রাউজানে ‘অগ্নি-সন্ত্রাস’ ও দিল্লির মাস্টারপ্ল্যান; আসামি মনিরের জবানবন্দিতে ফেঁসে যাচ্ছেন হাসিনা
নিজস্ব প্রতিবেদক | চট্টগ্রাম ব্যুরো | ১৬ জানুয়ারি, ২০২৬
চট্টগ্রামের রাউজান ও রাঙ্গুনিয়ায় সংখ্যালঘু এবং নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর বাড়িতে অগ্নিসংযোগ কোনো সাধারণ দুর্ঘটনা ছিল না; বরং এটি ছিল ক্ষমতাচ্যুত স্বৈরাচার শেখ হাসিনার সরাসরি নির্দেশে দেশজুড়ে অস্থিতিশীলতা তৈরির এক ভয়াবহ ‘মাস্টারপ্ল্যান’। সম্প্রতি গ্রেফতারকৃত মূল হোতা মনির হোসেনের ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দিতে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। জবানবন্দি অনুযায়ী, প্রতিবেশী দেশের গোয়েন্দা সংস্থার সহায়তায় এবং শেখ হাসিনার সরাসরি সিগন্যালে হিন্দু, বৌদ্ধ ও পাহাড়িদের জানমাল পুড়িয়ে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে আন্তর্জাতিকভাবে ‘ব্যর্থ’ প্রমাণের এই নীল নকশা তৈরি করা হয়েছিল।
মানিকছড়ির গোপন বৈঠক: যেখানে রচিত হয় ধ্বংসের চিত্রনাট্য
আসামি মনির জানান, রাউজানে প্রথম অগ্নিকাণ্ডের কয়েকদিন আগে খাগড়াছড়ির মানিকছড়িতে এক প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতার বাড়িতে অত্যন্ত উচ্চপর্যায়ের একটি গোপন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতাদের পাশাপাশি কয়েকজন ব্যবসায়ীও উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে উপস্থিত নেতাদের বরাত দিয়ে মনির বলেন, “আপা (শেখ হাসিনা) পরিষ্কার বলে দিয়েছেন, হিন্দু-বৌদ্ধদের ঘর পুড়িয়ে ভিডিও করে বিদেশে পাঠাতে হবে। যাতে বিশ্ব মনে করে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুরা নিরাপদ নয়।”
১৩ লাখ টাকার ফান্ড ও বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার মদদ
তদন্তকারী সূত্র ও মনিরের জবানবন্দি অনুযায়ী, এই অপারেশন বাস্তবায়নের জন্য রাঙামাটির এক আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক কাউন্সিলরের মাধ্যমে ১৩ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়। এই অর্থের একটি বড় অংশ সরাসরি প্রতিবেশী দেশের একটি লবিস্ট গ্রুপ থেকে এসেছে বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে। এই টাকার মাধ্যমেই পেট্রোল, মোটরসাইকেল এবং ভাড়াটে দুর্বৃত্তদের ব্যবস্থা করা হয়।
অপারেশন ‘সেফ এক্সিট’: মালিকপক্ষ যখন ষড়যন্ত্রের অংশ
মনিরের দেওয়া তথ্যের সবচেয়ে বিস্ময়কর অংশ হলো, যে পাঁচটি বাড়িতে আগুন দেওয়া হয়েছে, সেই বাড়ির মালিকপক্ষের কয়েকজনও এই পরিকল্পনায় শামিল ছিলেন।
সতর্কবার্তা: আগুন দেওয়ার অন্তত এক ঘণ্টা আগে বাড়ির মালিকদের সতর্ক করা হতো।
প্রাণী ও সম্পদ রক্ষা: কোনো গবাদিপশু বা মানুষ যাতে হতাহত না হয়, সেদিকে বিশেষ নজর রাখা হয়েছিল। কারণ মৃতদেহ থাকলে তদন্ত জটিল হতে পারে।
সাঙ্কেতিক আলামত: স্থানীয় জনগণের মনে বিভ্রান্তি ছড়াতে বাড়ির বাইরে পুরনো কাপড় ও লুঙ্গি সাজিয়ে রেখে আগুন দেওয়া হতো, যাতে মনে হয় এটি স্থানীয় চোর বা ডাকাত দলের কাজ।
সংখ্যালঘু কার্ড খেলে আন্তর্জাতিক লবিং
পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি জানিয়েছেন, আসামিদের হেফাজত থেকে উদ্ধার করা ব্যানারে সাম্প্রদায়িক উসকানিমূলক বক্তব্য ছিল। মনিরের জবানবন্দি অনুযায়ী, শেখ হাসিনা ভারতে বসে নিজেই তার ক্যাডারদের এই পরামর্শ দিয়েছেন যাতে আগুনের ভিডিওগুলো টুইটার (এক্স) এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। লক্ষ্য ছিল, বাংলাদেশে ‘গণহত্যা’ ও ‘সংখ্যালঘু নিধন’ হচ্ছে—এমন একটি মিথ্যা বয়ান তৈরি করে বিদেশি হস্তক্ষেপ ত্বরান্বিত করা।
তদন্ত কর্মকর্তাদের ভাষ্য
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন, "আসামি মনির ১৬৪ ধারায় যা বলেছেন, তা অত্যন্ত স্পর্শকাতর। এর সঙ্গে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি নির্দেশ এবং বিপুল পরিমাণ অর্থ লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। আমরা ডিজিটালি এবং ফরেনসিকভাবে এই নির্দেশের সূত্রগুলো যাচাই করছি। শেখ হাসিনাসহ এই ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে সম্পূরক চার্জশিট দাখিল করা হবে।"
এক নজরে ষড়যন্ত্রের খতিয়ান
ক্র: প্রধান দিক বিস্তারিত তথ্য
১ মূল নির্দেশদাতা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা (দিল্লি থেকে)।
২ সমন্বয়ক রাঙামাটির এক আওয়ামী লীগ নেতা ও কাউন্সিলর।
৩ বাজেট নগদ ১৩ লাখ টাকা (অ্যাডভান্সড)।
৪ মূল কৌশল মালিকপক্ষের সহযোগিতায় 'নিয়ন্ত্রিত' অগ্নিসংযোগ।
৫ উদ্দেশ্য সংখ্যালঘু নির্যাতন দেখিয়ে সরকারকে আন্তর্জাতিক চাপে ফেলা।
সম্পাদকের মন্তব্য: আসামি মনিরের এই জবানবন্দি বর্তমান বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা নষ্ট করার গভীর ষড়যন্ত্রের একটি সামান্য অংশ মাত্র। এই ঘটনার শেকড় কতদূর বিস্তৃত, তা বের করা এখন সময়ের দাবি।