রাজশাহীতে ‘অপ-সাংবাদিকতা’ বন্ধে ভূমিমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা, নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
সাংবাদিক পরিচয়ের অপব্যবহার, চাঁদাবাজি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন; প্রকৃত সাংবাদিকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার আহ্বান
মোঃ সোহেল রানা
রাজশাহী প্রতিনিধি
রাজশাহী: সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে চাঁদাবাজি, ভয়ভীতি প্রদর্শন, প্রতারণা ও পেশাবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের অভিযোগ তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে পেশাদার সাংবাদিকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে ভূমিমন্ত্রী ও রাজশাহী সদর-২ আসনের সংসদ সদস্যের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন রাজশাহীর পেশাদার সাংবাদিকদের একটি পক্ষ। এ বিষয়ে তাঁদের পক্ষ থেকে লিখিত আবেদন করা হয়েছে।
আবেদনে বলা হয়েছে, সাংবাদিকতার পরিচয় ও মর্যাদা ব্যবহার করে কিছু ব্যক্তি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির ওপর প্রভাব বিস্তার, ভয়ভীতি প্রদর্শন, অনৈতিক সুবিধা আদায় এবং ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের পাশাপাশি প্রকৃত সাংবাদিকদের সঙ্গে সাংবাদিকতার পরিচয় অপব্যবহারকারীদের পার্থক্য নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান ও সাংবাদিক সংগঠনের সঙ্গে সমন্বয় করে পরিচয় যাচাইয়ের ব্যবস্থা গ্রহণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
রাজশাহী প্রেসক্লাবের ব্যবস্থাপনা নিয়ে অভিযোগ
আবেদনে ঐতিহ্যবাহী রাজশাহী প্রেসক্লাবের বর্তমান ব্যবস্থাপনা ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। এতে প্রেসক্লাবের ব্যবস্থাপনা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ ও বিতর্কের প্রসঙ্গ তুলে ধরে কয়েকজনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে যাচাই করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
আবেদনে গোলাম মোস্তফা মামুনের নাম উল্লেখ করে তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের অভিযোগ তোলা হয়েছে। এ ছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে চাঁদা দাবির একটি অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য এবং অডিওটির সত্যতা ও প্রেক্ষাপট নিশ্চিত না করে অভিযোগগুলোকে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা সমীচীন নয়।
রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ও বিভিন্ন অভিযোগ যাচাইয়ের দাবি
আবেদনে আরও কয়েকজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা, বিভিন্ন মামলায় আসামি থাকা এবং অতীতে ছাত্র-জনতার ওপর হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছে। আবেদনকারীরা সংশ্লিষ্ট মামলার নথি, প্রামাণ্য তথ্য এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বক্তব্যের ভিত্তিতে এসব অভিযোগ যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
আইনগত প্রক্রিয়ায় কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপিত হওয়া বা মামলার আসামি হওয়া মানেই অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়। তাই প্রতিটি অভিযোগের ক্ষেত্রে তথ্য-প্রমাণ যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
৩০ সেপ্টেম্বরের ঘটনা ঘিরে উদ্বেগ
আবেদনে গত ৩০ সেপ্টেম্বর বিকেল সোয়া ৩টার দিকে রাজশাহীতে কয়েকজন সাংবাদিককে লক্ষ্য করে মোটরসাইকেল শোডাউন, চিৎকার-চেঁচামেচি এবং উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরির অভিযোগও উল্লেখ করা হয়েছে।
আবেদনকারীদের দাবি, এ ধরনের ঘটনা সাংবাদিকদের মধ্যে বিভাজন ও সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি করতে পারে এবং পেশাগত দায়িত্ব পালনের পরিবেশকে বিঘ্নিত করতে পারে। তবে ঘটনার প্রকৃত পরিস্থিতি, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা জরুরি।
সাংবাদিক পরিচয়ের অপব্যবহার বন্ধে সমন্বিত উদ্যোগের প্রস্তাব
আবেদনকারীরা বলেছেন, কেউ সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ডে জড়িত হলে তার দায় সামগ্রিকভাবে পেশাদার সাংবাদিক সমাজের ওপর চাপানো উচিত নয়। একই সঙ্গে সাংবাদিকতার স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের অধিকার এবং পেশাগত দায়িত্ব পালনের সুযোগ অক্ষুণ্ন রাখতে হবে।
তাঁদের প্রস্তাব অনুযায়ী, সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহার করে চাঁদাবাজি, প্রতারণা, ভয়ভীতি প্রদর্শন কিংবা অন্য কোনো অপরাধের অভিযোগ পাওয়া গেলে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নিতে হবে। কোনো ব্যক্তি সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের সাংবাদিক কি না, তা নিশ্চিত করতে ওই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ ও পরিচয় যাচাইয়ের কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলার কথাও বলা হয়েছে।
এ ছাড়া প্রেস কার্ড, পরিচয়পত্র কিংবা গণমাধ্যমের নাম ব্যবহার করে কেউ যাতে অনৈতিক বা আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে না পারেন, সে বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ কামনা করা হয়েছে।
পুলিশ ও সাংবাদিক সংগঠনগুলোর মধ্যে নিয়মিত মতবিনিময়ের আহ্বান
আবেদনে রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশ (আরএমপি) এবং পেশাদার সাংবাদিক সংগঠনগুলোর মধ্যে নিয়মিত মতবিনিময় সভা আয়োজনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। আবেদনকারীদের মতে, পুলিশ ও গণমাধ্যমকর্মীদের মধ্যে যোগাযোগ ও সমন্বয় বাড়ানো গেলে পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় সৃষ্ট ভুল-বোঝাবুঝি, হয়রানি ও অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সহজ হবে।
একই সঙ্গে অপ-সাংবাদিকতার অভিযোগ যাচাই, সাংবাদিকদের পরিচয় নিশ্চিত করা এবং পেশাগত কাজে বাধা বা ভয়ভীতির অভিযোগ নিষ্পত্তিতে একটি সুস্পষ্ট সমন্বয়ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়েছে।
আবেদনকারীরা আরও উল্লেখ করেছেন, কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ডের দায় প্রমাণ ছাড়া কোনো গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান বা সাংবাদিক সংগঠনের ওপর চাপানো উচিত নয়। অভিযোগের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ভূমিকা ও দায় নির্ধারণ করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
যেসব দপ্তরে আবেদনের অনুলিপি পাঠানো হয়েছে
আবেদনের অনুলিপি পাঠানো হয়েছে বিভাগীয় কমিশনার, রাজশাহী; রাজশাহী রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি); রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক; রাজশাহীর জেলা প্রশাসক; রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার এবং রাজশাহী মহানগর বিএনপির সংশ্লিষ্ট নেতাদের কাছে।
আবেদনকারীদের প্রত্যাশা, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তাঁদের মতে, সাংবাদিকতার স্বাধীনতা ও মর্যাদা রক্ষার পাশাপাশি পরিচয়ের অপব্যবহার প্রতিরোধ করা গেলে গণমাধ্যমকর্মী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা আরও সুদৃঢ় হবে।
তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য, আবেদনের গ্রহণসংক্রান্ত তথ্য এবং যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হয়েছে তাঁদের বক্তব্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আরও পূর্ণাঙ্গ করা সম্ভব হবে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং সব পক্ষের বক্তব্য প্রকাশের মধ্য দিয়েই বিষয়টির বস্তুনিষ্ঠ চিত্র তুলে ধরা প্রয়োজন।