রাজউকের জোন-৫ যেন দুর্নীতির অভয়ারণ্য: অভিযোগের পাহাড় ডিঙিয়ে ‘গডফাদার’ হামিদুল এখনো বহাল তবিয়তে
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা | আপডেট: ১৪ অক্টোবর, ২০২৫
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) জোন–৫ এখন অনিয়ম ও দুর্নীতির এক মূর্ত প্রতীক। ঘুষ বাণিজ্য, ক্ষমতার অপব্যবহার, নোটিশের নামে চাঁদাবাজি—সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন বর্তমান পরিচালক মো. হামিদুল ইসলাম। বিগত সরকারের প্রভাবশালী নেতাদের আশীর্বাদপুষ্ট এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুদকসহ বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগের পাহাড় জমলেও, অদৃশ্য এক শক্তির ইশারায় তিনি এখনো দাপটের সঙ্গে নিজের পদ আঁকড়ে ধরে আছেন।
রাজনৈতিক আশীর্বাদে দ্রুত উত্থান
অনুসন্ধানে জানা যায়, রংপুর জেলার মিঠাপুকুর থানার রূপসা গ্রামের হামিদুল ইসলাম দর্শনে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে ২০০৭ সালের ৫ ডিসেম্বর সহকারী সচিব হিসেবে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। এরপর আর তাকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে দ্রুততম সময়ে বাগিয়ে নেন দুটি পদোন্নতি। বর্তমানে তিনি রাজউকের জোনাল পরিচালক। ২০৩৬ সালে অবসরে যাওয়ার কথা থাকলেও বর্তমান কর্মস্থলে তিনি যেন এক ‘অঘোষিত সম্রাট’।
চাকরির নামে কোটি টাকার প্রতারণা
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, হামিদুল ইসলাম তার পদের প্রভাব খাটিয়ে সরকারি চাকরি দেওয়ার নাম করে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।
ভুক্তভোগী শাহীন: কেরানীগঞ্জের শাহীন জানান, রাজউকে ড্রাইভার পদে চাকরির আশায় হামিদুলকে ৫ লাখ টাকা দেন তিনি। চাকরি না পেয়ে টাকা ফেরত চাইলে তাকে বিভিন্নভাবে হুমকি ও টালবাহানা করা হয়।
ভুক্তভোগী মতিন: একইভাবে মতিন নামে আরেক ব্যক্তিও ৫ লাখ টাকা হারিয়ে এখন পথে পথে ঘুরছেন।
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি ও এপ্রিল মাসে তার বিরুদ্ধে এই প্রতারণা সংক্রান্ত দুটি পৃথক অভিযোগ দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) জমা পড়ে।
সম্পদের পাহাড়: ঢাকা থেকে রংপুর
চাকরিতে যোগদানের মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে হামিদুল ইসলামের অর্থনৈতিক অবস্থার নাটকীয় পরিবর্তন বিস্ময় জাগিয়েছে খোদ তার সহকর্মীদের মনে। প্রাপ্ত তথ্যমতে:
ঢাকায় একাধিক ফ্ল্যাট ও প্লট: অবৈধ উপার্জনের টাকায় তিনি রাজধানীর অভিজাত এলাকায় একাধিক ফ্ল্যাট ও প্লট ক্রয় করেছেন।
রংপুরে বিশাল ভূ-সম্পত্তি: নিজ জেলা রংপুরে বিঘার পর বিঘা কৃষিজমি ও বাণিজ্যিক জমি কিনেছেন তিনি।
বিদেশে অর্থ পাচার: তার অর্জিত কালো টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে কি না, তা নিয়েও তদন্তের দাবি উঠেছে।
জোন-৫ এর ‘মাসিক চাঁদা’ ও নোটিশ বাণিজ্য
২০২৫ সালের আগস্টে দিদারুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তি দুদকে অভিযোগ করেন যে, হামিদুল ইসলাম রাজউকের ইমারত পরিদর্শকদের এরিয়া পরিবর্তন করে দেওয়ার বিনিময়ে নিয়মিত ‘মাসিক চাঁদা’ আদায় করেন। অভিযোগ অনুযায়ী, এই খাত থেকেই তার মাসিক আয় ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা।
এছাড়া, ইমারত পরিদর্শক ও অথরাইজড অফিসারদের মাধ্যমে তিনি একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। যারা নকশা বহির্ভূত ভবনের মালিকদের নোটিশ দিয়ে ভীতি প্রদর্শন করে এবং পরে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে সেই নোটিশ গায়েব করে দেয়। ২০২৪ সালের ২০ অক্টোবর নিউ এলিফ্যান্ট রোড ও মোহাম্মদপুর এলাকায় মোবাইল কোর্ট পরিচালনার পর, কয়েকটি ভবন মালিকের কাছ থেকে প্রায় ১৫-২০ লাখ টাকা নিয়ে অবৈধ ‘অনুমতি নবায়ন’ করে দেওয়ার চাঞ্চল্যকর তথ্যও উঠে এসেছে।
তদন্ত যখন হিমাগারে
রাজউক চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার রিয়াজুল ইসলাম এই দুর্নীতির অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখতে পরিচালক (উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ–১) মো. মনিরুল হককে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে সেই তদন্ত প্রতিবেদন আজও আলোর মুখ দেখেনি। রাজউকের সাম্প্রতিক এক অফিস আদেশেও স্বীকার করা হয়েছে যে, অনেক তদন্ত কমিটি সময়মতো রিপোর্ট দিচ্ছে না, যার ফলে অভিযুক্ত কর্মকর্তারা শাস্তির বদলে উল্টো পদোন্নতি বা প্রভাবশালী পদে আসীন থাকছেন।
নিরুত্তর অভিযুক্ত হামিদুল
এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে পরিচালক মো. হামিদুল ইসলামের সাথে তার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। এমনকি খুদেবার্তা পাঠিয়েও কোনো উত্তর মেলেনি।
জনমনে প্রশ্ন
দুর্নীতির অভিযোগে জর্জরিত একজন কর্মকর্তা কীভাবে এখনো রাজউকের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার জোনাল পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন, তা নিয়ে জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, অবিলম্বে তাকে পদ থেকে অপসারণ করে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হোক।