রাজনৈতিক অস্থিরতা নয়, নিরাপদ সমাজ চাই"
লেখকঃ মোঃ শাহজাহান বাশার
সাংবাদিক ও কলামিস্ট
বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক অস্থিরতা, হঠাৎ সৃষ্ট সহিংসতা, এবং ক্ষমতা দখলের প্রতিযোগিতা আজ সাধারণ মানুষের জীবনে ভয়াবহ প্রভাব ফেলছে। শহর হোক বা গ্রাম, রাজনীতি এখন এমন এক মাত্রায় পৌঁছেছে যেখানে দলীয় স্বার্থ, ব্যক্তিপরায়ণতা, এবং ক্ষমতার মঞ্চে স্থায়ী হওয়ার প্রতিযোগিতাই মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলাফলস্বরূপ, আমাদের সমাজে এক ভয়াবহ সামাজিক অবক্ষয়ের জন্ম হয়েছে, যার প্রধান শিকার হচ্ছে সাধারণ মানুষ—যারা প্রতিদিন অজানা আতঙ্ক, নিরাপত্তাহীনতা, এবং আর্থসামাজিক চাপের মধ্যে জীবন অতিবাহিত করছে।
রাজনীতির লক্ষ্য যদি হয় জনকল্যাণ, তবে প্রশ্ন উঠে—আজ রাজনীতি কতটা মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে? যখন রাজনৈতিক কর্মসূচির নামে রাস্তাঘাট অবরুদ্ধ হয়, যখন আন্দোলনের নামে আগুনে পুড়ে যায় বাস, প্রতিষ্ঠান, এমনকি স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীদের ভবিষ্যৎ, তখন বুঝে নিতে হয়—রাজনীতি এখন সমাজ গঠনের পরিবর্তে সমাজ ধ্বংসের উপকরণে পরিণত হয়েছে। এসব রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্যেই ক্রমেই বাড়ছে অপরাধ প্রবণতা, ঘরছাড়া হচ্ছে নিরাপরাধ পরিবারগুলো, এবং রাষ্ট্রের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী পড়ছে বিরূপ চাপে।
এ অবস্থায়, রাষ্ট্র যদি নিরপেক্ষ এবং কঠোর ভূমিকায় না আসে, তবে অচিরেই এই অস্থিরতা জাতীয় সংকটে রূপ নিতে পারে। কারণ, রাজনৈতিক দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে সমাজে জন্ম নিচ্ছে হিংসা, বিদ্বেষ, এবং প্রতিশোধ স্পৃহা—যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য মারাত্মক বার্তা বহন করছে। স্কুলে, কলেজে, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা এখন দলীয় পরিচয়ে চিহ্নিত হয়, তাদের শিক্ষার অগ্রাধিকার হারিয়ে গেছে, জায়গা করে নিয়েছে ‘কে কোন দলের’ এই প্রশ্নটি।
সরকারের উচিত এখনই কার্যকর, দৃঢ় ও অপরিহার্য অবস্থানে যাওয়া—যেখানে দল-মতের উর্ধ্বে উঠে সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। কেবল কথার রাজনীতি বা সভা-সেমিনারের বক্তব্য নয়, মাঠপর্যায়ে প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে এমন এক ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার, যা অস্থিরতা সৃষ্টিকারীদের কঠোরভাবে দমন করবে এবং সামাজিক ভারসাম্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা করবে।
সরকারকে বুঝতে হবে, জনগণ আর রাজনৈতিক খেলা দেখতে চায় না। তারা চায় নিরাপদ জীবন, সুশাসন, এবং কর্মসংস্থান। জনগণ সরকারের কাছে প্রশ্ন করতে চায়—‘আমরা কি শুধুই রাজনৈতিক বলির পাঁঠা হয়ে থাকবো? আমরা কি কেবল দলের ব্যানারে ব্যবহারের বস্তু?’ সাধারণ মানুষ রাষ্ট্রের কাছে প্রতিকার চায়, প্রতিশোধ নয়।
তাই এখন সময় এসেছে, সরকারকে বাস্তবতার কঠিনতম রূপ জাতির সামনে ব্যাখ্যা করে জনগণের পাশে দাঁড়াতে হবে। বুঝাতে হবে—রাজনৈতিক কর্মসূচির নামে সৃষ্ট সহিংসতা জাতির শত্রু, এটি কোনও গণতন্ত্র নয়, এটি সমাজের শত্রুতা। রাষ্ট্রকে চাই এমন বার্তা—‘অস্থিরতার রাজনীতি নয়, স্থিতিশীল সমাজ গড়াই আমাদের অঙ্গীকার।’
আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেন গর্ব করে বলতে পারে—আমরা এমন এক রাষ্ট্রে বাস করি যেখানে রাজনীতি জনগণের সেবা এবং রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা বজায় রাখার হাতিয়ার। এখনই সময়, সরকার যেন দায়িত্বশীলতার সর্বোচ্চ দৃষ্টান্ত স্থাপন করে এবং কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে—যাতে সমাজ, রাষ্ট্র এবং জনগণ বাঁচে, গড়ে ওঠে একটি নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও মানবিক বাংলাদেশ।