচেতন যুবসমাজ এখন আর এই ধরনের অপব্যাখ্যা গ্রহণ করতে প্রস্তুত নয়।
বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ এবং ধর্মপ্রাণ মুসলিম সমাজ এই ‘অন্ধকার অধ্যায়’ থেকে মুক্তি চায়। আগামীকালকের ভোটে ধানের শীষের মাধ্যমে মানুষ যে পরিবর্তনের ডাক দিচ্ছে, তা মূলত নীতি-আদর্শের রাজনীতি প্রতিষ্ঠার লড়াই। ইসলামের পবিত্রতা রক্ষা এবং একাত্তরের ঘাতকদের রাজনৈতিকভাবে প্রত্যাখ্যান করাই এখন সময়ের দাবি।